বিদায় ভাষণে ইউনূস

‘কোথায় সফল কোথায় ব্যর্থ, বিচারের ভার আপনাদের’


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬, ১১:৩১ পিএম
‘কোথায় সফল কোথায় ব্যর্থ, বিচারের ভার আপনাদের’

দেশের ক্রান্তিলগ্নে দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার যেসব পরিবর্তনের সূচনা করেছে, তা ধরে রাখতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।

তিনি বলেছেন, “দল-মত, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে আহ্বান জানাই—একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে।”

নির্বাচিত সরকারের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের মাধ্যমে বিদয়ের আনুষ্ঠানিকতা সারার আগে সোমবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এই আহ্বান জানান নোবেলজয়ী ইউনূস।

তিনি বলেন, “আমি ও আমার সহকর্মীরা—সবাই আমরা সেই অঙ্গীকার রক্ষার চেষ্টা করে গেছি। কোথায় কতটুকু সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি, কোথায় ব্যর্থ হয়েছি সে বিচারের ভার আপনাদের ওপর থাকল।”

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৫ বছরের শাসন অবসানের পর অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের আমন্ত্রণে ২০২৪ সালের ৮ অগাস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেন নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস।

এই সরকারের তত্ত্বাবধানে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হয়েছে, যাতে বড় জয় পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি।

মঙ্গলবার বিকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দাক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ হবে, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসও সেখানে উপস্থিত থাকবেন। মূলত এর মধ্যে দিয়েই তার দেড় বছরের দায়িত্বের সমাপ্তি ঘটবে।

প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে বলেন, “গত ১৮ মাসে ক্রমান্বয়ে এদেশের মানুষের মধ্যে গণতন্ত্র, একটি কল্যাণমূলক শাসনব্যবস্থা, বাক-স্বাধীনতা, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারা-সমালোচনা করতে পারা, জবাবদিহিতায় আনতে পারার যে চর্চা শুরু হল, উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন করে জনগণের অধিকার নিশ্চিত হল, এই ধারা যেন কোনোরকমেই হাতছাড়া হয়ে না যায়।

“আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের আপামর জনগণ এবং সকল রাজনৈতিক পক্ষ ইস্পাত কঠিন ঐক্যের মাধ্যমে এই ধারাকে আগামী দিনগুলিতে রক্ষা করবে, সমৃদ্ধ করবে।”

জুলাই সনদ
জুলাই সনদকে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘সবচেয়ে বড় অর্জন’ হিসেবে তুলে ধরে ইউনূস বলেন, এর ভিত্তিতে গণভোটে ‘বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায়’ তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত দিয়েছে দেশের মানুষ।

“জুলাই সনদের বাস্তবায়ন হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। আশা করব এটা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন হবে।”

তার আশা, অন্তর্বর্তী সরকারের ছোটবড় ভালোমন্দ অনেক কথা ভুলে গেলেও জুলাই সনদের কথা জাতি কখনো ‘ভুলবে না’।

“এই সনদ রচনা এবং গণভোটে পাশ করানোর জন্য আমি সকল রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, অধিকার রক্ষা প্রতিষ্ঠান যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে তাদের সবাইকে আজ অভিনন্দন জানাচ্ছি।”

‘অমিত সম্ভাবনার দেশ’
ইউনূস বলেন, “বাংলাদেশ এখন আর কেবল সংকট থেকে উত্তরণের গল্প নয়। বাংলাদেশ আজ অমিত সম্ভাবনার দেশ।”

বাংলাদেশ যদি তার বিপুল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীকে ‘দক্ষ, কর্মঠ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ’ কর্মীবাহিনীতে রূপান্তর করতে পারে, তাহলে অনেক উন্নত দেশের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য দক্ষ জনশক্তি সরবরাহকারী দেশে পরিণত হতে পারবে–সে কথাও প্রধান উপদেষ্টা বলেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও শুল্ক চুক্তি হওয়ার কথা তুলে ধরে ইউনূস বলেন, “এই চুক্তি কেবল একটি বাণিজ্যিক সুবিধা নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করার জন্য একটি কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।”

এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য সম্পূরক শুল্ক ৩৭% থেকে ১৯%-এ কমে এসেছে বলে তিনি দাবি করেন, যদিও আগেই যুক্তরাষ্ট্র তা ৩৭% থেকৈ কমিয়ে ২০% করেছিল।

ইউনূস বলেন, “এই চুক্তির একটি বিশেষ দিক হল—যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাক পণ্যে শূন্য পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা। এটা একটা মস্ত বড় সুবিধা। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক সুবিধা পাওয়ায় বাংলাদেশি পোশাক আরও কম দামে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করবে।

“যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহারের ফলে আমাদের সরবরাহ চেইন আরও বৈচিত্র্যময় ও স্থিতিশীল হবে; এটি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে উচ্চমূল্যের ও উন্নতমানের পণ্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ করে দেবে।”

