অস্থির বিশ্বে নেতৃত্বের বার্তা

জাপানের নতুন ভূমিকার রূপরেখা কিশিদার


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২৬, ১২:৪১ পিএম
জাপানের নতুন ভূমিকার রূপরেখা কিশিদার

‘অনিশ্চিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জাপানের কূটনীতি’। ইউক্রেন আর ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি জাপানের চারপাশে চীন-রাশিয়ার সক্রিয় সামরিক উপস্থিতিসহ চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে কিশিদার বক্তব্যের প্রতি সেখানকার সাংবাদিকদের প্রবল আগ্রহ দেখা যায়।

কিশিদা তাঁর বক্তব্যে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিবন্ধকতাগুলো এবং ভবিষ্যতে জাপানি কূটনীতির গতিপথ কেমন হওয়া উচিত, সেসব বিষয়েও অকপটভাবে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।

সাম্প্রতিক ইতিহাসের গতিধারা

কিশিদা বলেন, শীতল যুদ্ধের অবসানের পর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে এককভাবে চলে আসে যুক্তরাষ্ট্র। সেই সময় বিশ্ব কিছুটা শান্ত ও স্থিতিশীল সময় উপভোগ করলেও সেটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিশেষ করে চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্থান কৌশলগত প্রেক্ষাপট বদলে দেয়।

পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে বলেও মন্তব্য করেন কিশিদা। তাঁর মতে, এর কেন্দ্রে মূলত ছিল অসাম্য ও বিভাজন। বৈশ্বিক প্রতিবন্ধকতাগুলো ব্যাপক আকার ধারণ করে। ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে ক্ষমতার ভারসাম্য। এটিকে আরও জটিল করে তোলে ইউক্রেনে রুশ আক্রমণ।

কিশিদার মতে, এটি বল প্রয়োগের মাধ্যমে স্থিতাবস্থার পরিবর্তন, যা জাতিসংঘ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মৌলিক নীতির লঙ্ঘন। চার বছরের বেশি সময় পরও এ লড়াই চলছে, বিশ্ব ভুক্তভোগী হচ্ছে। কিশিদা বলেন, এর মধ্য দিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী যুগের অবসান ঘটছে। এটি এমন এক সন্ধিক্ষণ, যা মানব ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়ের আদলকে নির্ধারণ করবে।

‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রত্যাবর্তন

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের বিষয়গুলো কিশিদার বক্তব্যে বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় ফিরে আসা আবারও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে দেশটির পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তবে কিশিদা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার পক্ষপাতী।

জাপানের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান নীতিমালা মার্কিন জনগণের একটি অংশের সমর্থন পেয়েছে। তাই এটিকে কেবল একজন নেতার ব্যক্তিত্ব দ্বারা প্রভাবিত একটি অস্থায়ী ঘটনা হিসেবে দেখাটা ঠিক হবে না। একে আরও গভীর ও কাঠামোগতভাবে দেখতে হবে। এটি এমন এক প্রবণতা, যা যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আগামী বছরগুলোয় মোকাবিলা করতে হবে।

কিশিদার মতে, বিশ্বের বিভিন্ন অংশে চরম ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটেছে। কোথাও কোথাও প্রবল হচ্ছে অন্তর্মুখী প্রবণতা। কিশিদা বলেন, এসব ঘটনাপ্রবাহ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ, এগুলো বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গভীরে বিদ্যমান হতাশা ও উদ্বেগের প্রতিফলন।

জাপানের সামনে কোন পথ

পরিবর্তনশীল বিশ্বের জনবিন্যাস পাল্টে যাচ্ছে দ্রুতই। আগামী ৫০ বছরে জাপানসহ অনেক উন্নত অর্থনীতির দেশই বয়স্ক জনগোষ্ঠী এবং ক্রমহ্রাসমান জন্মহারের মুখোমুখি হবে। নতুন প্রেক্ষাপটে, এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো তাদের বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাবে। এ রকম এক পরিবর্তনশীল ভবিষ্যৎ এখন উঁকি দিচ্ছে বিশ্ব পরিসরে। এর প্রেক্ষাপটে জাপানের সামনে কোন পথ খোলা আছে?

