স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে প্রচারের সময় ভোটারদের এনআইডি ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ভোট কেনাবেচা ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে লেনদেন বন্ধ করতে সিটি করপোরেশন নির্বাচন আচরণ বিধিমালায় এ বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
নতুন এ বিধিমালা ভঙ্গ করলে জেল-জরিমানের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে।
ইসির সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আচরণবিধির গেজেট প্রকাশিত হয়েছে গত ১ সেপ্টেম্বর।
২০১৬ সালের আচরণবিধি বাতিল করে তৈরি করা নতুন এই বিধিমালা অনুযায়ী, প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটারকে প্রভাবিত করতে ভোটারের নিজের বা তার পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত এনআইডি নম্বর এবং এমএফএসে লেনদেনের উদ্দেশ্যে মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করা যাবে না।
এর আগে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নতুন আঙ্গিকে দল ও প্রার্থীর আচরণবিধি তৈরি করে এ এম এম নাসির উদ্দীনের নেতৃত্বাধীন কমিশন।
ওই নির্বাচনে ভোটারদের এনআইডি ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহের অভিযোগ উঠলে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে শাস্তির বিষয়ে সতর্ক করেছিল ইসি।তবে এবারই প্রথম স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মূল বিধিমালায় বিষয়টিকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হল।
নতুন আচরণবিধির বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, "স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। সংসদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে আচরণবিধি আমরা চূড়ান্ত করেছি।”
তিনি জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার রোধ, অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ভোটের প্রচারে বারণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রচারণার বিষয়গুলোও এতে যুক্ত করা হয়েছে।
পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের জন্য আলাদা আলাদা আচরণবিধি জারি করা হবে বলে ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রচারে মানতে হবে যেসব নিয়ম
নতুন আচরণবিধিতেও ভোটের প্রচারে রঙিন ও কাগজের পোস্টার ছাপানো পুরোপুরি নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারে সরকারি সুবিধা নিয়ে প্রচার চালানো যাবে না।
নির্বাচনী ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন ও বিলবোর্ডের নির্দিষ্ট আকারও আচরণবিধিতে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সব প্রচার সামগ্রী হতে হবে সাদা-কালো রঙের।
ব্যানার: আয়তনে সর্বোচ্চ ১০ ফুট বাই ৪ ফুট।
লিফলেট ও হ্যান্ডবিল: এ-ফোর সাইজের (৮.২৭ ইঞ্চি বাই ১১.৬৯ ইঞ্চি)।
ফেস্টুন: ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি।
বিলবোর্ড: আয়তনে সর্বোচ্চ ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট।
প্রতীক: দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা সর্বোচ্চ ৬ ফুটের বেশি হতে পারবে না। কোনো জীবন্ত প্রাণী প্রচারে ব্যবহার করা যাবে না।
এছাড়া প্রচার সামগ্রীতে মুদ্রণের তারিখ থাকতে হবে। কোনোভাবেই পলিথিনের আবরণ বা পিভিসি ব্যবহার করা যাবে না। লিফলেট বা ফেস্টুনে প্রার্থীর নিজের ছবি ও প্রতীক ছাড়া অন্য কারও ছবি বা বক্তব্য রাখা যাবে না।
অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকায় নতুন পদ
নির্বাচনি প্রচারে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে 'সরকারি অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি'র তালিকায় এবার নতুন কিছু পদ যুক্ত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, বিরোধী দলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, বিরোধী দলীয় উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী বা সমমর্যাদার ব্যক্তি, সংসদ সদস্য ও সিটি মেয়রের পাশাপাশি এবার যুক্ত করা হয়েছে মেয়রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রশাসকদের।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, "এবারের আচরণবিধি আগের চেয়ে বেশ সুসংহত (কমপ্রিহেনসিভ) মনে হয়েছে। গত নির্বাচনে এনআইডি নেওয়া ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহের যে অপচর্চা দেখা গিয়েছিল, তা সরাসরি বিধিমালায় আসায় প্রার্থীরা সতর্ক হবে এবং ইসিও সহজে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে।"
তবে আচরণবিধির কিছু ‘দুর্বল’ দিক তুলে ধরে এই বিশ্লেষক বলেন, "প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বা সচিব পদমর্যাদার রাজনৈতিক সহকারীদেরও অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকায় যুক্ত করা উচিত ছিল। কারণ তারা সরকারি কর্মকর্তা না হলেও সচিব পদমর্যাদা ভোগ করেন, যা আচরণবিধিতে না থাকলে তাদের আটকানো কঠিন হবে।"
এছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দলীয় হলেও রাজনৈতিক দলগুলো যে অনানুষ্ঠানিকভাবে এতে সম্পৃক্ত থাকে, সে বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, “দলগুলোর ভূমিকা কতটুকু থাকবে বা তারা কীভাবে সম্পৃক্ত হতে পারবে—সে বিষয়টি আচরণবিধিতে আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন ছিল।”




























