লাভার চেয়েও গরম বরফ আবিষ্কার


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬, ০১:৩১ পিএম
লাভার চেয়েও গরম বরফ আবিষ্কার

পানি আমাদের পরিচিত সবচেয়ে সহজলভ্য ও সাধারণ একটি পদার্থ হলেও এর অন্তর্নিহিত রসায়ন ও আচরণ অন্য যেকোনো তরল পদার্থের তুলনায় ভীষণ অদ্ভুত ও বৈচিত্র্যময়। স্বাভাবিক অবস্থায় পানির ঘনত্ব বরফ হওয়ার সময় কমে যায়, এর পৃষ্ঠটান অস্বাভাবিক রকমের বেশি এবং আণবিক ভর বিবেচনা করলে রুম টেম্পারেচারে এটির গ্যাসীয় অবস্থায় থাকার কথা ছিল। কিন্তু পৃথিবী ও সৌরজগতের চরম পরিবেশ কিংবা পরীক্ষাগারের কৃত্রিম পরিস্থিতিতে পানির এই অদ্ভুত আচরণ আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।

সায়েন্স অ্যালার্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এমন এক চরম ও অবিশ্বাস্য অবস্থার পানির সন্ধান পেয়েছেন যা কল্পনারও অতীত। ইউরেনাস ও নেপচুন গ্রহের অভ্যন্তরে যে চরম চাপ ও তাপমাত্রার পরিবেশ বিরাজ করে, বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে হীরার তৈরি প্রিজমের সাহায্যে ঠিক সেই রকম পরিবেশ কৃত্রিমভাবে তৈরি করে পানির ওপর প্রয়োগ করেছিলেন।

পৃথিবীর স্বাভাবিক সমুদ্রপৃষ্ঠের বায়ুমণ্ডলীয় চাপের চেয়ে প্রায় তেইশ লাখ গুণ বেশি চাপ বা প্রায় ২৩০ গিগাপ্যাসকেল এবং আড়াই হাজার কেলভিনের বেশি তাপমাত্রা প্রয়োগ করে বিজ্ঞানীরা পানির একটি নতুন ও বিরল রূপ আবিষ্কার করেছেন।

সাধারণত উচ্চ তাপমাত্রায় পানি বাষ্পীভূত হয়ে গ্যাসে রূপান্তরিত হয় এবং এর অণুগুলো প্রসারিত হতে চায়। কিন্তু গ্রহগুলোর অভ্যন্তরের মতো কোটি কোটি গুণ বেশি চাপের মুখে সেই প্রসারণ সম্ভব হয় না। এর ফলে পানি বাষ্প না হয়ে এক অত্যন্ত ঘন এবং অদ্ভুত দশায় রূপ নেয়, যাকে বলা হয় সুপার আয়ননিক আইস। এটি এমন এক উদ্ভট দশা যা পুরোপুরি কঠিনও নয় আবার পুরোপুরি তরলও নয়।

এই বিশেষ বরফের ভেতরে পানির অক্সিজেন পরমাণুগুলো একটি শক্ত কেলাসের মতো স্থির ও অনড় হয়ে আটকে থাকে, ঠিক যেমনটা সাধারণ কঠিন বরফে দেখা যায়। কিন্তু একই সাথে হাইড্রোজেন পরমাণু বা নিউক্লিয়াসগুলো সেই অক্সিজেন কাঠামোর ভেতর দিয়ে তরলের মতো অত্যন্ত স্বাধীনভাবে চারদিকে ছুটোছুটি বা বিচরণ করতে পারে।

বিজ্ঞানীরা এর আগে এক্স-রে স্ক্যান করে এই সুপার আইননিক আইসের একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর কথা জানতে পেরেছিলেন, যা ফেস-সেন্টার্ড কিউবিক বা এফসিসি নামে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক এই নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা আরও এক ধাপ এগিয়ে হেক্সাগোনাল ক্লোজ-প্যাকড বা এইচসিপি নামের সম্পূর্ণ নতুন এক কাঠামোর সুপার আয়ননিক বরফ আবিষ্কার করেছেন।

