ছোটবেলা থেকে মা-ঠাকুরমার মুখে শুনে আসছি মহিষাসুরমর্দিনী মা দুর্গার আখ্যান। দীর্ঘ তপস্যার পর মহিষাসুর ব্রহ্মার বরে অমরত্ব পায়। তাকে এই বলে ব্রহ্মা বর দিলেন যে ‘দেব, মানব বা দানবের হাতে সে কখনো বধ হবে না।’ অমরত্ব পেয়ে মহিষাসুর স্বর্গ আক্রমণ করে বসে। শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধে দেবতাদের পরাস্ত করে স্বর্গের দখল নেয় মহিষাসুর। স্বর্গরাজ্যচ্যুত দেবতারা নিরুপায় হয়ে শিব ও বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। তখন জানানো হয়, মহিষাসুর কোনো দেব বা মানবের হাতে নিহত হবে না, এমন বর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো দেবী বা মানবীর হাতে তার মৃত্যু হবে না, এমন তো বলা হয়নি। স্বর্গরাজ্য ফিরে পাওয়ার জন্য দেবতারা সমবেতভাবে সাধনা করে এক মহামায়া শক্তি সৃজন করেন। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর এবং অন্যান্য দেবতাদের সম্মিলিত তেজোরাশিতে এক দেবী মূর্তির জন্ম হয়। অপূর্ব লাবণ্যময়ী সে দেবী আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা-চতুর্দশী তিথিতে মর্ত্যে অবতরণ করেন, যা পরবর্তী সময়ে ‘মহালয়া' নামে পরিচিতি পায়।
সপ্তমীতে দেবতারা তাদের নিজ নিজ অস্ত্রে সজ্জিত করলেন দেবীকে। বিষ্ণু দিলেন চক্র, মহাদেব ত্রিশূল, ব্রহ্মা রুদ্রাক্ষের মালা ও কমণ্ডলু, ইন্দ্র বজ্র, বিশ্বকর্মা শাণিত-কুঠার, বরুণদেব পাশ, যমরাজ কালদণ্ড। ক্ষীরোদ সমুদ্র থেকে উঠে আসা মুণিমুক্তো ও অলংকারে সজ্জিত হলো দেবীর দশভুজ। কেয়ুর, বলয়, কণ্ঠভূষণ, নূপুর ও রত্নাঙ্গুরীয়তে অলংকৃত হলো দেবীর প্রতিটি অঙ্গুলি। গিরিরাজ দিলেন দেবীর বাহন সিংহ। নানা অস্ত্র ও অলংকারে ভূষিতা দশভুজা মহিষাসুর বধের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত হলেন। দেবীর অট্টহাসি ও সিংহের গর্জনে স্বৰ্গমর্ত্য মুখরিত হলো।
তিন দিন ঘোর যুদ্ধের পর দেবীর চক্রে মহিষাসুরের মস্তক বিচ্ছিন্ন হয়ে মহিষমর্দিনীর পায়ে লুটিয়ে পড়ল। মৃত্যুর আগে মহিষাসুর দেবীর কাছে বর চাইলেন, ‘দেবী, আপনার হাতে মৃত্যুর পর পুণ্যস্বরূপ আমি যেন চিরকাল আপনার পদতলে থাকতে পারি’। প্রার্থনা মঞ্জুর করে দেবী বললেন, ‘যত দিন মহিষমর্দিনীরূপে মর্ত্যে আমার পুজো হবে, আমার পদপ্রান্তে তুমিও পূজিত হবে।’
আখ্যান হিসেবে মহিষাসুর-বধ কাহিনি অসাধারণ। কিন্তু এই আখ্যান অথবা কিংবদন্তির আড়ালে অনেক ঐতিহাসিক সত্য নিহিত আছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মানুষ মাতৃবন্দনা করে আসছে। নারীকে উর্বরতার প্রতীক মনে করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় পাওয়া ৩৩ হাজার বছর পুরোনো ভেনাস অব উইল্যানডফ প্রমাণ করে এই নারী শক্তির উপাসনা কতটা প্রাচীন। নারী উর্বরতা ও প্রাণশক্তির প্রতীক। নিম্নশ্রেণির প্রাণীর মধ্যে দেখা যায়, সন্তানের প্রতি পুরুষের একধরনের আগ্রাসী মনোভাব থাকে। কিন্তু মা-ই সন্তানকে রক্ষা করে। মায়ের এই রক্ষাময়ী রূপটিই হয়ত উপাখ্যানে দুর্গা প্রতীকে উদ্ভাসিত হয়েছে।
