পবিত্র রমজান শুরুর আগে থেকেই নিত্যপণ্যের বাজারে যে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির হাওয়া লেগেছিল, চার রোজা পেরিয়েও তা পুরোপুরি থামেনি রাজধানীর বাজারগুলোতে। বিশেষ করে মাছ ও সবজির বাজারে এখনো চলছে অস্থিরতা। তবে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম কিছুটা নিম্নমুখী হওয়ায় ক্রেতাদের মাঝে সামান্য হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক মাস আগে টাস্কফোর্স গঠন করে আমদানি পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিয়েছিল। একই সঙ্গে এফবিসিসিআইও পণ্যমূল্য না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন নেই বললেই চলে। রোজার এক সপ্তাহ আগে থেকেই মুদিপণ্য, সবজি, মাছ ও মাংসে সিন্ডিকেটের কারসাজি শুরু হয়।
মুরগির বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন
রমজান শুরুর চার দিন পর এসে মুরগির বাজারে কিছুটা স্বস্তির ছবি মিলছে। গত সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগি ২০০ থেকে ২২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় নেমেছে। একইভাবে সোনালি মুরগির দামও ৩৫০ টাকা থেকে কমে ৩২০ টাকা কেজিতে ঠেকেছে।
মালিবাগ বাজারে বাজার করতে আসা গাজী ইমাম হোসেন বলেন, 'রোজার প্রথম দিকে দামের চাপে মাসিক বাজার করতে পারিনি। আজ এসেছি, দাম কিছুটা কম — তবে আশানুরূপ হয়নি।'
মাছের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী দাম
মুরগিতে স্বস্তি মিললেও মাছের বাজারে পরিস্থিতি ভিন্ন। রমজানে মাংসের বিকল্প হিসেবে মাছের চাহিদা বাড়ায় সব ধরনের মাছের দাম চড়া রয়েছে। সাধারণ মানের রুই ও কাতলা মাছ ওজনভেদে প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষের ভরসার পণ্য পাঙাশ ও তেলাপিয়াও কেজিপ্রতি ২২০ থেকে ২৫০ টাকায় উঠে গেছে।
এ ছাড়া পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, শিং ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকা এবং আকারভেদে চিংড়ি ৭৫০ থেকে ১২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতাদের দাবি, আড়তে সরবরাহ সংকটের কারণেই দাম এতটা বেড়েছে।
সবজির বাজারে এখনো চড়া দাম
ইফতারের অপরিহার্য উপাদান লেবু, শসা ও বেগুনের দাম এখনো চড়া। তবে রোজার শুরুর তুলনায় লেবুর দাম কিছুটা কমেছে। শুরুতে হালি ১৫০ টাকা ছুঁয়েছিল লেবু; বর্তমানে মাঝারি আকারের লেবু ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং ভালো মানের লেবু ১০০ থেকে ১২০ টাকা হালিতে মিলছে।
শসা কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং বেগুন ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা রমজানের আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের দোকানদার বাহার হোসেন বলেন, 'রমজানে এককালীন চাহিদা কমে এসেছে, তাই দাম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।'
গরু-খাসির মাংস ও মুদিপণ্যে চাপ অব্যাহত
গরু ও খাসির মাংসের বাজারে গতকাল সর্বোচ্চ অস্থিরতা দেখা গেছে। গরুর মাংস কেজিপ্রতি ৮২০ থেকে ৮৫০ টাকা এবং হাড়ছাড়া মাংস ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। খাসির মাংসের দাম উঠেছে ১০৫০ থেকে ১৩০০ টাকা কেজিতে।
মুদিপণ্যের মধ্যে ছোলা ৯৫ থেকে ১০৫ টাকা এবং চিনি ১০০ থেকে ১১০ টাকায় মোটামুটি স্থির থাকলেও সয়াবিন তেল নিয়ে ক্রেতাদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি। খোলা সয়াবিন তেল ১৮৫ থেকে ২০০ টাকা এবং পাম তেল ১৫৫ থেকে ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেলেরও সংকট লক্ষ্য করা গেছে। চালের বাজারে মোটা চাল ৫৪ থেকে ৬০ টাকা এবং নাজিরশাইল বা মিনিকেট চাল ৮০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খেজুরে শুল্ক ছাড়ের প্রভাব নেই
আমদানি শুল্ক কমানো হলেও বাজারে খেজুরের দামে কোনো সুফল মেলেনি। সাধারণ মানের জাহিদি খেজুর ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং উন্নত মানের মরিয়ম বা আজওয়া খেজুর ১০০০ থেকে ১৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বেসরকারি চাকরিজীবী হাসান মাহমুদ বলেন, 'রোজার শুরু থেকেই ভাবছিলাম দাম কমবে, কিন্তু প্রতিদিন বাজারে এসে নতুন দাম শুনতে হচ্ছে। লেবু আর সয়াবিন তেলের দাম যেভাবে বেড়েছে, সেহরি-ইফতারে কাটছাঁট করা ছাড়া উপায় নেই।'
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
খুচরা বিক্রেতারা এই ঊর্ধ্বগতির জন্য পাইকারি আড়তদার ও করপোরেট কোম্পানিগুলোকে দায়ী করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া সমাধান নেই। উন্নয়নকর্মী মুনিরা চৌধুরী বলেন, 'পরিকল্পিত উৎপাদন ও বণ্টন সমন্বয় এবং আইনের কঠোর প্রয়োগই কেবল বাজারকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে — সাধারণ জনগণকে স্বস্তি দিতে এর বিকল্প নেই।'
বাজার বিশ্লেষকরাও একমত যে, টিসিবির কার্যক্রম আরও জোরদার না করলে এবং অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ না নিলে সাধারণ ভোক্তার এই আর্থিক চাপ ও ভোগান্তি সহজে কমার নয়।

































