দুইদিন আগে দোহা, দুবাই ও মানামাতে আছড়ে পড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কেবল কিছু ভবনের কংক্রিট আর কাচই ভাঙেনি, একইসঙ্গে তা—মধ্যপ্রাচ্যের বাকি অংশের সংঘাত-সঙ্কট থেকে মরুদ্যানের এই অংশটুকু নিরাপদ, স্থিতিশীল—উপসাগরের দেশগুলোর সযত্নে লালিত এমন ভাবমূর্তিও খসিয়ে দিয়েছে।
এখন ওই দেশগুলো অসম্ভব দুটি পছন্দের একটি বেছে নেওয়ার এক বিষন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকর। এর একটি হল- যুদ্ধে জড়ানো, সেক্ষেত্রে তাদের ইসরায়েলের মিত্র হিসেবে চিত্রিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে; আর না হলে নিজেদের শহর পুড়তে দেখেও চুপচাপ বসে থাকতে হবে।
“শার্লট, সিয়াটল বা মিয়ামিতে বোমা পড়লে আমেরিকানদের যেমনটা হত, মানামা, দোহা আর দুবাইয়ে বোমা পড়াটাও এখানকার জনগণ আর রাজনৈতিক নেতাদের কাছে ঠিক ততটাই আশ্চর্য ও অকল্পনীয় লাগছে,” নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি আবু ধাবির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক রাজনীতির অধ্যাপক মনিকা মার্কস আল জাজিরাকে এ কথাই বলেছেন।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে বিস্তৃত হামলা শুরু করার পর তেহরান ইসরায়েল ও অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটি, স্থাপনা ও সম্পদে পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া শুরু করলে তার ধাক্কা উপসাগরের দেশগুলোতে লাগা শুরু হয়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অভিযান এরই মধ্যে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ ইরানি অনেক শীর্ষ নেতাদের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। দেশটির সামরিক ও সরকারি স্থাপনাগুলোতে লাগাতার হামলা চলছে। তাদের হামলায় বেসামরিক প্রাণহানিও প্রচুর হচ্ছে। ইরানে মেয়েদের এক প্রাইমারি স্কুলে ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় দুইশ মানুষের মৃত্যুর খবরও এসেছে।
তেহরানের পাল্টা হামলায় রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতে অন্তত তিনজন নিহত ও ৫৮ জনের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ক্ষেপণাস্ত্র বা তা প্রতিহতের চেষ্টায় মারা বস্তুর ধ্বংসাবশেষ দুবাইয়ে বিমানবন্দর ও সুপরিচিত সব ভবন, মানামার সুউচ্চ একাধিক ভবন এবং কুয়েতের বিমানবন্দরে আঘাত হানে; পরে দোহার অনেক এলাকা থেকে ধোঁয়া উঠতেও দেখা যায়।
রিয়াদ ও দেশের পূর্বাঞ্চলে ইরানের হামলার খবর দিয়েছে সৌদি আরব। কাতার বলেছে, হামলায় তাদের ভূখণ্ডে ১৬ জন আহত হয়েছে। ওমানে আহত হয়েছে ৫ জন, কুয়েতে ৩২ জন, বাহরাইনে ৪ জন।
যে যুদ্ধ তারা থামানোর চেষ্টা করেছিল
উপসাগরের দেশগুলো এ যুদ্ধ চায়নি। যদিও সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ইরানে আক্রমণ করতে ওয়াশিংটনে তদবির চালিয়েছিলেন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে একাধিকবার ফোন করেছিলেন বলে খবর বেরিয়েছে।
