রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার ও মর্যাদার গল্পের সূচনা হোক এখনই: তারেক রহমান


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬, ০২:০৪ এএম
রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার ও মর্যাদার গল্পের সূচনা হোক এখনই: তারেক রহমান

মিয়ানমারে দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিউইয়র্কে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে তিনি রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার জীবন গড়তে কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

বুধবার প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ এখনো ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমারে সহিংসতার কারণে মানুষ এখনো পালিয়ে আসছে। প্রতিবছর শিবিরগুলোতে হাজার হাজার শিশুর জন্ম হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরেকটি প্রজন্ম।

মানবিকতার তাগিদেই বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়েছিল বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ছয় হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুরা মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা পাচ্ছে।

রোহিঙ্গা তরুণদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তারেক রহমান। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ভবিষ্যতে তাঁদের পুনরায় একীভূত হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

শিবিরগুলোর পরিস্থিতি উন্নত করতে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন বসবাসের জন্য এসব শিবির কোনো আদর্শ স্থান নয়।

দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির ব্যয় প্রতিদিন বাড়ছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এর প্রভাব শুধু রোহিঙ্গাদের ওপর নয়, কক্সবাজারের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও পড়ছে। বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ এখন বিপুল।

দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা মানব পাচার, অভিবাসী পাচার, মাদক পাচারসহ নানা আন্তদেশীয় অপরাধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে তিনি জানান। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ কেউ নৌকায় করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন। একটি দেশে অমীমাংসিত থেকে যাওয়া সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

মানবিক সহায়তার প্রয়োজন বাড়লেও সেই জীবনরেখা সংকুচিত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন জানানো হয়েছিল। ২০২৬ সালের জন্য সেই আবেদন কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা শুধু ন্যূনতম জীবন রক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানোর জন্য।


বাংলাদেশের পাশে অব্যাহতভাবে দাঁড়িয়ে থাকা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন তাদের সহায়তা বেশি প্রয়োজন। মানবিক সহায়তার উদারতা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি ও সমাধান—দুটিই মিয়ানমারে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখনো গভীরভাবে উদ্বেগজনক বলে তিনি জানান।

রোহিঙ্গারা এখনো জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম ও অন্যান্য ধরনের নিরাপত্তাহীনতাসহ গুরুতর লঙ্ঘন ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে বলে বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধে গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিস্থিতি এখনো নিশ্চিত হয়নি উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, সহমর্মিতা থেকে সংকটের মূল কারণ ও সমাধান খোঁজার পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপে ও বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে বাস্তুচ্যুতির অবসান ঘটানোর দিকে এগোতে হবে।

পাঁচ দফা প্রস্তাবের প্রথমটিতে তারেক রহমান বলেন, রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে। মিয়ানমারের ভেতরে প্রত্যাবাসন অনুকূল পরিস্থিতি তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও অন্যান্য রাষ্ট্রকে তাদের প্রভাব কাজে লাগাতে হবে।

দ্বিতীয় প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানান। রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।

তৃতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও সহায়তা দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁদের উদার আতিথেয়তার কারণে উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়।

চতুর্থ প্রস্তাবে টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেন তারেক রহমান। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি নিশ্চিতের প্রচেষ্টায় গাম্বিয়ার নেতৃত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। ব্যক্তিগত অপরাধের দায় নির্ধারণের পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্তব্যবস্থাও কাজ করছে বলে জানান তিনি। আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্তব্যবস্থাগুলোকে অব্যাহত সহায়তা দেওয়া এবং গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।

পঞ্চম প্রস্তাবে মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানব পাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র এবং অন্যান্য আন্তসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান তারেক রহমান।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় দেখতে চায় না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে ও অধিকার সুরক্ষিত রেখে মিয়ানমারে নিজ ঘরে ফিরে যেতে হবে।

প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সহায়তা করতে প্রস্তুত থাকবে বলে জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ভাগ্য যেন নিপীড়ন, বিতাড়ন ও বাস্তুচ্যুতির আরেকটি গল্প হয়ে না থাকে; বরং তা ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার গল্প হয়ে উঠুক।

তারেক রহমান বলেন, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই গল্পের সূচনা হোক এখনই।

জাতীয় বিভাগের আরো খবর

Link copied!