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত টেকসই, বৈচিত্র্যময় ও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে জাপানের সঙ্গে সম্পাদিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তিকে একটি ‘ঐতিহাসিক ও কৌশলগত অগ্রগতি’ হিসেবে বর্ণনা করেন প্রধান উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, “জাপানের সঙ্গে সহযোগিতার ফলে অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক্স, রেলওয়ে সরঞ্জাম, গ্রিন টেকনোলজি এবং উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্যে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে যুক্ত হতে পারবে। এতে আমাদের ঝুঁকি কমবে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। পৃথিবীর শিল্পোন্নত দেশগুলো আমাদের দেশে বিনিয়োগ করবে শুধু জাপানে শুল্কমুক্ত রপ্তানির সুবিধা গ্রহণ করার জন্য।”

‘শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং সততা’
ইউনূস বলেন, “আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই—সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে তিনটি বিষয়ের কোনো বিকল্প নেই: শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং সততা।”

তিনি বলেন, “অতীতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সীমাহীন দুর্নীতি, অসততা, অনিয়ম ও জালিয়াতিকে উৎসাহিত করা হয়েছিল। সেই সংস্কৃতি আমাদের পেছনে টেনে রেখেছিল, আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করেছিল।

“নতুন বাংলাদেশকে সেই পথ থেকে সরে আসতে হবে। আমাদেরকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে নিয়ম মানায়, প্রতিশ্রুতি রক্ষায়, মান বজায় রাখায়, রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরকে দুর্নীতিমুক্ত করায়, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করায়।”

বিদায় বেলায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমরা শূন্য থেকে শুরু করিনি—শুরু করেছি মাইনাস থেকে। ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে তারপর সংস্কারের পথ ধরেছি।

“আজ অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিচ্ছে। কিন্তু গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, বাকস্বাধীনতা ও অধিকার চর্চার যে ধারা শুরু হয়েছে—তা যেন কখনো থেমে না যায়।”

জাতির উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমরা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ছেড়ে গেলেও নতুন বাংলাদেশ গড়ার সার্বিক দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সবার। আমাদের সকলের দায়িত্ব দেশকে সত্যিকারের গণতন্ত্র হিসেবে পরিস্ফুটিত করা।

“জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের জন্য এই দরজা খুলে দিয়েছে, আমরা যদি স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও শক্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, তবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।”

দায়িত্ব থেকে বিদায় নেবার এই প্রাক্কালে সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে নোবেলজয়ী ইউনূস বলেন, “আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ি—যেখানে সম্ভাবনা সীমাহীন, আর স্বপ্নের কোনো সীমানা নেই।”

‘উদাহরণ হয়ে থাকবে’
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস তার ভাষণের শুরুতেই একটি ‘উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য’ সবাইকে শুভেচ্ছা জানান।

তিনি বলেন, “এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ, ভোটার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্মিলিতভাবে একটি প্রশংসনীয় নজির সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নির্বাচন কেমন হওয়া উচিত—এই নির্বাচন তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে।”

তিনি বলেন, “এই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে যারা জয়ী হয়েছেন তাদের আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। যারা পরাজিত হয়েছেন তাদেরকেও আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। হার-জিতই হল গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।

“আগামী দিন নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে–এর মাধ্যমে আমাদের ১৮ মাসের দায়িত্বের সমাপ্তি হবে।”

২০০৪ সালের অগাস্টে কোন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “চব্বিশের জুলাই মাসে বাংলাদেশের মানুষ এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাদের মুক্তি, আকাঙ্ক্ষা ও মর্যাদার দাবি উচ্চারণ করেছিল।

“সেই সময় দেশ একটি গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও মানবিক সংকটে নিপতিত ছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল, গণতন্ত্র হয়েছিল ধুলিস্যাৎ, ভবিষ্যৎ ছিল অনিশ্চিত।”

তিনি বলেন, “ঠিক সেই সংকটময় সময়ে আমাকে আহ্বান জানানো হয়েছিল—একটি লক্ষ্য সামনে রেখে। বাংলাদেশকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর জন্য তিনটি দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। সংস্কার। বিচার। এবং নির্বাচন।”

সেই দায়িত্ব পালনে অন্তর্বর্তী সরকার কতটা সফল হয়েছে, তা বিচারের ভার দেশের জনগণের ওপর ছেড়ে দিয়ে বিদায়ী সরকারপ্রধান বলেন, “আমাদের প্রচেষ্টায় কোনো ঘাটতি ছিল না। আমরা মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনীতি ও প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে রেখেছি। আমরা ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, আর্থিক সংস্কারে হাত দিয়েছি—যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজেকে স্থাপন করতে না পারে।

