বলিউড ও মারাঠি সিনেমার মহীরূহ, ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী ও দাপুটে অভিনেতা নানা পাটেকর আর নেই। বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ার নিজ বাসভবনে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৭৫ বছর বয়সী এ বর্ষীয়ান তারকা।
মৃত্যুর ঠিক চার দিন আগে গোয়ার এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে জীবন ও মৃত্যু নিয়ে আবেগঘন এক মন্তব্য করেছিলেন নানা। ‘সম্রাট ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল’-এর নতুন কমিটি গঠন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রেখেছিলেন তিনি।
সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘কাল আমি বেঁচে থাকব কি না, তা তো জানি না।’ তার সেই আশঙ্কাই যেন এমন সত্য হয়ে ফিরে আসবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি তার ভক্তরা।
হাসপাতাল সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, গোয়ার বাসভবনে তাকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে দ্রুত মনিপাল হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকরা তাকে বাঁচাতে একটানা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে সিপিআরসহ নানান জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হয়।
কিন্তু শরীরে হৃদস্পন্দনের কোনো লক্ষণ না থাকায় ভোর ৫:২০ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়েই পুনে থেকে গোয়ার উদ্দেশে রওনা হন তার একমাত্র ছেলে মল্লার পাটেকর।
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে জন্ম নানা পাটেকরের। তার আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ সিনেমার মাধ্যমে রূপালি পর্দায় পা রাখা নানা পাটেকর। তার সংলাপ পরিবেশনের বিশেষ ঢং এবং স্ক্রিন প্রেজেন্সের জন্য দ্রুতই স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলেন।
‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘আব তক ছাপ্পান’, ‘অপহরণ’ কিংবা মারাঠি মাস্টারপিস ‘নটসম্রাট’-এর মতো চলচ্চিত্রে তার অভিনয় দাগ কেটেছে সর্বস্তরের দর্শকের হৃদয়ে। শুধু গম্ভীর চরিত্রই নয়, ‘ওয়েলকাম’ সিনেমার উদয় শেট্টির মতো আইকনিক হাসির চরিত্রেও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
সুদীর্ঘ অভিনয় জীবনে ৩টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ৪টি ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড এবং ২০১৩ সালে রাষ্ট্রের সম্মানজনক ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত হন তিনি। শুধু অভিনয়ই নয়, তিনি ‘যশবন্ত’ (১৯৯৭), ‘ওয়াজুদ’ (১৯৯৮) এবং ‘আঁচ’ (২০০৩) চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবেও গান গেয়েছেন।
নানা পাটেকর শুধু সিনেমার পর্দাতেই নায়ক ছিলেন না। বাস্তব জীবনেও তিনি ছিলেন আপামর সাধারণ মানুষের অতি আপন। তার প্রতিষ্ঠিত ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে খরাপীড়িত মহারাষ্ট্রের অসংখ্য আত্মহত্যা করা কৃষক পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। পানি সংরক্ষণ ও গ্রামীণ কল্যাণে তার অবদান ভারতীয় সমাজে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
নানা পাটেকরের আকস্মিক মৃত্যুতে ভারতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী প্রমোদ সায়ন্ত, ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নীতিন গড়করি, কর্ণাটকের উপ-মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমারসহ একাধিক শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
বলিউড তারকা রিতেশ দেশমুখ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লিখেছেন, ‘নানা জির মৃত্যুর খবরটি বুকে যেন একটা দ্রুতগামী ট্রাকের ধাক্কা লাগার মতো লেগেছে। তিনি পর্দার ভেতরে ও বাইরে একজন সত্যিকারের হিরো ছিলেন।’
দক্ষিণী তারকা প্রকাশ রাজের খুব কাছের বন্ধু ছিলেন নানা। তিনি লেখেন, ‘তোমাকে খুব মিস করব নানা জি, একসঙ্গে কাটানো সময় কথোপকথন, তর্ক, তোমার রান্না করা খাবার এবং তোমার শেয়ার করা জ্ঞান চিরকাল আগলে রাখব... আমার জীবনযাত্রায় আসার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।’
স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর, আপসহীন অভিনয় আর নিখাদ এক মানবিক হৃদয় রেখে ৭৫ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন এ মহান অভিনেতা।















