বাংলাদেশে আটক সাংবাদিকদের বিষয়ে পৃথিবীর বিশিষ্ট ৬৩ জনের যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছেন আইনজীবী, মানবাধিকার রক্ষাকারী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও সুশীল সমাজের সদস্যরা।
সোমবার (২২ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে পৃথিবীর বিশিষ্ট ৬৩ জনের যৌথ বিবৃতিতে।
প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে লেখেন, আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাক্ষরকারী আইনজীবী, মানবাধিকার রক্ষাকারী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও সুশীল সমাজের সদস্যরা, ৫ আগস্ট ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের নির্বিচারে আটক ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি।
বিবৃতিতে আরও জানান, শাহরিয়ার কবির, ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল হক বাবু, শ্যামল দত্ত এবং আনিস আলমগীর-সহ আরও কয়েক ডজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো সংবাদমাধ্যম ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর দমন-পীড়নের এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগসহ বিস্তৃত ধারায় এসব মামলা পরিচালিত হচ্ছে, যা বৈধ সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক মতামতকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার ইঙ্গিত দেয়।
আমাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো হলো
সমালোচনামূলক কণ্ঠ রোধে অস্পষ্ট ও অতিরঞ্জিত আইনি বিধানের ব্যবহার। রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ ও সন্ত্রাসবাদের মতো অভিযোগ স্বচ্ছ প্রাথমিক প্রমাণ ছাড়াই প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর শীতল প্রভাব ফেলছে। একাধিক মামলায় পদ্ধতিগত লঙ্ঘনের অভিযোগ, যেমন—বারবার জামিন প্রত্যাখ্যান, আইনজীবীর সঙ্গে পর্যাপ্ত যোগাযোগের সুযোগ না দেওয়া, বয়স্ক বা অসুস্থ আটক ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবার ঘাটতি। বিভিন্ন অধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের স্বেচ্ছাচারী আটক বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপসহ ইতিমধ্যে অন্তত একটি আটককে বেআইনি বলে মত দিয়েছে। দমন-পীড়নের মাত্রা উদ্বেগজনক: ১৩০ জনের বেশি সাংবাদিক মামলা বা অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন যার মধ্যে ১৯টি পৃথক ঘটনায় ২৭ জনকে আটক করা হয়েছে। ২৫ জন সাংবাদিককে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ মামলায় নামকরণ করা—সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানোর সমন্বিত প্রচেষ্টার ইঙ্গিত বহন করে। ৭৫ বছর বয়সী সাংবাদিক, লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও মানবাধিকার কর্মী শাহরিয়ার কবিরের মতো ব্যক্তিত্বকে লক্ষ্যবস্তু করা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। যুদ্ধাপরাধের নথিভুক্তকরণ ও ন্যায়বিচারের পক্ষে দীর্ঘদিন কাজ করার ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রাখার অভিযোগ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। গুরুতর অপরাধের অভিযোগ এনে বিচার বা তদন্ত ছাড়াই দীর্ঘ সময় কারাগারে আটক রাখা এবং জামিন মঞ্জুর হওয়ার পরও অন্যান্য মামলায় ‘গ্রেপ্তার দেখানো’—ন্যায়বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
আমরা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নবনির্বাচিত সরকারের প্রতি এই আহ্বান জানাই, শুধুমাত্র পেশাগত কাজ বা রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের কারণে আটক সকল সাংবাদিককে অবিলম্বে ও নিঃশর্ত মুক্তি দিন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড লঙ্ঘনকারী ও বিশ্বাসযোগ্য প্রাথমিক প্রমাণবিহীন অভিযোগ প্রত্যাহার করুন। বৈধ মামলায় অভিযুক্ত সাংবাদিকদের জন্য সুষ্ঠু তদন্ত, ন্যায্য বিচার, সময়মতো জামিন শুনানি, আইনজীবীর সুযোগ ও মানবিক আটকের পরিবেশ নিশ্চিত করুন। ভিন্নমত ও সাংবাদিকতা দমনে সন্ত্রাসবিরোধী ও জনশৃঙ্খলা আইন অপব্যবহার বন্ধ করুন। দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের অবস্থা মূল্যায়নে স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আমন্ত্রণ জানান।
একটি মুক্ত সংবাদমাধ্যম যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি। বাংলাদেশে আটক সাংবাদিকরা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ একটি উদ্বেগজনক বার্তা দেয়—সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা সুরক্ষার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখোমুখি হতে পারে। আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার প্রয়োগ ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে নির্বিচারে আটক সকল ব্যক্তির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছি।






























