ডলারের আধিপত্যের কবল থেকে সামষ্টিক অর্থনীতিকে রক্ষা করতে বাংলাদেশও ডিডলারাইজেশনের পথে আনুষ্ঠানিকভাবে পা বাড়িয়েছে। সীমিত পরিসরে হলেও ডিডলারাইজেশনের এই যাত্রায় বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী দেশ ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে নতুন এক যুগে প্রবেশ করেছে। সম্প্রতি দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ-সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে উপনীত হয়েছে, যার আওতায় এখন বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্য রপ্তানি ও ভারত থেকে বাংলাদেশে পণ্য আমদানিতে ডলারের পাশাপাশি ভারতীয় মুদ্রা রুপি ব্যবহার করা যাবে।
বলা হচ্ছে, একটি পাইলট কর্মসূচি হিসেবে আপাতত শুধু রুপিতে লেনদেন হলেও পর্যায়ক্রমে টাকাও এতে অন্তর্ভুক্ত হবে। এখন বাংলাদেশের কিছু ব্যবসায়ী ভারতের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানিতে রুপিতে এলসি খুলতে চাইলে, তা পারবেন। এত দিন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের পুরোটাই সম্পন্ন হতো মার্কিন ডলারে। এর আগে অব্যাহত ডলার-সংকটের মুখে বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে চীনের মুদ্রা ইউয়ানে অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমোদন দিয়েছিল। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমিত পরিসরের মুদ্রাসংক্রান্ত নতুন এই ব্যবস্থা নানা কারণে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের তীব্র রিজার্ভ সংকটে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, বৈদেশিক লেনদেনে ডলারের পাশাপাশি অন্যান্য মুদ্রা ব্যবহার করা গেলে বাংলাদেশের রিজার্ভের ওপর চাপ কিছুটা কমবে ঠিকই, কিন্তু সামষ্টিক অর্থনীতিকে সঠিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে এখনো বহু পথ যেতে হবে।
সাধারণভাবে বলা যায়, এ ধরনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বিনিময় পদ্ধতিতে প্রথমেই ভেবে দেখতে হয় রুপি বা ইউয়ানের মতো বিদেশি মুদ্রার জোগান আসবে কোত্থেকে? লেনদেনের সময় পারস্পরিক মুদ্রার মূল্যমান কীভাবে নির্ধারিত হবে? ডলারের প্রকৃত দর পাওয়া যাবে কি না? বাণিজ্য ঘাটতি কীভাবে কমিয়ে আনা যাবে? এ রকম নানা বিষয়ের ওপর এ-সংক্রান্ত কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য ও লাভ-লোকসান নির্ভর করে। কেননা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বীকৃত মুদ্রা হিসেবে পরিগণিত যুক্তরাষ্ট্রের ডলার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরো, ব্রিটেনের পাউন্ড, চীনের ইউয়ান এবং জাপানের ইয়েন এখনো বেশ ভালো অবস্থায় আছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশই আসে ডলার ও ইউরোতে। এই পাঁচটি ছাড়া অন্য যেকোনো মুদ্রায় প্রত্যাশিত সুবিধা পেতে হলে শক্তিশালী ও কার্যকর দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নীতি ও ডলারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় অত্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় দুর্বল হয়ে পড়া সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশের এ ধরনের উদ্যোগে শামিল হওয়ার চেষ্টা করার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমানও প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। ডলারের সংকট মোকাবিলায় কৃচ্ছ্রসাধন ও আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখনো যেহেতু স্বস্তিদায়ক নয়, সেহেতু ডলারের বিকল্প তৈরি ও ডলার সাশ্রয় বাংলাদেশের জন্য আবশ্যিক হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে নতুন এই মুদ্রা কর্মসূচিতে বাংলাদেশ ভারতে যতটা পণ্য রপ্তানি করবে, আমদানির সময় ততটাই কেবল রুপিতে লেনদেন করা যাবে। অর্থাৎ এই লেনদেনের জন্য আলাদা করে রুপি কিনতে পারবে না বাংলাদেশের কোনো ব্যাংক। পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাংক যে রুপি আয় করবে, তা দিয়েই কেবল আমদানির দায় পরিশোধ করা যাবে। বাকি পরিমাণ আমদানিতে আগের মতো ডলারই ব্যবহার করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে ভারত থেকে ১ হাজার ৩৬৯ কোটি ডলারের আমদানি দায় পরিশোধ করা হয়েছে, যা মোট আমদানি ব্যয়ের ১৮ দশমিক ১০ শতাংশ। এর বিপরীতে রপ্তানি করা হয়েছে ১৯৯ কোটি ডলারের। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ২ বিলিয়ন বা ২০০ কোটি ডলারের রপ্তানিপণ্যের দাম রুপিতে দেবে ভারত, যা বাংলাদেশ ভারত থেকে পণ্য কিনতে ব্যবহার করবে। এর বিপরীতে ভারত থেকে আমদানি হবে প্রায় ১৪ বিলিয়ন বা ১৪০০ কোটি ডলারের পণ্য। এর মানে হচ্ছে, এই দুই দেশের মধ্যে রপ্তানি-আমদানি বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৭ গুণ। বাংলাদেশ বার্ষিক ২ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন ডলার সাশ্রয় করতে পারবে। প্রাথমিকভাবে দুই দেশের দুটি করে করে চারটি ব্যাংক রুপিতে আমদানি-রপ্তানি করার অনুমতি পেয়েছে। দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনে ভারতের ব্যাংকগুলোতে রুপিতে ‘নস্ট্র অ্যাকাউন্ট’ (বিদেশের কোনো ব্যাংকে বিদেশি মুদ্রায় লেনদেন করতে খোলা হিসাব) খুলেছে বাংলাদেশের সোনালী ও ইস্টার্ণ ব্যাংক। এর মাধ্যমে ডলার দিয়ে এলসি বা ঋণপত্র খোলার প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি রুপিতে বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানির সময় ভারতের ব্যাংক দুটিতে ঋণপত্র খুলতে পারবেন দেশটির আমদানিকারকেরা। একইভাবে ভারত থেকে পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যাংক দুটিতে ঋণপত্র খুলতে পারবেন বাংলাদেশের আমদানিকারকেরা। বাংলাদেশ থেকে পণ্য বুঝে নেওয়ার পর ভারতীয় ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকের হিসাবে রুপিতে জমা হয়ে যাবে পণ্যের মূল্য। আর সেই রুপি দিয়ে ভারতের উদ্যোক্তাদের কাছে বাংলাদেশের আমদানি দায় মেটানো হবে। আন্তর্জাতিক লেনদেনের স্বীকৃত ব্যবস্থা সুইফট ব্যবহার করেই রুপির এই লেনদেন হবে। তবে ভারতে থাকা বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকে রপ্তানির আয় যোগ হওয়ার পর স্থানীয় রপ্তানিকারককে বাংলাদেশের আরটিজিএস (রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট) লেনদেন ব্যবস্থার মাধ্যমে পণ্যমূল্য পরিশোধ করে দেবে বাংলাদেশের ব্যাংক। দ্বিপক্ষীয় এই বাণিজ্যে আপাতত টাকা-রুপির বিনিময় হার ঠিক হবে মার্কিন ডলারকে রেফারেন্স ধরে। যত দিন না টাকা-রুপির সরাসরি বিনিময় হার ঠিক করা হবে, তত দিন ডলারকে রেফারেন্স দর হিসেবে ব্যবহার করা হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বর্তমান বিনিময় হার বিবেচনায় নিলে প্রতি ডলারের বিপরীতে কমবেশি ৮২ রুপি পাওয়া যায়। অন্যদিকে প্রতি ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি মুদ্রা পাওয়া যায় ১০৮ টাকা। ডলারকে ভিত্তি দর ধরে ১ রুপির বিপরীতে বাংলাদেশি মুদ্রায় পাওয়া যাবে শূন্য দশমিক ৭৬ টাকা বা ৭৬ পয়সা। আর প্রতি রুপি কিনতে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের দিতে হবে ১ টাকা ৩১ পয়সা।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় মনে করছে, দুই দেশের মধ্যে সরাসরি রুপিতে লেনদেনের ফলে কমপক্ষে ৬ শতাংশ খরচ সাশ্রয় হবে ভারতকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে। তাদের মতে, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের সময় একবার টাকা থেকে ডলারে, আবার রুপি থেকে ডলারে রূপান্তর করতে ৬ শতাংশের মতো ফারাক হয়। অর্থাৎ ১০০ ডলারে ৬ ডলারের মতো। তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্লেষকেরা নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, মনে রাখতে হবে যে পণ্যের বহুমুখীকরণ, রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধি ও দুই দেশ নিজ নিজ মুদ্রায় লেনদেনের মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশের ব্যাংক ও ব্যবসায়ীরা মুদ্রা বিনিময়ের সময় তৈরি ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে পারেন। সীমিত রপ্তানি করে এবং টাকাকে বাদ দিয়ে শুধু রুপিতে আমদানি-রপ্তানি করে খুব বেশি ডলার সাশ্রয় হওয়ার সুযোগ খুবই কম। উল্টো অনেক সময় ক্ষতির মুখেও পড়তে হতে পারে। এখানে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা ক্রমশই শক্তি অর্জন করা ২০০ কোটি ডলার প্রাপ্তির সুযোগ বন্ধ হওয়ার হিসাব বিবেচনায় নিতে হবে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের খুব বেশি লাভবান হওয়ার সুযোগ কম। বিশ্বকে আর্থিকীকরণের সুযোগ নিয়ে ডলার যে হারে শক্তি অর্জন করে, রুপি সে হারে শক্তি অর্জন করতে পারে না। রাশিয়া থেকে বিশ্ব রেকর্ড করে কম দামে সর্বোচ্চ পরিমাণ জ্বালানি ও তেল আমদানি এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কারেন্সি