মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য পৃথিবীর রাজধানীর নাম হবে নিউ জার্সি। সেখানে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মেলন বসবে না। কোনো মহাকাশযানও নামবে না। তবু পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটবে সেখানেই। সেই মাঠেই উঠবে ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফি। একটি সোনালি কাপের দিকে তাকিয়ে থাকবে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশ। কয়েক ঘণ্টার জন্য সময়, দূরত্ব, ভাষা আর সীমান্ত হার মেনে যাবে ফুটবলের কাছে।
বিশ্বকাপের ফাইনালের রাতে পৃথিবী নিজের ছন্দ বদলে ফেলে। রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। বিমানবন্দরের টার্মিনালে যাত্রীরা চোখ রাখেন টেলিভিশনের পর্দায়। হাসপাতালের চিকিৎসক অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে স্কোর জেনে নেন। দূর সমুদ্রে ভাসমান জাহাজেও রেডিওতে শোনা হয় ধারাভাষ্য। যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো দেশের শিশুও কয়েক ঘণ্টার জন্য গোলের উল্লাসে হাসতে শেখে। পৃথিবীতে আনন্দের কোনো পাসপোর্ট লাগে না।
নিউ জার্সির স্টেডিয়ামে বসবেন প্রায় আশি হাজার দর্শক। সবচেয়ে বড় গ্যালারি তৈরি হবে পৃথিবীর ঘরে ঘরে। ঢাকার কোনো ছাদের ওপর প্রজেক্টর বসিয়ে বন্ধুরা খেলা দেখবে। গ্রামের চায়ের দোকানে একটি ছোট্ট টেলিভিশনের সামনে ঠাসাঠাসি করে দাঁড়াবে মানুষ। টোকিওর কোনো ক্যাফে, বুয়েনোস আইরেসের রাস্তা, মাদ্রিদের কোনো স্কয়ার, কায়রোর অলিগলি কিংবা সাও পাওলোর বারে একই মুহূর্তে থেমে যাবে মানুষের ব্যস্ততা। একটি বলের দিকে তাকিয়ে থাকবে কোটি কোটি চোখ।
সবুজ ঘাসের ওপর খেলবেন মাত্র বাইশজন ফুটবলার। তাদের প্রতিটি স্পর্শে কেঁপে উঠবে পৃথিবী। একটি পাসে কারো মুখে হাসি ফুটবে, একটি ভুলে কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসবে। একটি গোলে অচেনা মানুষ একে অন্যকে জড়িয়ে ধরবে। আবার একটি মিস করা সুযোগ একজন ফুটবলারের বুকের ভেতর আজীবনের কষ্ট হয়ে থেকে যেতে পারে। ফুটবল এমনই নিষ্ঠুর, আবার এমনই সুন্দর।
ফাইনালের আগে দুই ড্রেসিংরুমে থাকবে দুই রকম নীরবতা। কেউ চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করবেন। কেউ জার্সির বুকের ওপর দেশের প্রতীক ছুঁয়ে দেখবেন। কেউ শেষবারের মতো জাতীয় সংগীত গাওয়ার প্রস্তুতি নেবেন। বাইরে তখন গ্যালারিতে পতাকার ঢেউ। ভেতরে শুধু হৃদস্পন্দনের শব্দ। কয়েক মিনিট পর সেই দরজা খুলে যাবে। আর ফেরার পথ থাকবে না। ইতিহাস অপেক্ষা করবে মাত্র নব্বই মিনিটের।
গ্যালারিতে একজন বাবা ছেলেকে কাঁধে তুলে ধরবেন, যাতে সে নিজের নায়ককে একটু ভালো করে দেখতে পারে। ছেলেটি হয়তো প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখছে। সে জানে না ইতিহাস কী। সে শুধু জানে, মাঠে যে মানুষটি বল নিয়ে দৌড়াচ্ছেন, তিনিই তার সবচেয়ে বড় নায়ক। পাশে বসে থাকা বাবা হয়তো নিজের শৈশব খুঁজে পাবেন ছেলের চোখে। বহু বছর আগে তিনিও এমন করেই আরেকজন কিংবদন্তিকে দেখেছিলেন। বিশ্বকাপ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ভালোবাসা পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে বড় উৎসব।
হাজার মাইল দূরে কোনো মা টেলিভিশনের সামনে বসে আছেন। মাঠে তার ছেলে দেশের জার্সি পরে খেলছে। প্রতিটি ট্যাকলে তার বুক কেঁপে ওঠে। কোনো বৃদ্ধ হয়তো জীবনের শেষ বিশ্বকাপ দেখছেন। কোনো প্রবাসী নিজের দেশের পতাকা কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ হাসপাতালের করিডরে মোবাইল ফোনে খেলা দেখছেন। কেউ রাতভর জেগে আছেন শুধু একটি স্বপ্ন পূরণের অপেক্ষায়। বিশ্বকাপের ফাইনাল কখনো শুধু স্টেডিয়ামে খেলা হয় না। একই সঙ্গে কোটি মানুষের হৃদয়ে খেলা হয়।
শেষ বাঁশি। একটি দল ছুটবে আনন্দে। অন্য দল দাঁড়িয়ে থাকবে নিথর হয়ে। কেউ হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদবে। কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাস করার চেষ্টা করবে, সত্যিই কি স্বপ্ন পূরণ হয়েছে? একজন অধিনায়ক দুই হাতে ট্রফি উঁচিয়ে ধরবেন, তখন পুরো একটি জাতি আকাশ ছুঁয়ে ফেলবে। যারা হারবে, তাদের চোখের জলও বিশ্বকাপের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।
স্টেডিয়ামের আলো একসময় নিভে যাবে। দর্শকেরা বাড়ি ফিরবেন। পতাকাগুলো ভাঁজ হবে। ক্যামেরা বন্ধ হবে। সেই রাত শেষ হবে না। কোনো শিশুর মনে জন্ম নেবে নতুন একটি স্বপ্ন, একদিন সেও এই মাঠে খেলবে। কোনো বাবা বহু বছর পর ছেলেকে বলবেন, ‘আমি সেই ফাইনাল দেখেছিলাম।’ কোনো বৃদ্ধ শেষবারের মতো মনে রাখবেন আরেকটি বিশ্বকাপের রাত।
বিশ্বকাপের ফাইনালে পৃথিবীর সব পথ গিয়ে মিশে যায় একটি স্টেডিয়ামে। কয়েক ঘণ্টার জন্য পৃথিবীর সব ঘড়ি একই সময় দেখায়, সব হৃদস্পন্দন একই ছন্দে বাজে। যে স্টেডিয়ামে ফুটবল গড়াচ্ছে, সেদিন পৃথিবী থেমে আছে ঠিক সেখানেই।




































