বিশ্বকাপে কত অবিশ্বাস্য সব গল্পের জন্ম হয়! কেপ ভার্দে সেসব গল্পের মধ্য সাম্প্রতিকতম।
পাঁচ লাখের একটু বেশি জনসংখ্যার আফ্রিকান দেশটি বিশ্বকাপে এবার খেলার সুযোগ পেয়েই ইতিহাস গড়েছে। জনসংখ্যা বিচারে বিশ্বকাপের ইতিহাসে তারা তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। বিশ্বকাপে এবারই প্রথম খেলছে। সবাই হয়তো ভেবেছিলেন, কেপ ভার্দের জন্য বিশ্বকাপে অংশগ্রহণই হবে সবচেয়ে বড় উৎসবের বিষয়। ভুল!
কেপ ভার্দের নীল ও সাদা জার্সির আস্তিনে যে এত চমক লুকিয়ে ছিল, তা জানত কে!
বিশ্বকাপে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন তাদের জালে গোল করতে পারেনি। ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র করে বিশ্বকে চমকে দেওয়ার সঙ্গে বিশ্বকাপ অভিষেকে প্রথম পয়েন্টও তুলে নিয়েছিল কেপ ভার্দে। তখন হয়তো অনেকে ব্যাপারটাকে ‘ফ্লুক’ বলেই মনে করেছিলেন।
অন্তত মায়ামি স্টেডিয়ামে আজ যা ঘটল, তা দেখে এমন দাবি করাই যায়। কেপ ভার্দে ২–২ গোলে আটকে দিয়েছে দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েকেও!
সেটাও কী অবিশ্বাস্যভাবে—২১ মিনিটে সরাসরি ফ্রি–কিক থেকে গোলে কেপ ভার্দেই এগিয়ে গিয়েছিল ম্যাচে। উরুগুয়ে প্রথমার্ধের শেষ দিকে সমতায় ফেরার পর সেই অর্ধের যোগ করা সময়ে এগিয়েও যায়। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৯তম দক্ষিণ আমেরিকান পরাশক্তির সঙ্গে ৪৯ ধাপ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা কেপ ভার্দে আবারও সবাইকে অবাক করে দিয়ে সমতায় ফেরে ৬১ মিনিটে। উরুগুয়ে এরপর প্রাণান্ত চেষ্টা করেও গোলের দেখা পায়নি।
উরুগুয়ের জালে গোল করে হেলিও ভারেলার উদ্যাপন
উরুগুয়ের জালে গোল করে হেলিও ভারেলার উদ্যাপনএএফপি
তাতে বিশ্বকাপ অভিষেকে দ্বিতীয় ম্যাচ থেকেও আরও ১ পয়েন্ট তুলে নেওয়ার স্পর্ধা দেখাল কেপ ভার্দে। আরও একবার মনে করুন, কাদের বিপক্ষে? স্পেন ও উরুগুয়ে। ভাবতেই কেমন অস্বস্তি জাগে!
কিন্তু এ অস্বস্তিটুকুই বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের এই অবিশ্বাস্য গল্পের সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার। আর এখন ব্যাপারটা প্রমাণিত যে স্পেনের বিপক্ষে তাদের পয়েন্ট ভাগাভাগি মোটেও ‘ফ্লুক’ ছিল না, যেমনটা এই ম্যাচের ড্র–ও। তবু বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেকে এ দুটো ম্যাচকে মনে রাখবেন অন্যতম সেরা জোড়া অঘটন হিসেবে।
কিন্তু ফুটবল মাঠ জনসংখ্যা কিংবা ফুটবলীয় শক্তি–ঐতিহ্যে কে ছোট, কে বড়, তা চেনে না! মাঠে ভালো খেলেই ফল বের করে আনতে হয়। কেপ ভার্দে হয়তো জিততে পারেনি, কিন্তু পরপর দুই ম্যাচে সাবেক দুই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের চোখে চোখ রেখে পয়েন্ট কেড়ে নেওয়া তো জয়েরই সমান!
উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি কেপ ভার্দে যে মনস্তাত্ত্বিকভাবে জিতেছে, সেটা দুটি পরিসংখ্যানেই পরিষ্কার—২টি গোল হজম করলেও তাদের ৪০ বছর বয়সী গোলকিপার ভোজিনিয়াকে বড় কোনো পরীক্ষা দিতে হয়নি। কিন্তু উরুগুয়ের ৪০ বছর বয়সী গোলকিপার ফার্নান্দো মুসলেরাকে দুটি ভালো সেভ করতে হয়। ফেদে ভালভের্দে, রদ্রিগো বেনতাঙ্কুরদের নিয়ে গড়া উরুগুয়ে আক্রমণভাগ ১৭টি শট নিয়ে কেপ ভার্দের পোস্টে মাত্র ২টি শট রাখতে পারে। আর কেপ ভার্দে যে তাদের বিপক্ষে ১২টি শট নিতে পেরেছে, সেটাই অনেক বড় ব্যাপার। সেখানে ৪টি শট পোস্টে রাখা তো অভাবনীয়!
২১ মিনিটে ৩২ মিটার দূর থেকে সরাসরি মাটিঘেঁষা ফ্রি–কিকে কেপ ভার্দের কেভিন পিনা যে গোলটি করেন, সেটাতেও জড়িয়ে ইতিহাস। বিশ্বকাপে এটা তাদের প্রথম গোল আর সেই গোলেই কিনা পিছিয়ে পড়ল উরুগুয়ের মতো দল! আর সেই গোলটিও এমন যে এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে দূরপাল্লার গোল।
শুধু তা–ই নয়, উরুগুয়ে বিশ্বকাপে এর আগে কখনোই সরাসরি ফ্রি–কিক থেকে গোল হজম করেনি। কেপ ভার্দের বিপক্ষে খেলাই যেখানে দক্ষিণ আমেরিকার শক্তিধর দলটির জন্য নতুন অভিজ্ঞতা, সেখানে অমন কিছু তো সেই নতুনের মধ্যে আরও নতুন কিন্তু তেতো অভিজ্ঞতা!
ততক্ষণে পরিসংখ্যানবিদেরা বের করে ফেলেন দারুণ এক তথ্যও। বিশ্বকাপের ইতিহাসে কেপ ভার্দের আগে শুধু একটি দলই এই টুর্নামেন্টে তাদের প্রথম গোলটি করেছিল সরাসরি ফ্রি–কিক থেকে। আর্জেন্টিনা! সেটা ১৯৩০ বিশ্বকাপে লুইস মন্টির কল্যাণে ফ্রান্সের বিপক্ষে। ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপের তথ্য–উপাত্ত সংরক্ষণ শুরুর পর অবশ্য কেপ ভার্দেই এ তালিকায় প্রথম দল।
উরুগুয়েও ততক্ষণে সমতায় ফিরতে মরিয়া। ধারাবাহিক চাপ বিস্তারের ফল হিসেবেই ৪৪ মিনিটে পোস্টে লেগে ফিরে আসা বলকে হেডে জালে পাঠিয়ে উরুগুয়েকে সমতায় ফেরান মাক্সিমিলিয়ানো আরাউহো। গ্যালারিতে উরুগুয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন মার্সেলো বিয়েলসার দলের সমর্থকেরা। সেই অর্ধেই যোগ করা সময়ে মিডফিল্ডার আগুস্তিন কানোবিওর গোলে মনে হয়েছিল, কেপ ভার্দে ‘বিপ্লব’–এর বুঝি এখানেই শেষ!