পরীক্ষায় দেখা গেছে, চাপ ও তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়াতে থাকলে বরফের ভেতরের অণুগুলোর এই সাজ বা বিন্যাস পরিবর্তিত হতে শুরু করে।

যখন তাপমাত্রা দুই হাজার কেলভিন এবং চাপ ১৫৫ গিগাপ্যাসকেল ছিল, তখন এক্স-রে পরীক্ষায় পুরোনো এফসিসি এবং নতুন এইচসিপি উভয় কাঠামোর মিশ্রণ দেখা গিয়েছিল। এরপর চাপ ও তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে যথাক্রমে ১৯৫ গিগাপ্যাসকেল ও দুই হাজার দুইশ পঞ্চাশ কেলভিনে উন্নীত করা হলে এফসিসি কাঠামোর চেয়ে এইচসিপি কাঠামোর উপস্থিতি অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
সর্বশেষ যখন চাপ ২১৯ গিগাপ্যাসকেল এবং তাপমাত্রা দুই হাজার ছয়শ ত্রিশ কেলভিনে পৌঁছাল, তখন আগের এফসিসি কাঠামোর চিহ্ন প্রায় পুরোপুরি মিলিয়ে গেল এবং নতুন এইচসিপি গঠনটি একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করল। এই ফলাফল থেকে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে দুইশ

গিগাপ্যাসকেলের বেশি চাপে সুপার আয়ননিক আইসের সবচেয়ে স্থিতিশীল রূপ হলো এই এইচসিপি কাঠামো। এমনকি বিজ্ঞানীরা অতীতে করা কিছু পুরোনো ডেটা বিশ্লেষণ করে বুঝতে পেরেছেন যে এর আগেও তারা অজান্তেই এই এইচসিপি বরফের দেখা পেয়েছিলেন, কিন্তু তখন পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে তা চিহ্নিত করতে পারেননি।

লাভার চেয়েও বেশি উষ্ণ এই চরম গরম বরফ আবিষ্কার কেবল একটি গবেষণাগারের সাফল্য নয়, এটি আমাদের পুরো সৌরজগতের গঠন বুঝতে সাহায্য করবে। ইউরেনাস এবং নেপচুন গ্রহের ঠিক কেন্দ্রভাগে এই ধরনের চরম চাপ ও তাপমাত্রা রয়েছে, যেখানে সুপার আয়ননিক বরফ প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান। গ্রহ দুটির অদ্ভুত, বিশৃঙ্খল এবং আক্ষরিক অর্থেই বক্র চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার পেছনে এই বরফের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন।

নতুন আবিষ্কৃত এইচসিপি বরফের বিদ্যুৎ পরিবাহিতা বা যান্ত্রিক নমনীয়তা আগের জানা এফসিসি বরফ থেকে ভিন্ন হতে পারে। এর ফলে এই দুই গ্রহের অভ্যন্তরে বৈদ্যুতিক আধান এবং পদার্থ কীভাবে চলাচল করে সে সম্পর্কে আমাদের এতদিনের গাণিতিক মডেল ও ধারণাগুলো পুরোপুরি বদলে যেতে পারে। বরফের এই নতুন রূপটি সাম্প্রতিক আবিষ্কার হওয়ায় এর সমস্ত ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এখনও পুরোপুরি জানা সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞানীরা এখন এই রহস্যময় বরফের প্রকৃত প্রকৃতি, বিদ্যুৎ পরিবাহিতা এবং বিভিন্ন তাপমাত্রায় এর স্থিতিশীলতা নিয়ে আরও বিস্তারিত তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক গবেষণার পথ খোলা রেখেছেন।

আন্তর্জাতিক বিভাগের আরো খবর

Link copied!