’৪৭-এর পর থেকেই আমাদের এখানে সুসংহত গণতন্ত্র কখনোই প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পাকিস্তান শাসনের আমলে আমরা দেখেছি সামরিক শক্তি বারবার ক্ষমতায় এসে জনগণের কণ্ঠকে রুদ্ধ করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও সেই অভিশাপ থেকে বাংলা মুক্তি পায়নি। জাতির জনকের হত্যার পর জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক শক্তির ওপর ভর করে এ দেশের সাধারণ মানুষের আশা-ভরসা, স্বপ্নকে মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছেন দীর্ঘদিন। নব্বইয়ের দশকে এসে বাংলার জনগণ রাজনৈতিকভাবে সংঘবব্ধ হতে শুরু করে। জনগণ স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে পথে নেমে আসে। জনগণের তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৯৮৬ সালে এরশাদ জাতীয় নির্বাচন দেন। এটি ছিল একটি প্রহসনের নির্বাচন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের চক্ষু পরিষ্কারের চেষ্টা চালান তিনি। কিন্তু জনগণকে বোকা বানানো এত সহজ নয়। বঙ্গবন্ধু শারীরিকভাবে না থাকলেও তাঁর আদর্শ ও চেতনা বাঙালির হৃদয়ে চির অম্লান। তিনি বাঙালিকে শিখিয়ে গেছেন কীভাবে রাজপথে নিজের অধিকার আদায় করতে হয়। ফলে ৮৬ সালের পরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন আরও বেগবান হয়। আমরা জানি, শামসুর রাহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, মোহাম্মদ রফিক, রফিক আজাদ, রুদ্র মোহাম্মদ শহিদুল্লাহসহ অনেক কবি-সাহিত্যিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এবং নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছিলেন।
এই প্রেক্ষাপট নিয়ে রচিত গল্প হাসান আজিজুল হকের ‘অচিন পাখি’। অগণতান্ত্রিক পরিবেশে সাধারণ মানুষের আত্মা রুদ্ধ হয়ে থাকে। স্বপ্ন, আশা, আকাঙ্ক্ষাগুলো বন্দি হয় অচেনা খাঁচায়। ‘অচিন পাখি’ গল্পটি লেখা হয়েছে ১৯৮৮ সালে। তার কিছুদিন আগে (১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর) নুর হোসেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে শহীদ হন। অর্থাৎ লেখক যখন গল্পটি লিখছেন, তখন রাজপথ ভীষণ উত্তপ্ত। গল্পের শুরুটা এমন—গত অঘ্রান মাসের পাঁচ তারিখে আমি একটা পাখি কিনি। আমি কিনি না বলে আমার বারো বছরের ছেলেটা কেনে বলাই ঠিক হবে।’ গল্পের এই পাখি ও ক্লাস সেভেনে পড়া বাবুল একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। গল্পের কথক হচ্ছে বাবুলের বাবা। তিনি প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার। সামান্য বেতনে টানাটানির সংসার। সন্তানের সামান্য শখ পূরণটাও তার জন্য বিলাসিতা। ছেলের বায়না—তার একটা পাখি চায়। কথক জানে পাখি কিনলে সারা মাস ভাতের সাথে এক দিনও ডাল পাওয়া যাবে না। তবু পাখিটা তার কিনতেই হবে। ছেলের সামান্য বায়না মেটাতে না পারলে তার পিতৃহৃদয়ে বেদনার রক্ত ক্ষরণ হবে। চল্লিশ টাকা দরের চন্দনা পাখি শেষ পর্যন্ত খাঁচাসমেত পঁচিশ টাকায় কেনা হলো। খাঁচাটা ছিল খুব ছোট চন্দনার লেজ প্রায় সবটা বাইরে বেরিয়ে থাকত।
স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণ ফুঁসে উঠেছে। সারা দেশে চলছে হরতাল! স্কুল বন্ধ। তবু বাবুল বাড়িতে থাকে না। পথে বেরিয়ে যায়। মিছিলে যোগ দেয়—স্লোগানে কণ্ঠ মেলায়। কথক সন্তানের এই বিষয়টি নিয়ে ভীষণ বিচলিত। ‘ওদের স্কুলেও হরতাল, আমি বলি বাইরে বেরিয়ে কাজ নেই, ঐসব আন্দোলন-টান্দোলন কি আমাদের পোষায়! গরিবের ছেলে, সবকিছু আগে থেকে মেনে নিবি, ছা-পোষা মানুষের ঘাড়ের রগ আলগা সেটা তো সত্যি কথা।’ কথকের এই বক্তব্যে মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্ট স্পষ্ট। মধ্যবিত্তরা সাধারণত সমাজে রাষ্ট্রের ক্রান্তিলগ্নে নিজেকে গুটিয়ে লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করে। তবু কেউ কেউ এই বলয় ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে। যেমন কিশোর বাবুল— কিন্তু ওকে এসব বলে কোনো লাভ নেই। এখন দিনের পর দিন হরতাল আর রাস্তায় কেবলই মিছিল—ওকে বাড়িতে পাওয়া দায়।’