মহিষাসুরের মহিষ প্রতীক সম্পর্কে গবেষক নির্মল কর লিখেছেন, ‘মহিষাসুর-বধ কাহিনির মধ্যে নিহিত আছে এক প্রাচীন উপাখ্যান। এবং তা হলো আল্পীয় আর্যদের সঙ্গে বাংলার দেশজ জাতিসমূহের সংঘর্ষ। এ দেশে আল্পীয় আর্যরা এসেছিল বৈদিক নর্ডিক আর্যদের আগমনের অনেক আগে। তারা আসে সমুদ্রপথে। উপরন্তু তারা যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল তার প্রমাণ বাঙালির বর্তমান নৃতাত্ত্বিক গঠনের মধ্যে আল্পীয় উপাদানের প্রাধান্য। এটা যে-যুগের ঘটনা, তখন বাংলার সমাজ ছিল কৌমভিত্তিক। এ তথ্যের হদিস দেয় পরবর্তীকালের বৈদিক-সাহিত্য। তত্ত্বজ্ঞরা মনে করেন, বাংলার এ রকম কোনো কৌমভিত্তিক সমাজের টোটেম বা কুল-প্রতীক ছিল মহিষ। মহিষাসুরের সঙ্গে দেবীর যুদ্ধ আসলে বাংলায় আধিপত্য স্থাপনের জন্য কৌমভিত্তিক জাতির সঙ্গে আল্পীয়দের যুদ্ধ। পুরাণ-রচয়িতারা এই প্রাচীন ঘটনাবলম্বনে মহিষমর্দিনী সম্পর্কিত আখ্যান সৃষ্টি করেন। সিন্ধু-সভ্যতার সমকালীন সুমের দেশের পুরাণে যে-দেবীকে সিংহবাহিনী পার্বতী ও যুদ্ধের নেত্রী বলে বর্ণনা করা হয়েছে, তা মহিষমর্দিনীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।’
নির্মল কর সুমেরীয় যে সিংহবাহিনী দেবীর কথা বলেছেন তার নাম আসলে ইনান্না বা ইশতার। দশভুজা দুর্গার সঙ্গে সুমেরীয় দেবী ইনান্নার অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়। ইনান্না বা এনান্না, ভারতবর্ষে এসে হয়ে গেলেন অন্নপূর্ণা। অন্নপূর্ণা দেবী দুর্গার আরেক নাম। এছাড়া কন্যাকুমারী, মিনাক্ষী নামেও দেবী দুর্গা দক্ষিণ ভারতে পূজিত হন।
আর্যদের বেদে কিন্তু মাতৃপূজা নেই। তাই ইতিহাসবিদ অতুল সুরের ধারণা সেটা সুমেরীয়দের থেকে পাওয়া।
খ্রিষ্টের জন্মের ৩৫০০ বছর থেকে ৫০০ বছর আগ পর্যন্ত মেসোপটেমিয়ায় তিনি পূজিত হতেন। তিনি ছিলেন ভালোবাসা আর প্রজননের দেবী। পরবর্তী সময়ে সুমেরীয়রা তাকে যুদ্ধের দেবী হিসেবে গ্রহণ করে। তাদের দেখে এসেরীয়, আক্কেদীয় ও ব্যাবিলনিয়রাও তাঁর উপাসনা শুরু করে। ধারণা করা হয়, সুমেরীয়রা পরে ভারতে আসে। ইনান্না হয়ে যান দুর্গা। অবশ্য বিপরীত মতও আছে।
সিন্ধু সভ্যতা দেবীপূজার আবির্ভাব কীভাবে ঘটল, সে সম্পর্কে ড. অতুল সুর তাঁর ‘সিন্ধু সভ্যতার স্বরূপ ও সমস্যা’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা প্রভৃতি নগরে দেবীপূজার যে ব্যাপক প্রচলন ছিল, তা মৃন্ময়ী মাতৃকাদেবীর মূর্তিসমূহ তা প্রকাশ পায়। পুরুষ দেবগণ কর্তৃক অধিকৃত ঋগ্বেদের দেবতামণ্ডলীতে, মাতৃদেবীর কোনো স্থান ছিল না। পরবর্তীকালে যখন সাংস্কৃতিক সমন্বয় ঘটেছিল, তখনই প্রাগার্য দেবীসমূহের হিন্দুধর্মে অনুপ্রবেশ ঘটে। যেমন, প্রাগার্য যুগের অন্তিমে আমরা কালী, করালী প্রভৃতি দেবীর নাম পাই’।