“আর সর্বোপরি, আমরা একটি উৎসবমুখর, অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ, পরিচ্ছন্ন ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করেছি, যার মাধ্যমে জনগণ আবার তাদের ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে।”

তার ভাষায়, এই নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার “নতুন অভিযাত্রার সূচনা; নতুন বাংলাদেশের জন্ম।”

এই অর্জনের পেছনে যারা ছিলেন— জুলাইয়ে সেই শহীদ ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “তাদের অভূতপূর্ব ত্যাগ ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব হত না।”

সংস্কার
ইউনূস বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেয়ালে দেয়ালে তরুণরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন এঁকেছিল—তার কেন্দ্র ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।

সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন করেছে এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে, যার প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে তিনি তথ্য দেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “এই সংস্কারসমূহ নাগরিক অধিকারকে সংহত করেছে, বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে এবং গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি যেন আর কখনো ফিরে না আসে সেটা নিশ্চিত করেছে।”

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে ‘অত্যন্ত ভঙ্গুর’ ছিল, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “আজ পুলিশ আর মারণাস্ত্র ব্যবহার করে না, বেআইনিভাবে কাউকে তুলে নিয়ে যায় না, ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে হত্যা করে না, পুলিশ ও গোয়েন্দাবাহিনীর ভয়ে কাউকে ডিলিট বাটন চাপতে হয় না।”

বিচার বিভাগকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে পৃথক সচিবালয় গঠন, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ কাঠামো এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনে সংস্কারের কথাও প্রধান উপদেষ্টা বলেন।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ যেন আর কখনো মানবাধিকারহীন রাষ্ট্রে পরিণত না হয়—সে লক্ষ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে এবং কমিশন গঠন করা হয়েছে।”

নারী ও শিশুর সুরক্ষায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করার মধ্য দিয়ে কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীদের হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার পথ ‘সুগম হয়েছে’ বলে তিনি দাবি করেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “স্বৈরাচারের ১৬ বছরে এদেশের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা যে ভয়াবহ নিপীড়ন, মামলা–হামলা, গুম ও হত্যার শিকার হয়েছেন, তা আমাদের জাতির জন্য এক গভীর ও বেদনাদায়ক শিক্ষা।

“এই অভিজ্ঞতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—যাতে ভবিষ্যতে আর কখনো কোনো জালেম মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত না হয়, শত শত আয়নাঘর সৃষ্টি না হয়, বিচারবহির্ভূত হত্যা ফিরে না আসে—সেজন্য কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকারই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক ও গভীর সংস্কার। এই উপলব্ধি থেকেই অন্তর্বর্তী সরকার তার সংস্কার কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।”

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই হত্যার একাধিক মামলার রায় আসার কথা তুলে ধরে ইউনূস বলেন, “আমরা আশা করছি, আগামী দিনগুলোতেও বিচারিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে এগিয়ে যাবে।”

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত ছিল, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল–সেসব কথাও মনে করিয়ে দেন প্রধান উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, তার সরকার রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, করনীতি, মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক খাতে কাঠামোগত সংস্কার এনেছে।

“তলাবিহীন অর্থনীতি আমাদের জন্য রেখে গেছিল আগের ফ্যাসিবাদী সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংককে ফতুর করে দিয়ে গেছে। ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার করে নিয়ে গেছে। বিশাল ঋণের বোঝা রেখে গেছে।

“এখন যাবার সময় স্বস্তি পাচ্ছি যে আমরা অবস্থার মোকাবিলা করতে পেরেছি। এবং নতুন অর্থনীতির বুনিয়াদ রচনা করে রেখে যেতে পারছি। এখন আর পাওনাদাররা আমাদের তাড়া করতেও আসবে না। আন্তর্জাতিক লেনদেনে আমরা চোখে অন্ধকার দেখব না। আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ এখন ৩৪ বিলিয়ন ডলার।”

বন্দরের ব্যবস্থাপনা বিদেশির হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছিল ইউনূস সরকার।

বিদায়ী ভাষণে তিনি বলেন, “আমাদের বন্দরগুলোর দক্ষতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেবার জন্য সেরা আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির কাজে অনেক এগিয়ে এসেছি। এর দক্ষতা বাড়াতে না পারলে আমরা অর্থনৈতিক অর্জনে পিছিয়ে যাব।”

তিনি দাবি করেন, “পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও দেশের মর্যাদা—এই তিনটি মূল ভিত্তি আমরা দৃঢ়ভাবে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। নতজানু পররাষ্ট্রনীতি কিংবা অপর দেশের নির্দেশনা ও পরামর্শনির্ভর বাংলাদেশ এখন আর নয়—আজকের বাংলাদেশ নিজের স্বাধীন স্বার্থ রক্ষায় আত্মবিশ্বাসী, সক্রিয় ও দায়িত্বশীল।”

সূত্র: বিডিনিউজ

Link copied!