খাঁচার ভেতর চন্দনার আস্ফালনে কথক পাখির মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন। ‘মাটির দুটি ছোট ভাঁড়ের একটিতে পানি আর একটিতে কয়েক দানা ভাত দিয়ে ভিতরে রেখে দেওয়া হলো। চন্দনা সেদিকে চেয়েও দেখল না। খাঁচার ভিতরে তার ওড়ার ভঙ্গি, দুই কাঁধ একটু উঁচু হয়ে আছে—ডানা আধখোলা, মাথা গলা কাঁধের মধ্যে অনেকটা ঢোকানো। আমরা তার পাশে বসে মুক্তি পাবার এই অবিশ্রান্ত চেষ্টা দেখতে লাগলাম। চন্দনার মাথা উঠছে— নামছে দ্রুত তালে, শুধু একবারের জন্য দরজা খোলা পেলে হয়, শাঁ করে বাতাস কেটে সে শূন্যে মিলিয়ে যাবে।’ ঠিক সেই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা কথক দেখেছে বাবুলের মাঝে। এমনও হতে পারে, কথক তার হৃদয়ের কোণে লুকিয়ে থাকা স্বৈরশাসকের হাত থেকে মুক্তির তীব্র বাসনার প্রতিচ্ছবি সন্তানের মাঝে খুঁজেছে। ‘দেখতে দেখতে আমার মাথা ঘুরতে শুরু করল। কখন শেষ হবে এই চেষ্টা? একমাত্র মৃত্যুতেই কি? এই নিদারুণ আক্ষেপ, এই কষ্ট, এই ভয়ানক আগ্রহ, এই দুরন্ত চঞ্চলতা ধরে রাখার জন্য ছোট্ট এই পাখির হালকা দেহটা কি যথেষ্ট?’
ছোট্ট খাঁচার মধ্যে চন্দনার আকুতি, ছটফট দেখে কথক আরেকটি বড় খাঁচা কেনার সিদ্ধান্ত নিল। কথকের আরেকটা খরচ বেড়ে গেল। পাখিটার জন্য দশ টাকা ধার করে খাঁচা কেনা হলো। সেই খাঁচায় কি পাখি সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকল সে কি আকাশ ভুলে গেল? না এমনটা হলো না। ‘দিনগুলো খুব আস্তে আস্তে কাটে। বাইরে বেরোই না, স্কুলে যাই না— সাগর গর্জনের মতো মিছিলের আওয়াজ কানে ভেসে আসে, যে বাতাস শব্দ বয়ে আনে, তার ঝপটায় কেঁপে ওঠে বস্তির বাড়িঘর। আমি আশা করতে থাকি পাখিটা শান্ত হয়ে আসবে, খাঁচার ভিতরটা তার পছন্দ হবে, আকাশ আলো আর হাওয়া আস্তে আস্তে ভুলে যাবে সে। আমাদের ভালোবাসায় আটকা পড়ে যাবে। বাবুল যতক্ষণ বাসায় থাকে ওর সাথে সময় কাটায়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, এতটুকু অস্থিরতা কমে না ওর। বড় খাঁচায় আসার পর থেকে পাখিটা যেন পুরোপুরি বিগড়ে গেছে। একদণ্ড সে সুস্থির থাকে না। অনবরত ঘষা খেয়ে, ভিজে, ধুলো লেগে শেষ পর্যন্ত দুখানি লম্বা লেজের পালক তার খসে গেল। চন্দনাকে আর যেন চেনা যায় না। লাল টুকটুকে ঠোঁট প্রায় সাদা হয়ে এসেছে। কালো চোখের ওপর কিসের ছায়া পড়েছে আমি জানি না।’ এই ছায়া আসলে ছিল বন্দিজীবনের বিভীষিকা। কথক আসলে সেই পাখির মাঝে আপনারে খুঁজে ফিরেছে। স্বৈরাচারের অবরুদ্ধ নগরে বন্দি মানুষগুলো আসলে ওই পাখির মতোই ছিল। যেকোনো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকে না, যেখানে একজন মানুষের খামখেয়ালিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় সেখানে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন অসম্ভব। সেই পরিবেশে মানুষগুলো বন্দি পাখির মতোই বেঁচে থাকে। চোখে থাকে মৃত্যুর ছায়া। পাখির এই বেদনার্ত জীবনের অন্তর্জ্বলা কথককে ঘুমোতে দেয় না। চোখ হয়ে ওঠে টকটকে লাল। মুখে পড়ে ভাঁজ। কথক বলে—অস্থির হয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসি আমি। বিশাল মিছিল আসছে, মিছিলের মাথায় উঠেছে আকাশ, বজ্রগর্জনের মতো চিৎকার আসছে, স্বৈরাচার নিপাত যাক।...আমি বিড়বিড় করছি, কিছু রাখা হবে না, সমস্ত গুঁড়িয়ে ফেলা হবে। পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি। তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে আসি। রান্নাঘরের দাওয়ায় ঝোলানো খাঁচার ভিতরে চন্দনা পাখির সেই উড়ে যাই, উড়ে চলি, উড়ে যাব—সেই আথলি-পাথলি, সেই অসহ্য পাছড়াপাছড়ি। ডানা আধখোলা, ডানার তলায় হেমন্তের এক চিলতে হলুদ রোদ, মাতা উঠছে নামছে।’ পাখির এই অস্থিরতা আসলে কথকের অন্তর্যাতনার বহিঃপ্রকাশ। আমরা জানি, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অধিক জনপ্রিয় স্লোগান ছিল—স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তিপাক।’ লেখক অত্যন্ত দৃঢ়তা ও সহসের সঙ্গে স্লোগানের প্রথম অংশটি গল্পে ব্যবহার করেছেন।
লেখক সিদ্ধান্ত নেন চন্দনাটিকে মুক্ত করে দেবেন। কথক তার ছেলে বাবুলকে ডেকে বলে, ‘বাবুল পাখিটা দ্যাখো।
সে বলে, দেখছি তো আব্বা।
ও চলে যেতে চাইছে বাপি, ও কিছুতেই এখানে থাকতে চাইছে না।
কেন আব্বা?
