গ্যাস সংকট আরও প্রকট

কবে চালু হবে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল


সংবাদ প্রকাশ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ০১:০০ পিএম
কবে চালু হবে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল

মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) চার দিনেও ত্রুটি সারানো যায়নি। এ কারণে সারা দেশে গ্যাস সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। শুক্রবার বন্ধের দিনে দেশের নির্দিষ্ট কিছু এলাকা ছাড়া বেশির ভাগ এলাকায় গ্যাস ছিল না। সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়া, ধনুয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় কমপক্ষে ২০০ কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। সারা দেশে বেশির ভাগ সিএনজি স্টেশন গ্যাস দিতে পারছে না। আবার অনেক সিএনজি স্টেশন গ্যাস দিতে না পেরে বন্ধ করে রেখেছে। বাসাবাড়িতেও মারাত্মক গ্যাস সংকট চলছে।


গত মঙ্গলবার সকালে শর্ট সার্কিট থেকে এক্সিলারেটরের এফএসআরইউতে আগুন লাগলে মাতারবাড়ী ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে সারা দেশে গ্যাস সরবরাহে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসে। দেশে দৈনিক ২৬৫ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে বিদেশ থেকে আমদানি করা এলএনজি দুটি টার্মিনাল দিয়ে সরবরাহ করা হতো ১১ কোটি ঘনফুট। এখন একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় এলএনজি সরবরাহ কমেছে ৪৫ কোটি ঘনফুট। যে কারণে সেই সরবরাহ ঠেকেছে ২২০ কোটি ঘনফুটে।

আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এক্সিলারেটর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পোড়া ক্ষত সারাতে যুক্তরাজ্য থেকে তিনজন প্রকৌশলী আনা হয়। তারা গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে টার্মিনালে আগুনে পুড়ে যাওয়া কেবলগুলো নতুন করে সংযোগ দেওয়ার কাজ করছেন। তবে তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত টার্মিনালটি চালু করা যাচ্ছে না। শুক্রবার সন্ধা ৭টায় তাদের সঙ্গে পেট্রোবাংলার বৈঠক হয়। বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার টার্মিনাল চালুর ব্যাপারে জানতে চাইলেও তারা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি। এলএনজি টামিনাল চালুর বিষয়ে দিনক্ষণও জানাতে পারেননি। শুক্রবার সন্ধ্যায় আংশিকভাবে চালুর কথা থাকলেও এর মেরামত শেষ না হওয়ায় পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।

ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি চালু করার জন্য যুক্তরাজ্যের তিন প্রকৌশলী পুড়ে যাওয়া কেবল পুনঃস্থাপন করতে অবিরাম কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

টার্মিনালে কেন ত্রুটি হলো তা খতিয়ে দেখছেন তারা। টার্মিনালটির অপারেটর এক্সিলারেটর পেট্রোবাংলাকে জানিয়েছে, শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে তারা এটি চালু করবে না। তাই একটু সময় লাগছে। টার্মিনাল ত্রুটিমুক্ত না হলে জাহাজ থেকে এলএনজি খালাস আরও বিপজ্জনক হয়ে পড়বে বলে মনে করেন তারা। তখন পুরো বাংলাদেশে গ্যাস সিস্টেমে আরও গভীর সমস্যা হতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে টার্মিনালের অপারেটর এক্সিলারেটরের একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, বৃহস্পতিবার রাত থেকে বিদেশ থেকে প্রকৌশলীরা এসে কাজ শুরু করেছেন। তারা শুক্রবারও কাজ করেন। তাদের গ্রিন সিগন্যাল না পাওয়া পর্যন্ত টার্মিনাল চালু করা যাবে না। গ্যাসের অভাবে সারা দেশে হাহাকার চলছে। তা মাথায় রেখে দ্রুত সারানোর কাজ চলছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দ্রুত ত্রুটি মেরামতের জন্য এক্সিলারেটরকে তাগাদা দেওয়া হয়েছে।

তিতাস এবং বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তারা যুগান্তরকে জানান, গ্যাসের অভাবে শিল্প খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। আশুলিয়া, গাজীপুর, ধনুয়াসহ বিভিন্ন এলাকার শত শত কারখানা এখন বন্ধ। একটি কারখানার মালিক ফোন করে তিতাসের কাছে জানতে চান, কবে নাগাদ গ্যাস পাওয়া যাবে। শ্রমিকদের ফ্যাক্টরিতে বসিয়ে রাখবে নাকি ছুটি দিয়ে দেবে। তিতাসের এক কর্মকর্তা বলেন, শ্রমিকদের আপাতত ছুটি দিতে ওই কারাখানা মালিককে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যদিও পেট্রোবাংলা জানায়, শিল্প খাতে শুক্রবার গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বাড়নো হয়েছে। কমানো হয়েছে বিদ্যুৎ খাতে। মঙ্গলবার দুর্ঘটনার পর বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ ছিল ৭৫ কোটি ঘনফুট। এখন করা হচ্ছে ৬৮ কোটি ঘনফুট। বাকি গ্যাস শিল্প এবং সিএনজি খাতে বাড়ানোর জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। গত শুক্রবার রাত ১টায় সারা দেশে লোডশেডিং হয়েছে ৯২৪ মেগাওয়াট। এদিন দুপুর ১টায় লোডশেডিং ছিল ২৬০ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা জানান, সারা দেশে এখন বৃষ্টি হচ্ছে। তাই বিদ্যুতের চাহিদা অনেক কমেছে। ফলে বিদ্যুৎ নিয়ে হৈ চৈ হচ্ছে না। এ সময় বৃষ্টি না হলে বিদ্যুতের সরবরাহ ভয়াবহ আকার ধারণ করত।

পিডিবি জানিয়েছে, এতদিন গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো ৬ হাজার মেগাওয়াট। শুক্রবার তা নেমে এসেছে ৩৫০০ মেগাওয়াটে। দুপুর ২টায় সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১২ হাজার ৪৫৮ মেগাওয়াট। তবে সরবরাহ করা হয়েছে ১২ হাজার ২০১ মেগাওয়াট। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, টার্মিনাল চালু হতে যত বেশি সময় লাগবে দেশে গ্যাস সংকট তত বেশি বাড়বে। এমনকি টার্মিনাল চালুর ২-৩ দিনেও গ্যাস সরবরাহ সিস্টেম স্বাভাবিক হবে না। কারণ পাইপলাইনের গ্যাস পূর্ণ হতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। তারা বলেন, শুক্রবার এবং শনিবার সরকারি বন্ধের কারণে গ্যাসের চাহিদা কিছুটা কম। কিন্তু রোববার থেকে অফিস আদালত এবং সব ফ্যাক্টরি চালু হলে দেশে গ্যাসের জন্য আরও হাহাকার বাড়বে।

Link copied!