ড. অতুল এই গ্রন্থে সুমেরীয় দেবী ইনান্না বা এনান্নার সঙ্গে অন্নপূর্ণার অদ্ভুত সাদৃশ্য নিয়ে লিখেছেন, ‘সুমেরের প্রধান দেবতা এনান্না নামের সঙ্গে অন্নপূর্ণা নামের সাদৃশ্যও তাই সূচিত করে। বস্তুত সুমের এবং ভারতের মাতৃদেবীর মধ্যে কতকগুলো মূলগত সাদৃশ্য দেখে কোনো সন্দেহই থাকে না, যে এই উভয় দেশের মাতৃপূজা একই সাধারণ উৎস থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। এই সাদৃশ্যগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
(ক) উভয় দেশেই মাতৃদেবী কুমারী হিসাবে কল্পিত হয়েছিলেন, অথচ তাদের ভর্তা ছিল;
(খ) উভয় দেশেই মাতৃদেবীর বাহন সিংহ ও তাঁর ভর্তার বাহন বলীর্বদ;
(গ) উভয় দেশেই মাতৃদেবীর নারীসুলভ গুণ থাকা সত্ত্বেও তিনি পুরুষোচিত কর্ম, যেমন যুদ্ধ, করতে পারতেন;
(ঘ) সুমেরের লিপিসমূহে তাঁকে বারম্বার ‘সৈন্যবাহিনীর নেত্রী’ বলা হয়েছে; মার্কণ্ডেয় পুরাণের ‘দেবীমাহাত্ম্য’ বিভাগেও বলা হয়েছে যে দেবতারা যখন, অসুরগণ কর্তৃক পরাহত হয়েছিলেন, তখন তারা মহিষাসুরকে বধ করবার জন্য দুর্গার শরণাপন্ন হয়েছিলেন;
(ঙ) সুমেরের মাতৃদেবী পর্বতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট, সে জন্য তাকে ‘পর্বতের দেবী’ বলা হতো; ভারতের মাতৃদেবীর পার্বতী, হৈমবতী, বিন্ধ্যবাসিনি প্রভৃতি নাম তাই সূচিত করে;
(চ) সুমেরে দেবীর নাম ছিল ‘নানা’; সে নাম হিংলাজে নানাদেবীর নামে এখনো বর্তমান;
(ছ) যারা বলেন যে সুমেরীয়দের পরিধেয় বসন ‘কৌনক’ তালপাতা দিয়ে তৈরি করা হতো, তাঁরা প্রাচীন ভারতে দেশজ লোকদের পাতা ও বল্কল পরিধান ও পর্ণশবরীর কথা স্মরণ করবেন;
সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে সুমেরীয় সভ্যতার যোগসূত্র আরও পাওয়া যায় রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়ের ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ গ্রন্থে, ‘বাবিরুষে এবং টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদদ্বয়ের মধ্যবর্তী ভূভাগে প্রাচীন আৰ্যাধিকার চারিশত বর্ষের কিঞ্চিৎ অধিককাল স্থায়ী হইয়াছিল। মিসরের অষ্টাদশ সংখ্যক রাজবংশের তৃতীয় পুতমসি (Thutmosis III) এসিয়াখণ্ডে যুদ্ধযাত্রাকালে মিতান্নিরাজকে পরাজিত করিয়াছিলেন। মিসরে কর্ণাকের প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষে আবিষ্কৃত তৃতীয় থুতমসিসের প্রশস্তিতে এই ঘটনার উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়।
‘দশরত্ত বা দশরথের সময় হইতে মিতান্নিরাজ্যের অবনতি আরম্ভ হয় এবং তাঁহার পুত্র মত্তিউয়জ ১৩৬৯ খৃষ্টপূর্বাব্দে খাতি (Khati বা Hittite) রাজ সুব্বিলুলিউম কর্তৃক পিতৃরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিলেন। এই ঘটনার অল্পদিন পরে মিতান্নিরাজ্য খাতিরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হইয়া গিয়াছিল। প্রাচীন বাবিরুষে, সেমিটিকজাতির সহিত সংমিশ্রণে, আৰ্য্যবংশসস্তৃত কাশ্মীররাজগণ ক্রমশঃ দুৰ্ব্বল হইয়া পড়িতেছিলেন। খৃষ্টপূৰ্ব্ব ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বাবিরুষের