শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠিত হয়। একটি রাজনৈতিক দলের পরিচিতি ও জনমানসে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরির অন্যতম মাধ্যম হলো প্রতীক। জিয়াউর রহমান অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী চিন্তা থেকে তাঁর দলের জন্য "ধানের শীষ" প্রতীকটি নির্বাচন করেছিলেন।
এই প্রতীক নির্বাচনের পেছনে কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের আত্মপরিচয় গভীরভাবে জড়িত ছিল।
বাংলাদেশের প্রাণভোমরা হলো এর গ্রাম ও কৃষি। তৎকালীন সময়ে এদেশের সিংহভাগ মানুষ সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং গ্রামীণ অর্থনীতিই ছিল রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড।
জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, উন্নয়ন এবং রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত পল্লি জনপদ। ধানের শীষ মূলত সেই কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সমৃদ্ধি এবং কৃষকের শ্রমের সার্থকতার প্রতীক। ধানের শীষ যখন পুষ্ট হয়, তখন তা সোনালি রঙ ধারণ করে যা কৃষকের ঘরে অন্ন ও হাসির প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসে।
জিয়াউর রহমান চেয়েছিলেন এমন একটি প্রতীক যা দেখলে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ মুহূর্তেই নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাবে। ধানের শীষের মাধ্যমে তিনি মূলত "উৎপাদনের রাজনীতি"র বার্তা দিতে চেয়েছিলেন, যা তাঁর ঘোষিত ১৯ দফার অন্যতম মূল ভিত্তি ছিল।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিচার করলে দেখা যায়, ধানের শীষ প্রতীকটি বেছে নেওয়ার মাধ্যমে জিয়াউর রহমান একটি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। খাদ্য নিরাপত্তা এবং স্বনির্ভরতা ছিল তাঁর শাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তিনি প্রায়ই বলতেন, "ভিখারি জাতির কোনো সম্মান নেই।"
দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার যে সংগ্রাম তিনি শুরু করেছিলেন, ধানের শীষ ছিল সেই সংগ্রামের দৃশ্যমান স্মারক। এই প্রতীকটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা শ্রেণির নয়, বরং এটি বাংলার আপামর জনতার অতি পরিচিত এক দৃশ্য। লাঙল বা কাস্তের মতো শ্রমের সরঞ্জামের চেয়েও ধান নিজেই যখন প্রতীক হিসেবে সামনে আসে, তখন তা সরাসরি মানুষের অন্নের সংস্থান ও সচ্ছলতাকে নির্দেশ করে।
এর মাধ্যমে তিনি উন্নয়নমুখী রাজনীতির একটি নতুন বয়ান তৈরি করেছিলেন, যা তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী ধারার বাইরে গিয়ে একটি নিজস্ব বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের পরিচয় তুলে ধরে।
রাজনৈতিক কৌশলের দিক থেকেও ধানের শীষ ছিল অত্যন্ত কার্যকর। তৎকালীন সময়ে নির্বাচনী প্রচারণায় সাধারণ ও কম শিক্ষিত ভোটারদের কাছে জটিল রাজনৈতিক দর্শন বোঝানোর চেয়ে একটি পরিচিত ও অর্থবহ দৃশ্যপট উপস্থাপন করা ছিল অনেক সহজ।
ধানের শীষ বাংলার মাঠে-ঘাটে সর্বত্র দৃশ্যমান বলে এটি সহজেই মানুষের মনে গেঁথে যায়। এছাড়া ধানের শীষ শান্তি এবং প্রাচুর্যের প্রতীক হিসেবেও সমাদৃত। জিয়াউর রহমান যখন ১৯ দফার ভিত্তিতে গ্রাম সরকার ও খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে একটি নীরব বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন, তখন ধানের শীষ সেই কর্মযজ্ঞের ফসল হিসেবে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়।
উল্লেখ্য যে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তৎকালীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী) ধানের শীষ প্রতীকটি ব্যবহার করেছিল। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান যখন দল গঠন করেন, তখন মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর অনুসারীদের একটি বড় অংশ তাঁর সাথে যুক্ত হয়। সেই সূত্রে এবং কৃষকের অধিকার রক্ষার ধারাবাহিকতায় জিয়াউর রহমান এই প্রতীকটিকে নিজের দলের জন্য বেছে নেন।
এটি মূলত গ্রামীণ তৃণমূলের সাথে বিএনপির এক অবিচ্ছেদ্য সংযোগ তৈরি করে দিয়েছিল যা আজও দলটির প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
জিয়াউর রহমানের ঘোষিত "১৯ দফা" কর্মসূচিসমূহ:
১. সর্বতোভাবে দেশের স্বাধীনতা, অখন্ডতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।
২. শাসনতন্ত্রের চারটি মূলনীতি, অর্থাৎ সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি সর্বাত্মক বিশ্বাস ও আস্থা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, সমাজতন্ত্র জাতীয় জীবনে সর্বাত্মক প্রতিফলন।
৩. সর্ব উপায়ে নিজেদেরকে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসাবে গঠন করা।
৪. প্রশাসনের সর্বস্তরে, উন্নয়ন কার্যক্রমে ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
৫. সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কৃষি উন্নয়ন এর মাধ্যমে গ্রামীণ তথা জাতীয় অর্থনীতিকে জোরদার করা।
৬. দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা এবং কেউ যেন ক্ষুধার্ত না থাকে তা নিশ্চিত করা।
৭. দেশে কাপড় এর উৎপাদন বাড়িয়ে সকলের জন্য অন্তত মোটা কাপড় নিশ্চিত করা।
৮. কোন নাগরিক যেন গৃহহীন না থাকে তার যথাসম্ভব গৃহায়ণ ব্যবস্থা করা।
৯. দেশকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা।
১০. সকল দেশবাসীর জন্য নূন্যতম চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
১১. সমাজে নারীর যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা এবং যুবসমাজকে সুসংহত করে জাতি গঠনে উদ্বুদ্ধ করা।
১২. দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি খাতে প্রয়োজনীয় উৎসাহ প্রদান দান।
১৩. শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি সাধন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির সার্থে সুস্থ শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি সাধন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির স্বার্থে সুস্থ শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।
১৪. সরকারী চাকরিজীবীদের মধ্যে জনসেবা ও দেশ গঠনের মনোবৃত্তি উৎসাহিত করা এবং তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন করা।
১৫. জনসংখ্যা বিস্ফোরণ রোধ করা।
১৬. সকল বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা এবং মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করা।
১৭. প্রশাসন এবং উন্নয়ন ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা।
১৮. দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়নীতি ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা।
১৯. ধর্ম, গোত্র ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অধিকার পূর্ণ সংরক্ষণ করা এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় করা।
ইরফান ইবনে আমিন পাটোয়ারী, শিক্ষার্থী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
তথ্যসূত্র:
১. জাতীয় রাজনীতি (১৯৪৫-৭৫) _ ওলি আহাদ।
২. জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ _ মাহফুজ উল্লাহ্।
৩. আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর _ আবুল মনসুর আহমদ।
৪. নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশ: প্রতীক বরাদ্দের ইতিহাস ও নথিপত্র।







