ভুল।
গ্রুপ পর্বে একটি ম্যাচও জিততে না পেরে উরুগুয়ের খেলোয়াড়দের চোখেমুখে স্পষ্ট হতাশা
গ্রুপ পর্বে একটি ম্যাচও জিততে না পেরে উরুগুয়ের খেলোয়াড়দের চোখেমুখে স্পষ্ট হতাশাএএফপি
উরুগুয়ের মুখোমুখি হওয়ার আগে ফিফা ওয়েবসাইটকে পিনা বলেছিলেন কেপ ভার্দের হার না–মানা মানসিকতার গূঢ় রহস্য, ‘মাঠে নামলে সবাই সমান। কার (জয়ের) চাওয়াটা বেশি, কারা সবকিছু নিংড়ে দিতে চায়, তার ওপর সবকিছু নির্ভর করে।’
বিরতির পর কেপ ভার্দেকে ঠিক এ রূপেই দেখা গেছে। বলের সঙ্গে অহর্নিশ লেগে ছিল তারা—সেটা কি আক্রমণে, কি রক্ষণে। অন্যদিকে উরুগুয়ে ধীরে ধীরে ধৈর্য হারায়, সঙ্গে মনোযোগও। তা না হলে বদলি নামা কেপ ভার্দে মিডফিল্ডার হেলিও ভারেলার ৬১ মিনিটে সমতাসূচক গোলের উৎস উরুগুয়ের দুই খেলোয়াড়ের ভুল–বোঝাবুঝি হবে কেন!
বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে উরুগুয়ে ডিফেন্ডার মাতিয়াস ওলিভিয়েরা বলে ঠিকমতো পা লাগাতে পারেননি। গোলকিপার মুসলেরাও ছিলেন নিজের জায়গা থেকে বেশ এগিয়ে। সে সুযোগে ভারেলা বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক শটে যে ফিনিশ করেছেন, সেটা ইউরোপের তারকা স্ট্রাইকারদের কাছ থেকে দেখা যায়।
কেপ ভার্দের ড্রয়ের আনন্দে গ্যালারিতে দেশের পতাকা উঁচিয়ে ধরেন দলটির গোলকিপার ভোজিনিয়ার মা
কেপ ভার্দের ড্রয়ের আনন্দে গ্যালারিতে দেশের পতাকা উঁচিয়ে ধরেন দলটির গোলকিপার ভোজিনিয়ার মাএএফপি
ভালভের্দের একটি গোল অফসাইডের জন্য বাতিল হয়। তাই বলে উরুগুয়ের দুর্ভাগ্যকে দোষার সুযোগ নেই। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খেলেই আসলে পয়েন্ট কেড়েছে কেপ ভার্দে। এমনকি ম্যাচের একদম শেষ দিকে পাওয়া কিছু সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে কেপ ভার্দে ম্যাচটি জিততেও পারত। তবে ম্যাচটি না দেখলে এসব বিশ্বাস করা কঠিন।
যেমন ‘এইচ’ গ্রুপের পয়েন্ট টেবিলও এখন বিশ্বাস করা কঠিন। প্রত্যাশা অনুযায়ী স্পেন ২ ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে এবং উরুগুয়ে সমান ম্যাচে ২ পয়েন্ট নিয়ে দুইয়ে থাকলেও তাদের জন্য নকআউটে ওঠা বেশ কঠিন হয়ে উঠল। কেপ ভার্দেও ২ ম্যাচে ২ পয়েন্ট পেলেও গোল ব্যবধানে পিছিয়ে তারা তিনে এবং সৌদি আরব ২ ম্যাচে ১ পয়েন্ট নিয়ে চারে।
সৌদি আরবের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে শেষ ম্যাচ খেলবে কেপ ভার্দে। এই ম্যাচ জিতলেই নকআউটে ওঠা নিশ্চিত হয়ে যাবে তাদের। গ্রুপ পর্বে উরুগুয়ের শেষ ম্যাচে প্রতিপক্ষ স্পেন। কোনোরকম হিসাব–নিকাশ ছাড়া পরের রাউন্ডে উঠতে ম্যাচটি জিততে হবে উরুগুয়েকে।