ও পোষ মানবে না, আমরা ওকে ছেড়ে দিই, কেমন?’
প্রথমে বাবুল রাজি হয় না। কথক তাকে বোঝায় পাখিটা কীভাবে স্বপ্ন দেখে নীল আকাশে রোদের ভেতর দিয়ে উড়ে যেতে। অশ্রুসজল বাবুল সম্মতি দেয়। চন্দনার খাঁচার দরজা খুলে দেওয়া হয় কিন্তু পাখি উঠে চলে যায় না। কারণ, সে বুঝে উঠতে পরে না যে সে মুক্ত হয়েছে। কথক বলে, ‘এসো বাবুল, দরজা খোলা থাক, আর আমরা দেখব না। যখন খুশি ও বেরিয়ে আসবে, তারপর উড়ে যাবে। না হয় নাই-বা দেখতে পেলাম ওর উড়ে যাওয়া! কী আর ক্ষতি তাতে?’
গল্পটি শেষ হয় একটি বিয়োগান্তক ঘটনার মধ্য দিয়ে। ‘দরজা খোলা থাকে। দিনের পর দিন কাটে। তারপর একদিন লক্ষ মানুষের মিছিলের কাঁধে চেপে আমার বাবুলের নিস্পন্দ শরীর বাড়িতে আসে। রান্নাঘরের বারান্দায় কাপড়ের আড়াল দিয়ে ওকে গোসল করানো হচ্ছে। আমি দেখতে পাচ্ছি ওর সেই আনন্দভরা অথচ বিষণ্ন লাজুক হাসি। আগ্রহে দীপ্ত মুখখানিতে আমি ছাড়া আর কে দেখতে পাবে সেই হাসি? সারা দেশের মানুষের তীর্থ আজ আমার এই প্রায়-বস্তি বাড়ি। স্বৈরতন্ত্র নিপাত যাক ধ্বনিতে এতক্ষণ কান ফেটে যাচ্ছিল। এখন শান্তি নেমে এসেছে। লক্ষ চোখে একটু একটু করে যে—পানি জমেছিল এইবার তা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মানুষের সমুদ্র। চেয়ে দেখলাম বাবুলের বুকে ছোট্ট একটা দরজা খোলা। সমস্ত আকাশের আলো ওই ছোট্ট একটুখানি দরজা দিয়ে বাবুলের ভেতরে ঢুকছে। সেই আলোয় ভর দিয়ে বাবুল অনেক আগে আকাশে উড়ে গেছে।
কী অদ্ভুত কাণ্ড! হঠাৎ চেয়ে দেখি খাঁচার দরজা যেমন খোলা ছিল তেমনই খোলা। খাঁচা শূন্য। চন্দনা কখন চলে গেছে।’
এখানে বাবলুর আত্মত্যাগ, পাখির মুক্তি দুটো ঘটনা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। আমরা জানি যে নব্বইয়ে স্বৈরতন্ত্রের পতনের আন্দোলনে শহীদ হন সেলিম, জয়নাল, কাঞ্চন, দিপালী, দেলোয়ার, তাজুল, জিহাদ, ময়েজউদ্দিন, বসুনিয়া, ডা. মিলন, নূর হোসেনসহ অনেকে। বাবলু তাদেরই প্রতিনিধি। আর স্বৈরতন্ত্রের হাত থেকে মুক্তির যে আকুতি আমরা কথকের মাঝে দেখেছি, তা ছিল আপামর সমগ্র বাংলার মানুষের আকুতি।








































