তালা ভেঙে চুয়েটে ঢুকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন নতুন উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম। ৩৪ ঘণ্টা পর চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার গিয়ে তাকে উদ্ধার করে আনল।
আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পুলিশ পাহারায় একটি অ্যাম্বুলেন্সে চড়ে ক্যাম্পাস ছাড়েন তিনি। তখন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলছিলেন, চুয়েটে আর ফিরবেন না- এমন শর্তেই তারা শেখ শরীফুল আলমকে ছেড়ে দিয়েছেন।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্যের পদ থেকে অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে শেখ শরীফুল আলমকে দায়িত্ব দেওয়ার পর ক্ষোভ চলছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শরীফুলকে মেনে না নেওয়ার ঘোষণা দেন তারা।
এরই মধ্যে গতকাল সোমবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে একটি মাইক্রোবাসে চড়ে চুয়েট ক্যাম্পাসে যান শরীফুল আলম। তার সঙ্গে ছিলেন চুয়েট ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদসহ ১১ জন।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ঝোলানো তালা ভেঙে উপাচার্যের কার্যালয়ে তারা অবস্থান নিলে শিক্ষার্থীরা তাদের অবরুদ্ধ করে ফেলেন। বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় কার্যালয়ের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ।
এই পরিস্থিতির মধ্যে আজ সন্ধ্যায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়ে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার যান চুয়েট ক্যাম্পাসে।
সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে ভিসি শরীফুল আলমকে ক্যাম্পাস থেকে বের করা হয়। ভিসির সঙ্গে অবরুদ্ধ হওয়া ১১ জনও বের হন। এসময় গাড়ির সামনে-পেছনে ছিল পুলিশ পাহারা। একই বহরে ছিল ডিসি ও এসপির গাড়ি।
এসময় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সাংবাদিকসহ বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘ভিসি একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ। দুই দিন ধরে তিনি এখানে অবরুদ্ধ আছেন। স্যার অসুস্থ, তাই আমরা তাকে নিয়ে যেতে এসেছি।’
শরীফুল আলম সহায়তা চাইছিলেন জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘তিনি চিকিৎসার সহায়তা চেয়েছেন। একজন সম্মানিত মানুষ হিসেবে তাকে এবং তার সঙ্গে যারা আছেন, তাদেরও অসুস্থতার ঝুঁকিতে না রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে আমরা নিয়ে যেতে চাই।’
শিক্ষার্থীদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি। সাবেক ভিসির সঙ্গেও কথা বলেছি। কিন্তু এটি সরকারের সিদ্ধান্ত। আমরা চাইলেও এখানে কিছু করতে পারব না।’
ভিসির সঙ্গে থাকা ১১ জনের মধ্যে একজন হত্যা মামলার আসামি বলে প্রশ্ন তোলেন শিক্ষার্থীরা।
জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘তার নামে মামলা থাকলে অবশ্যই তা খতিয়ে দেখা হবে।’
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, শিক্ষার্থীরা যেহেতু বলেছেন, এখানে মামলার আসামি রয়েছেন, তাই তারা খোঁজ নিয়ে দেখবেন। পাওয়া গেলে তাকে আটক করা হবে।
অবরুদ্ধ উপাচার্যকে বের করে নিয়ে যাওয়ার সময় ডিসি ও এসপির সামনে শিক্ষার্থী অর্ণব বলেন, ‘আমরা আমাদের নতুন ভিসিকে এক শর্তে ছেড়েছি—তিনি আর এই ক্যাম্পাসে আসবেন না।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী আসাদুল্লাহ গালিব বলেন, ‘যখন আমাদের ভাইয়েরা শহরে আক্রান্ত হলেন, তখন প্রশাসন কোথায় ছিল? তালা ভেঙে একজন ভিসি কীভাবে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন? আমরা বাসে হামলা ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার বিচার চাই।’
ভিসিকে অবরুদ্ধ রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা স্যারকে রাত ১২টা পর্যন্ত আলটিমেটাম দিয়েছিলাম, কিন্তু স্যার বের হননি। আমরা পানি ও গ্যাসের সরবরাহ লাইন বন্ধ করিনি। তারা ওষুধ চেয়েছেন, আমরা দিয়েছি। তারা পানি ও খাবার চেয়েছেন, আমরা দিয়েছি।’
৫৬ দিনের মাথায় নতুন উপাচার্য
চুয়েটে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় উপাচার্য পরিবর্তন করা হয়, যা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যতিক্রমী একটি ঘটনা হিসেবে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
গত ২৭ জুলাই উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন চুয়েটের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। গত ২১ সেপ্টেম্বর তাকে সরিয়ে কুয়েটের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য পদে নিয়োগ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
হঠাৎ উপাচার্য পরিবর্তনের কারণ প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়নি। ৫৬ দিনের মাথায় এমন পরিবর্তনে চুয়েটের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবে নেননি। ফলে শরীফুল আলমকে নিয়োগের পর তারা আন্দোলনে নামেন।














