বিশ্ববাজারে তেলের দাম হতে যাচ্ছে আকাশচুম্বী


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ০৯:২১ পিএম
বিশ্ববাজারে তেলের দাম হতে যাচ্ছে আকাশচুম্বী

বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য ওঠানামা করলেও এতদিন বহু বাধা ও ধাক্কা সামলে স্থিতিশীলতা ধরে রেখেছে। তবে ইরান ‍যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পরিস্থিতি পাল্টেছে। তৈরি হয়েছে তেল সংকট, আর দামের স্কেল লাগামছাড়া ঊর্ধ্বমুখী।


পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এই সংকট আরও ভয়াবহ এবং তেলের দাম আরও আকাশচুম্বী হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। অবশ্য ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের চাপ থেকে অনেকটাই রক্ষা পেয়েছেন। খবর সিএনএনের।


যুদ্ধ চলাকালে অপরিশোধিত তেলের দাম অনেকটা বাড়লেও যতটা বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল, ততটা বাড়েনি। ২০২২ সালে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৮ ডলার উঠেছিল, এবার দাম সে পর্যন্ত ওঠেনি। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের ঠিক আগে তেলের দাম সর্বকালীন রেকর্ড ১৪৬ ডলারে উঠে যায়, এবার তেলের দাম তার চেয়ে অনেক নিচেই ছিল।


তবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত আরও তীব্র হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।


আরসিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বৈশ্বিক কৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফটের বলেন, ‘সংঘাত আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এত দিন ধারণা ছিল, বাজার যেকোনো সংকটের বিকল্প পথ খুঁজে নেবে- এবার সেই ধারণা বদলে যেতে পারে।’


বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম মে মাসের পর এই প্রথম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। পরে অবশ্য দাম কিছুটা কমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার এবং ডিজেলের দাম ৫ দশমিক ২০ ডলারের ওপরে।


গত পাঁচ মাস ধরে যেসব কারণে তেলের দাম খুব একটা বাড়েনি, সেগুলোর বেশির ভাগই এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে, বা কার্যত বিলীন হয়ে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি হয়েছে তেলের দামে নতুন করে বড় উল্লম্ফনের আশঙ্কা।


নতুন পরিবহন সংকট
এতদিন সংঘাতের মধ্যেও লোহিত সাগর হয়ে সংঘাতপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে তেল পরিবহন করা সম্ভব হলেও বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সমুদ্রপথেই সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।


জেপি মরগানের তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলার কারণে ওই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাজার বিকল্প পথ খুঁজে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরে পাঠানো শুরু হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এই তেল পারস্য উপসাগরমুখী হওয়ার কথা ছিল।


কিন্তু ক্যাপিটাল ইকোনমিকস বলছে, সেই বিকল্প ব্যবস্থাও এখন ঝুঁকির মুখে। বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুতিদের অবরোধের কারণে সৌদি আরবের প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।


জেপি মরগানের বৈশ্বিক পণ্যবাজার কৌশল বিভাগের প্রধান নাতাশা কানেভা বলেন, সৌদি আরব চাইলে সুয়েজ খাল হয়ে উত্তরের পথে তেল পাঠাতে পারে। তবে গভীরতার সীমাবদ্ধতার কারণে বড় আকারের পণ্য বোঝাই তেলবাহী জাহাজ এ পথে চলতে পারে না। ছোট জাহাজে তেল স্থানান্তর করে ভূমধ্যসাগর ও আফ্রিকা ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে চার সপ্তাহের যাত্রা বেড়ে প্রায় আট সপ্তাহে দাঁড়ায়।


বাড়ছে বিমা জটিলতাও 
যুদ্ধঝুঁকির কারণে জাহাজের বিমা প্রিমিয়াম বেড়েছিল। ইরানকে টোল দিলে সেই জাহাজের বিমা কার্যকারিতা হারাতে পারে। যুদ্ধ চলাকালে হরমুজ প্রণালি ছাড়তে চাওয়া জাহাজগুলোকে উচ্চ হারে যুদ্ধঝুঁকির বিমা প্রিমিয়াম দিতে হতো। বিমা অন্তত পাওয়া যেত, এই ভরসা ছিল। কিন্তু সামুদ্রিক বাণিজ্যের বিমা দেয়া কোম্পানিগুলোর সংগঠন লয়েডস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন (এলএমএ) প্রশ্ন তুলেছে, ভবিষ্যতে ওই প্রণালি দিয়ে বের হওয়া জাহাজ আদৌ বিমা পাবে কি না।


ইরান জানিয়েছে, তারা আবারও প্রতি ব্যারেল তেলে ১ থেকে ২ ডলার টোল আরোপের পরিকল্পনা করছে। ফলে প্রতিটি জাহাজ থেকে ইরান সরকারের কয়েক মিলিয়ন ডলার আয় হতে পারে। এলএমএর নতুন খসড়ায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় ইরানকে এ ধরনের টোল পরিশোধ করা বেআইনি।


কোনো জাহাজ ইরানকে টোল দিলে তার পুরো বিমা বাতিল হয়ে যেতে পারে। এতে শিপিং কোম্পানিগুলোর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে। অন্যদিকে ইরান বলছে, টোল না দিয়ে প্রণালি ছাড়ার চেষ্টা করলে তারা জাহাজে হামলা চালানোর অধিকার রাখে। ফলে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সুযোগ কমে আসছে।


বিস্তৃত হচ্ছে সংকটের পরিধি
তেল সরবরাহ–সংকট মূলত মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু রাশিয়াও বৈশ্বিক জ্বালানি–সংকটের বড় অংশীদার। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগার ও কৃষ্ণসাগরে অবস্থিত কাসপিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়ামের টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।


এদিকে কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনের হামলায় অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ এমন সময়ে ব্যাহত হচ্ছে, যখন বাজার এমনিতেই চাপে আছে। কাসপিয়ান পাইপলাইন দিয়ে তুলনামূলক কম তেল পরিবহন হলেও এর মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১৭ লাখ ব্যারেল তেল বৈশ্বিক বাজারে নাও আসতে পারে।


বিপজ্জনকভাবে কমছে মজুত
বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি ছিল। কিন্তু অপরিশোধিত তেলের বৈশ্বিক মজুত দ্রুত বিপজ্জনকভাবে কমে যাচ্ছে। ইরান যুদ্ধ যখন শুরু হয়, সেই সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো বৈশ্বিক তেলের মজুত।


পিকারিং এনার্জি পার্টনারসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ড্যান পিকারিংয়ের হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বে অপরিশোধিত তেলের মজুত ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। তবে গত পাঁচ মাসে সেই মজুত ১৩০ কোটি ব্যারেল কমে গেছে।


এই পরিস্থিতি সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। দেশটির কৌশলগত তেল মজুত (স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ) বসন্তের পর থেকে ১১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল কমেছে। ফলে এই মজুত ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। 

আন্তর্জাতিক বিভাগের আরো খবর

Link copied!