আর্যরাজগণের অধিকার লুপ্ত হয়, এবং আর্যজাতির শেষ রাজা কাষ্টিলিয়াসু, আসুররাজ তুকুতিনিনিব কর্তৃক সিংহাসনচ্যুত হন। এসিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমসীমান্তে, খৃষ্টপূৰ্ব দ্বাদশ শতাব্দীতে, আৰ্যাধিকার বিলুপ্ত হইলেও, প্রাচীন ঐরাণে (বর্তমান পারস্যদেশে), আৰ্যগণের উপনিবেশ স্থাপিত হইয়াছিল। ঐরাণবাসী পারসিক নামধারী আর্যগণই, পরবর্তীকালে, প্রাচীন প্রাচ্যজগতে আসুর সাম্রাজ্য ধ্বংস করিয়াছিলেন।
‘এই আর্যজাতির একশাখা ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের পর্বতশ্ৰেণী অতিক্রম করিয়া, পঞ্চনদ প্রদেশে উপনিবেশ স্থাপন করিয়াছিলেন। ইহার ক্রমশঃ পূৰ্ব্বদিকে স্বীয় অধিকার বিস্তার করিয়াছিলেন এবং দুই তিন শতাব্দীর মধ্যে উত্তরাপথের অধিকাংশ হস্তগত করিয়াছিলেন। কেহ কেহ অনুমান করেন যে, মগধের দক্ষিণ অংশের প্রাচীন নাম কীকট। ইহা যদি সত্য হয়, তাহা হইলে ঋগ্বেদের তৃতীয়াষ্টক রচনাকালে, পঞ্চনদ ও মধ্যদেশবাসী আৰ্যগণ, মগধদেশের অস্তিত্বের কথা অবগত ছিলেন। অথৰ্ব্ববেদসংহিতার ৫ম কাণ্ডে অঙ্গ ও মগধদেশের নাম আছে; সুতরাং ইহা স্থির যে এই সময়ে অঙ্গ ও মগধদেশ আৰ্যগণের নিকট পরিচিত হইয়াছিল। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে ও মানবধৰ্ম্মশাস্ত্রে পুণ্ড জাতির উল্লেখ আছে’।
তবে দুর্গার ধারণা সুমেরীয় অঞ্চল থেকে এসেছে এ মতবাদ নিয়ে অনেকেই দ্বিমত করেন। অনেকের ধারণা প্রাচীন বিশ্বে অনেক অঞ্চলে একই চিন্তার বিকাশ ঘটেছিল। তাই এই পূজার রীতি এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গিয়েছে, এমনটা ভাবা ঠিক না। আবার অনেকেই যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে চান, ভারত থেকেই সুমেরীয়রা এই দেবী বন্দনার ধারণা পেয়েছিল।
এই সুমেরীয় অঞ্চল থেকে পরবর্তী সময়ে ইহুদি খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের বিকাশ হয়েছিল। তাই এদের সেমেটিক ধর্ম বলা হয়।
মহিষাসুরবধের কাহিনি অনুসারে প্রতি চৈত্র মাসে দুর্গাপূজার আয়োজন হতো। এখনো এটি বাসন্তীপূজা নামে পরিচিত। আষাঢ় থেকে কার্তিক মাস নাকি দেবতাদের নিদ্রাকাল। এ সময় দেবতাদের ঘুম ভাঙাতে নেই। কিন্তু রাম-রাবণের যুদ্ধে শ্রীরামচন্দ্র পড়েছিলেন মহাসংকটে। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে লঙ্কায় গিয়ে সীতাকে উদ্ধার করতে শ্রীরামচন্দ্রের প্রয়োজন হলো দেবী দুর্গার সহযোগিতা। তিনি আশ্বিন মাসে ঘুম ভাঙালেন দেবীর। তাই বলা হয় অকালবোধন। এই অকালবোধন ছাপিয়ে গেল আসল দুর্গাপূজাকে। হয়ে গেল বাঙালির মহোৎসব।
তবে এ শুধু যে রামচন্দ্রের অবদান, আমার মনে হয় না। হয়তো ঋতু পরিবর্তনও একটা কারণ। বর্ষার শেষে শরৎ আসে এই আশ্বিন মাসে। সব দিক বিবেচনায় এ সময় পূজা-পার্বণের উত্তম সময়।
