আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে সক্রিয় হয়ে উঠেছে অস্ত্র কারবারিরা। সীমান্তপথে অবৈধ অস্ত্রের চালান প্রবেশ করছে এবং প্রায় প্রতিদিনই ঢুকছে আগ্নেয়াস্ত্র।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্রে জানা গেছে, গত ছয় মাসে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জেই জব্দ হয়েছে ১২টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৪১ রাউন্ড গুলি ও সাড়ে ৯ কেজি বিস্ফোরক। জানুয়ারির শুরুতে শিবগঞ্জ উপজেলার আজমতপুর সীমান্তের আমবাগান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে দুটি ওয়ান শুটারগান। এর আগে একাধিক দফায় পিস্তল ও গুলি জব্দ করা হয়েছে।
পরিস্থিতি সামলাতে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি ও অভিযান জোরদার করেছে পুলিশ। মাঠে রয়েছেন বিজিবি ও র্যাব সদস্যরাও। তবুও সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র চোরাচালান পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে অন্তত ৪০ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া নেই। মূলত এই ফাঁকা স্থান দিয়ে অবৈধ অস্ত্র ঢুকছে। সীমান্ত পাহারায় বিজিবির তিনটি ব্যাটালিয়ন থাকলেও কারবারিরা কৌশলে কাজ চালাচ্ছে। যেসব অস্ত্র বিজিবির হাতে ধরা পড়ছে, তার বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি নাইন এমএম পিস্তল।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী, পবা, বাঘা ও চারঘাট সীমান্ত থেকেও অস্ত্র প্রবেশ করছে এবং সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। এসব অস্ত্র ভোটের সময় সহিংসতা সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. জামাত খান বাংলানিউজকে বলেন, "সীমান্তপথে অবৈধ অস্ত্র আনা হচ্ছে এবং থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি। এগুলো ভোটের সময় ব্যবহার হতে পারে। ভোটার হিসেবে আমি আতঙ্কিত। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ভোটকেন্দ্রগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে।"
রাজশাহী-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু বাংলানিউজকে বলেন, "অবৈধ অস্ত্রধারীরা যে দলেরই হোক, তারা জাতির শত্রু। তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।"
নির্বাচন সামনে রেখে নিরাপত্তা বাহিনী সীমান্তবর্তী ২৭ জেলায় অস্ত্র চোরাচালানে জড়িত ৭৮৭ জন লাইনম্যানের তালিকা তৈরি করেছে। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৮ জন, রাজশাহীতে ৩ জন, জয়পুরহাটে ১৬ জন এবং নওগাঁয় ১৯ জন রয়েছেন। বাকিরা অন্যান্য এলাকায়। তাদের ওপর বিশেষ নজরদারি চলছে। বিজিবি নিয়মিত নতুন অস্ত্র কারবারিদের শনাক্ত করে তালিকা হালনাগাদ করছে।
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রাজশাহী বিভাগে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র ঢুকছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ দিয়ে। শিবগঞ্জ উপজেলার রাণীনগর হঠাৎপাড়া, শাহাপাড়া, পণ্ডিতপাড়া, বালিয়াদিঘি ও অন্যান্য গ্রামের কিছু ব্যক্তি সীমান্তপথে অস্ত্র আমদানির সঙ্গে জড়িত বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিশ্চিত করেছে।
অস্ত্র চালান ধরা পড়ছে না এমন নয়। গত বছরের ২৬ অক্টোবর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ছেড়ে যাওয়া বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনে অভিযান চালিয়ে আটটি বিদেশি পিস্তল, ১৪টি ম্যাগাজিন, ২৬টি গুলি, গানপাউডার ও প্লাস্টিক বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী। এসব অস্ত্র সীমান্ত থেকে ঢাকায় নেওয়া হচ্ছিল।
এর আগে গত ১৬ আগস্ট রাজশাহী নগরের কাদিরগঞ্জ এলাকার একটি কোচিং সেন্টারে অভিযান চালিয়ে দুটি বিদেশি এয়ারগান, একটি রিভলবার ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার হন মুনতাসিরুল আলম অনিন্দ্য নামের এক ব্যক্তি। তিনি নিষিদ্ধ কার্যক্রমে যুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের চাচাতো ভাই।
গত ডিসেম্বর ও চলতি জানুয়ারিতেও একের পর এক অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। ৫ ডিসেম্বর বাঘার জোত কাদিরপুর এলাকায় দুটি ওয়ান শুটারগান ও হেরোইন উদ্ধার করে র্যাব। ১২ জানুয়ারি রাজশাহী নগরের সিটিহাট এলাকায় জেলা আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত কার্যালয়ের পাশ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি গুলি ও একটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ। তানোর, কাটাখালীসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় র্যাব ও বিজিবির অভিযানে মিলেছে পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা দাবি করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, "অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনায় বিশেষভাবে কাজ চলছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু বড় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। সীমান্ত অপরাধ কমেছে এবং ভোটের পরিবেশও স্বাভাবিক।"
বিজিবির রাজশাহীর ১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াজ শাহরিয়ার জানান, "পদ্মা নদীতে সাতটি স্পিডবোট দিয়ে নজরদারি করা হচ্ছে। ভোট উপলক্ষে সাত শতাধিক বিজিবি সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।"




