কিশিদা বলেন, এর উত্তরটি সহজ। সেটি হচ্ছে, আইনের শাসনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান। অর্থাৎ বহুপক্ষীয়তা, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মুক্ত ও অবাধ বাণিজ্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। এসব মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করেই অংশীদারত্ব গড়ে তোলা উচিত। দেশগুলোকে একত্র করা এবং তাদের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করাও গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের সে পথেই অগ্রসর হওয়া উচিত বলে মনে করছেন কিশিদা।

প্রাকৃতিক সম্পদ ও অভ্যন্তরীণ বাজারের সীমাবদ্ধতা থাকায় জাপানের মতো দ্বীপরাষ্ট্রের জন্য এই নীতি ও মূল্যবোধ ছাড়া ভবিষ্যতের সুরক্ষা সম্ভব নয়। আবার অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে দৃঢ়তার সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই জাপানের। এ কারণে বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।

কিশিদার মতে, জাপানকে কূটনৈতিকভাবে দুটি পর্যায়ে এগোতে হবে। প্রথমত, আদর্শের অনুসরণ। দ্বিতীয়ত, প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তার সঙ্গে বাস্তবতার মোকাবিলা করা। জাপানের কূটনীতির ভবিষ্যৎ এই দুইয়ের সমন্বয়ের মধ্যেই নিহিত। যেখানে কূটনীতি হবে নীতিভিত্তিক এবং পরিচালিত হবে জাতীয় স্বার্থের দ্বারা।

জাপানের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্রহীন বিশ্ব কোনো কল্পনা নয়, এটি একটি আদর্শ। একটি আদর্শকে ধাপে ধাপে বাস্তবসম্মতভাবে অনুসরণ করতে হয়।’


আগামী দিনে করণীয় কী

কিশিদা এসব ধারণাকে বাস্তবে পরিণত করার একটি রূপরেখা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা চাপের মুখে থাকায় রাজনীতিতে এমন ধারণা প্রয়োজন, যা মানুষকে একত্র করে, স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে। এর কেন্দ্রে অবশ্যই থাকতে হবে মানবিক মর্যাদার বিষয়টি।

জাপানের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ কারণে জাপান দীর্ঘদিন ধরেই মানব নিরাপত্তার ধারণাকে সমর্থন করে আসছে। জাতিসংঘ সনদে অন্তর্ভুক্ত নীতি ও মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখাই জাপানের অঙ্গীকার। সারা বিশ্বের উচিত সেই অঙ্গীকারের দিকে ফিরে যাওয়া।

একটি মুক্ত ও অবাধ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের যে দৃষ্টিভঙ্গি জাপান কয়েক দশক ধরে ধারণ করে আসছে, সেটার মূলেও এমন চিন্তাধারা আছে বলে জানান কিশিদা। তিনি বলেন, এর মূলনীতি সমষ্টিকে শক্তিশালী করা। সমৃদ্ধিকে উৎসাহিত করা। জবরদস্তি ও ভীতি প্রদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করা। এমন দৃষ্টিভঙ্গি লালন করা, যা স্বাধীনতা ও আইনের শাসনকে সম্মান করে।

কিশিদা আরও বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই সেই নীতিগুলোকে সমুন্নত রাখতে হবে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শান্তি আর সমৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন করেছে। একই সঙ্গে, জাপানকে অবশ্যই সেসব পরাশক্তির বিরুদ্ধে দৃঢ়তার সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হবে, যারা বলপূর্বক স্থিতাবস্থা পরিবর্তন করতে চায়। এই প্রতিশ্রুতি আমাদের সময়ের দাবি।’

বিশ্ব সম্প্রদায় যাতে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলে, আইনের শাসন সমুন্নত রাখে এবং বহুপক্ষীয়তা ও মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থা বজায় রাখে, সেসব নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন কিশিদা। তাঁর মতে, সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা জাপানের মতো দুর্বল দেশগুলোর সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক আইন হলো রক্ষাকবচ।

Link copied!