তবে হামলার আগের বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে ওমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অপ্রত্যক্ষ আলোচনায় মধ্যস্থতা করে গেছে। সর্বশেষ ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি বলেছিলেন, ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ না করতে এবং এখন যে পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে তা রাতারাতি কমিয়ে ফেলার প্রস্তাবে রাজি হওয়ায় শান্তি ‘নাগালের কাছাকাছি’ চলে এসেছে।
“যুদ্ধ আসছে—মাস না হোক কয়েক সপ্তাহ ধরেই স্লো মোশনে এমনটা দেখছিল জিসিসি (গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল) দেশগুলো, তারা তা থামাতে ব্যাপক উদ্যোগও নিয়েছিল,” বলেছেন মার্কস।
দেশগুলো জানতো, কোণঠাসা ইরানি শাসকরা ‘আত্মহত্যার আগে ভ্রাতৃহত্যার পথ বেছে নেবে’, অর্থ্যাৎ হার মানার চেয়ে উপসাগরীয় প্রতিবেশিদের জিম্মি করাটা তাদের জন্য বেশি সুবিধাজনক, ভাষ্য নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি আবু ধাবির এ অধ্যাপকের।
উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানে সামরিক অভিযান ঠেকাতে জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, এমন দাবির সঙ্গে একমত লন্ডনের কিংস কলেজের প্রভাষক রব গাইস্ট পিনফোল্ড।
“জিসিসি দেশগুলো এ যুদ্ধ চায়নি। তারা এর বিরুদ্ধে লবি করেছিল,” আল জাজিরাকে এমনটাই বলেছেন তিনি।
তাছাড়া, যুদ্ধে যোগ দিলে তাদেরকে ‘ইসরায়েলের সহযোগী’ হিসেবে দেখা হবে, এতে তাদের ‘রাজনৈতিক বৈধতাও’ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে, বলছেন পিনফোল্ড।
আবার ইরানের লাগাতার হামলার মুখে চুপচাপ বসে থাকাও ঝুঁকিপূর্ণ। সব মিলিয়ে তারা এখন ‘দোদুল্যমান অবস্থায়’ আছে।
“দিনশেষে এই সরকারগুলোকে জনমতের দিকে তাকিয়েই চলতে হয়। তাদের নিজেদেরকে এমন রূপে দেখাতে হয় যে তারা জনগণকে সুরক্ষা দিচ্ছে, ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত রাখছে,” বলেছেন তিনি।
মার্কস, পিনফোল্ড উভয় বিশ্লেষকই মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত জিসিসি দেশগুলোকে কোনো না কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতেই হবে, তবে সেটা তারা এমনভাবে করতে পারে, যেন দেখানো যায় যে অন্য কারও কারণে নয়, নিজের ইচ্ছাতেই তারা এ পথে নেমেছে।
কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য আকাশপথ খুলে দেওয়ার বদলে তারা পেনিনসুলা শিল্ড ফোর্সের (পিএসএফ) মতো কিছুর সাহায্যে ইরানে হামলা চালাতে পারে, মনে করেন পিনফোল্ড।
জিসিসি ১৯৮৪ সালে এ ঐক্যবদ্ধ পিএসএফ সেনাবাহিনী গঠন করেছিল, পরে ২০১৩ সালে এসে যা ইউনিফায়েড মিলিটারি কমান্ডে পরিণত হয়।
“তারা ইসরায়েলের হয়ে কাজ করছে, বা ইসরায়েলের সঙ্গে কাজ করছে—নিজেদের এমনভাবে হাজির করতে চায় না। তারা নেতৃত্ব দিতে চায়, অনুসারী হতে নয়,” বলেছেন এ প্রভাষক।
পিএসএফকে সামনে ঠেলে দেওয়ার মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে ‘চালকের আসনে’ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করতে পারে।
“যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করেছে। ইরান যুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়েছে। এখন উপসাগরীয় দেশগুলো এমন অবস্থানে আছে যে তারা চাইলে দেখাতে পারে যে তারা চুপচাপ বসে থাকার পাত্র নয়, কেবল বোমার শিকার হবে এমন লোকজন নয় তারা,” বলেছেন পিনফোল্ড।
এ সিদ্ধান্ত পরিণত হতে পারে দুঃস্বপ্নে
যুদ্ধে জড়ানোর ক্ষেত্রে উপসাগরীয় নেতাদের তাৎক্ষণিক ভয় হল তাদের সংবেদনশীল অবকাঠামো। তাদের বৈদ্যুতিক গ্রিড, পানি লবণাক্ত মুক্তকরণ কেন্দ্র ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলে সেটা হবে তাদের জন্য ‘সত্যিকারের দুঃস্বপ্নের মতো পরিস্থিতি’, বলছেন মার্কস।
“শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও পানি লবণাক্ত মুক্তকরণ ছাড়া, তীব্র গরম আর খটখটে মরুর উপসাগরের দেশগুলো মূলত বসবাসের অযোগ্য। জ্বালানি অবকাঠামো না থাকলে তারা একেবারেই অলাভজনক। এসব স্বার্থ সবচেয়ে কম বিঘ্নিত হবে এমন চিন্তা করেই তাদের পরের পদক্ষেপগুলোর কথা ভাবতে হবে,” বলেছেন তিনি।
পিনফোল্ড বলছেন ‘ভাবমূর্তিগত ক্ষতির’ কথা।
অস্থিতিশীল এলাকাতেও নিজেদেরকে স্থিতিশীল এবং বিনিয়োগ ও পর্যটনের জন্য সেরা হিসেবে দেখানোর যে চেষ্টা—তাতে সবচেয়ে বড় দাগ লেগে যাবে।
“এসব হামলা তাদের সেই ভাবমূর্তির ক্ষতি করবে,” বলেছেন তিনি।
রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র যুদ্ধের নতুন যুগ?
চলমান সঙ্কট পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোতে নাটকীয় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন দুই বিশ্লেষকই।
বছরের পর বছর ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো লেবাননের হিজবুল্লাহ বা ইয়েমেনের হুতিদের মতো বিভিন্ন ছায়া গোষ্ঠী ছিল তাদের উদ্বেগের কেন্দ্রে।
এখন সে হিসাব পুরোপুরি বদলে গেছে।
“আমরা মধ্যপ্রাচ্যে হয় একটি নতুন ধারা দেখছি, কিংবা রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র যুদ্ধের একটি অতি পুরনো ধারায় ফিরে যাচ্ছি। এখন আমরা ভুল তথ্য প্রচার, ছায়া যুদ্ধ এবং এরকম আরও অনেক কিছুর মতো গ্রে জোন ওয়ারফেয়ার দেখছি না। প্রকৃতপক্ষে আমরা এখন নতুন মাত্রার সংঘাত দেখছি,” বলেছেন পিনফোল্ড।
এদিকে মার্কস বলছেন, এবারের যুদ্ধের আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরের বেশিরভাগ দেশই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য ইরানের চেয়েও ইসরায়েলকে বড় হুমকি মনে করতো, বিশেষ করে গত সেপ্টেম্বরে কাতারে হামাস নেতাদের ওপর ইসরায়েলের হামলার পর থেকে।
“আজ ওই মূল্যায়ন পুরোপুরি বদলে গেছে.” বলেছেন এ নারী অধ্যাপক।
তার মতে, ইরান শুরুতেই যেসব ক্ষেপণাস্ত্র মেরেছে তার আওতা ছিল বিস্তৃত এবং সেগুলো ‘এলোমেলোভাবে’ মারা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
কিন্তু এখন উপসাগরের দেশগুলোকে দ্রুত হিসাব-নিকাশ করতে হচ্ছে। তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ অনেকাংশে ইরানের ওপরও নির্ভর করছে। ইরান কী তাদেরকে যুদ্ধের সাইডলাইনে থাকার সুযোগ করে দেবে?
সে সম্ভাবনা যে ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে, তা তাদের আকাশ চিরে যাওয়া ক্ষেপণাস্ত্র দেখেই বোঝা যাচ্ছে।






