সোয়াপ করেও ২০২২ সালে ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির দাম পড়েছে ১১ শতাংশ। রুপির পতনের এই ধারা আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকবে বলেও দেশটির অনেক পর্যবেক্ষক আভাস দিয়েছেন। ১২ জুলাই পর্যন্ত ১ ডলার সমান ১০৮ টাকা এবং ১ ভারতীয় টাকা সমান ১ দশমিক ৩২ বাংলাদেশি টাকা ছিল। অন্যদিকে ৮২ দশমিক ২৮ রুপি সমান ১ ডলার। ভারত বলছে, টাকা-রুপির মূল্যমানে রুপি ১৬ শতাংশ এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু ভারতের এই দাবি পুরোপরি ঠিক না-ও হতে পারে। এখানে পারিপার্শ্বিক নানা হিসাব-নিকাশ কাজ করে। শক্তিতে ভারতীয় রুপি বাংলাদেশের টাকার তুলনায় কিছুটা এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির শক্তিমত্তা একেবারে মন্দ নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের টাকাকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে বাংলাদেশের টাকা কিছুটা হলেও শক্তি সঞ্চয় করতে পারত। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রাথমিক আলোচনায় টাকাকে এই ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও, তা কার্যকর না হওয়ায় বাংলাদেশ খুব বেশি পরিমাণ ডলার সাশ্রয়ের সুযোগ থাকবে না। এ ছাড়া রুপিতে বাণিজ্যের সুযোগ আবার সব রপ্তানিকারকের জন্য প্রযোজ্য হবে না। যে ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে কাঁচামাল আমদানি করেন এবং ভারতেই রপ্তানি করেন, তারাই কেবল এই সুবিধা পাবেন। এমনটা হলে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের যে লাভ হবে সেই লাভের অর্থ ডলারে রূপান্তর করে প্রকৃত দাম পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকে যাবে। ভারতীয় রুপি ডলারের মতো এমনিতেই স্থিতিশীল নয়। তার ওপর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি করা তেলে অর্থনীতিনির্ভর ভারতের রুপি আরও চাপে পড়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। টাকা ও রুপির বিনিময় হার নির্ধারণে বাংলাদেশ দক্ষতার পরিচয় দিতে না পারলে প্রকৃত অর্থে আমাদের তেমন কোনো লাভই হবে না। সাধারণত দেখা গেছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ভারত সব সময় একটি সংরক্ষণবাদী কৌশল অবলম্বন করে, যাকে অনেকেই টিপিক্যাল ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি বলে মনে করেন। প্রথাগতভাবে বাণিজ্য সংরক্ষণবাদী ভারত প্রতিবেশীদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত বেশ কয়েকটি চুক্তি করলেও আন্তরাজ্য বিধিনিষেধের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধা দিয়ে থাকে। এমনিতেই বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্য ও আন্তর্জাতিক মান খুবই কম। অবকাঠামোগত দুর্বলতাও বিদ্যমান। তারপরও বাংলাদেশের উৎপাদিত অনেক পণ্যের চাহিদা ভারতে রয়েছে। কিন্তু অনেক সময়ই ভারতের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সেসব চাহিদাসম্পন্ন পণ্য রপ্তানি করা যায় না। বাংলাদেশে যেসব পণ্যের ওপর ডিউটি ফ্রি দেওয়ার কথা, সেসব পণ্য নিয়ে ভারতের কাস্টমস প্রায়ই ঝামেলা করে। উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপে সমস্যার সাময়িক সমাধান হলেও নতুন করে চালান পাঠাতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা উৎসাহ পান না। অবকাঠামোগত দুর্বলতা, শুল্ক ও বন্দরসংক্রান্ত অসুবিধা; অশুল্ক বাধা এবং ঝামেলাপূর্ণ রপ্তানি প্রক্রিয়া ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার পথে মূল অন্তরায়।
বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি হয় মূলত বস্ত্র ও তৈরি পোশাক, সয়াবিন তেল, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটের সুতা, মাছ ও চা। আর ভারত থেকে আমদানি হয় পাথর, ইলেকট্রনিকস পণ্য, ভারী মেশিনারিজ, অর্গানিক কেমিক্যালস, প্লাস্টিক, অ্যানামেল ও ভেজিটেবল অয়েল, লোহা ও ইস্পাত এবং যানবাহন ও যানবাহনের যন্ত্রাংশ।
এখানে বলে রাখা ভালো যে যুক্তরাষ্ট্রের নীরব হুমকি-ধমকি ও চাপ উপেক্ষা করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বৈদেশিক লেনদেনে ডলারের বিকল্প হিসেবে সুবিধাজনক মুদ্রা ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ডলারের বিশ্ব আধিপত্য ৮০ থেকে ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। ভারত বৈদেশিক বাণিজ্যের লেনদেনে কিছু পরিমাণে রুপির ব্যবহার করছে। যেমন রাশিয়া-ভারতের মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেনে রুবল ও রুপির হিসাব খোলা হয়েছে এবং তারা রাশিয়াকে রুপিতে অর্থ পরিশোধ করছে। আবার রাশিয়াও ভারতকে রুবলে অর্থ পরিশোধ করছে। শুধু রাশিয়া নয়, যাদের সঙ্গে ভালো বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে, তাদের সঙ্গেও ভারত কিছু পরিমাণে রুপিতে অর্থ পরিশোধ করছে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ডলারের বাইরে অন্য মুদ্রায় বৈদেশিক লেনদেনে একটি বড় সমস্যা হলো তার জোগান। যেমন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আসে রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স থেকে, যা ডলার ও ইউরোনির্ভর। বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের। আর ভারত ও চীনের সঙ্গে ঘাটতি। ফলে ভারত ও চীনের সঙ্গে রুপি ও ইউয়ানে লেনদেন করতে হলে বিপুল পরিমাণ রুপি ও ইউয়ানের প্রয়োজন, যা জোগাড় করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন। আর এ অবস্থায় কেবল একপাক্ষিকভাবে ভারতীয় রুপিতে সুনির্দিষ্ট কিছু বাণিজ্যপণ্যে লেনদেনে বাংলাদেশের ডলার সংকটের খুব একটা উপশম হবে না। প্রকৃত অর্থে এই ব্যবস্থায় সামগ্রিকভাবে ভারতের লাভের পাল্লাই ভারী হয়েছে। কারণ, এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে ভারত নিজের মুদ্রা রুপিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী করতে চাইছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হতে হলে দেশটির শক্তিশালী মুদ্রামানের প্রয়োজন। ডিডলারাইজেশন মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে ভারত মার্কিন ডলারের পাশাপাশি নিজস্ব মুদ্রা রুপিতে নেপাল, ভুটানসহ ১৮টি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করছে। ভারত চাইছে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রুপির চাহিদা সৃষ্টির মাধ্যমে রুপির গ্রহণযোগ্যতা ও শক্তিমত্তা আরও বাড়াতে। বাংলাদেশের সঙ্গে করা মুদ্রাসংক্রান্ত সর্বশেষ এই চুক্তি ভারতের মুদ্রার শক্তি অর্জনকে আরও গতি দেবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ভারত ও চীন রাশিয়ার সঙ্গে মুদ্রা বিনিময় করে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আনতে পারছে। কারণ তাদের বাণিজ্যে ভারসাম্য আছে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা শক্তিশালী এবং সর্বোপরি পারমাণবিক বোমার কারণে পরাশক্তির ইমেজ আছে। চীন এখন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিশালী অর্থনীতি। ভারতও দ্রুত উঠে আসছে। এসব দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বেশ ভালো এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। চীন-ভারত বাংলাদেশের বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। তাই রুপি-ইউয়ানে বাণিজ্য হতে পারে। যদিও এই দুই মুদ্রা এখনো আন্তর্জাতিকভাবে শক্ত গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তবু চীন ও ভারতের ওপর বাংলাদেশ আস্থা রাখতে পারে বন্ধু দেশ হিসেবে। এদের মুদ্রায় বাণিজ্য উদ্যোগে বাংলাদেশের ডলার রিজার্ভের ওপর চাপ কিছুটা হলেও কমবে। কিন্তু অদূরভবিষ্যতে বৈচিত্র্যময় পণ্য ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এসব দেশ যেসব শুল্ক সুবিধা দেয়, তা কাজে লাগাতে হবে। ভারতের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যের ৯০ শতাংশই স্থলপথে। স্থল কাস্টমসে প্রচুর সমস্যা রয়েছে, যা আমাদের সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। ডিডলারাইজেশনের এই যুগে আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, রপ্তানি বাড়িয়ে রুপি, ইউয়ান, রুবল, রিয়ালসহ বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করা। দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে কাজে লাগিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশকে চাপ প্রয়োগ করা যেতে পারে, যাতে সে আরও পণ্য বাংলাদেশ থেকে আমদানি করে। সর্বোপরি কূটনৈতিক ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে কারেন্সি সোয়াপ যেহেতু জটিল বিষয়, সেহেতু বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে জ্ঞানাভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি।
লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি








