রাজ্যহারা রাজা সুরথই বাংলায় প্রথম দুর্গাপূজা শুরু করেন রাজ্য ফিরে পাওয়ার আশায়। এমনই কিংবদন্তি আছে। তবে অন্য মতও আছে। সে মতে তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণই প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। পরবর্তী সময়ে নদীয়ার রাজ কৃষ্ণচন্দ্র সাড়ম্বরে দুর্গাৎসবের আয়োজন করেন। কলকাতায় প্রথম ধুমধামের সঙ্গে দুর্গাপূজার আয়োজন করে এ পূজাকে সবার কাছে জনপ্রিয় করে তোলেন রাজা নবকৃষ্ণদেব। তবে পূজার আড়ালে তার আসল লক্ষ্য ছিল সাহেব-সুবাদের জন্য আমোদ-ফুর্তির আয়োজন করা। সেটা বুঝতে পেরে ১৮৪০ সাল থেকে ইংরেজ সাহেবদের পুজোয় যাওয়া বন্ধ করে দেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।
তবে আজ চার সন্তান নিয়ে দশভুজা দেবীর যে প্রতিমা আমরা দেখি, তা কিন্তু খুব একটা প্রাচীন নয়। এ রূপ একান্ত বাঙালির মাতৃভক্তিজাত। বসন্তে যে দেবীর যুদ্ধযাত্রার পুজো করা হতো, শরতে তাই কুলবধূর পিতৃগৃহে নইওর যাওয়ায় রূপান্তর করেছে বাঙালি। যুদ্ধংদেহী দেবীকে মাতৃময়ী রূপ দিয়েছে তারা।
এলাহাবাদের বিহিটা গ্রামে দ্বিভুজা দুর্গা মূর্তি পাওয়া গেছে। মথুরাতেও অনুরূপ মূর্তি পাওয়া গেছে। সেখানে অবশ্য দেখা যায় দেবী নিরস্ত্র। এক হাতে তিনি মহিষের পিঠ খামচে ধরেছেন আরেক হাতে তার জিহ্বা টেনে নিয়ে আসছেন। গুপ্তযুগে পাওয়া দুর্গা মূর্তিও অনেকটা সে রকম। একহাতে গলা চেপে ধরেছেন, অন্য হাতে উদ্যত অস্ত্র। প্রত্নতাত্ত্বিক ফোগেল চম্বায় মহষমর্দিনীর একটি সুন্দর চতুভুজা মূর্তি আবিষ্কার করেন। এর গায়ের লিপি থেকে জানা যায় এটি আনুমানিক ৭০০ খ্রিষ্টাব্দে তৈরি। মধ্যযুগের এক চতুর্ভুজা দুর্গামূর্তির সন্ধান মেলে ভুবনেশ্বরের বৈতাল দেউলের কুলুঙ্গির মধ্যে। দেবীর আট হাতে রয়েছে তরবারি, ঢাল, ত্রিশূল, সর্প, বর্শা, তীর, ধনু ও খঙ্গ। ওড়িশার খিচিং থেকেও কিছু সুন্দর মহিষমর্দিনী মূর্তি পাওয়া গেছে। উত্তর প্রদেশের কুলু উপত্যকায় বাজায়ুরের শিবমন্দিরে এক অসুরমর্দিনী দুর্গা মূর্তি পাওয়া গেছে। এঁর একপাশে ঢাল-হাতে দাঁড়ানো এক অসুর, অন্যজন তরবারি হাতে দেবীকে আঘাতে উদ্যত। দেবীর পায়ের তলায় মহিষ, যার মুণ্ডুবিহীন দেহ থেকে তৃতীয় অসুর বের হচ্ছে। ফোগেলের মতে, প্রথম দুজন শুম্ভ ও নিশুম্ভ এবং তৃতীয়জন মহিষাসুর।
উপরের বর্ণনার কোথাও কিন্তু দশভুজা দুর্গার দেখা নেই। এখন যে-প্রতিমা-পুজো করা হয়, তাতে দেবীর সঙ্গে লক্ষ্মী-সরস্বতী এবং কার্তিক-গণেশও উপস্থিত। অথচ প্রাচীন কোন দুর্গা মূর্তির সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যদের দেখা যায় না। এমনকি রঘুনন্দন, গোবিন্দা নন্দ, বেণীনাথ প্রমুখ মণীষীরা দুর্গার রূপকল্প, তাতে লক্ষ্মী-সরস্বতী কার্তিক-গণেশের উল্লেখ ছিল না। অষ্টদশ শতকের নাগাদ বাঙালির কল্পনায় পুত্র-কন্যাসহ আটপৌরে বাঙালি নারীর রূপে আবির্ভূত হন মহিষাসুরমর্দিনী মা। তাই আজ যে দুর্গা প্রতিমার পুজা আমরা করি, তা একান্তই বাঙালির নিজস্ব সৃষ্টি। নিজস্ব ঘরানা। ইতিহাস-আখ্যান-কিংবদন্তি টপকে বাঙালি দেবীর মাতৃরূপকে আপন করে নিয়েছে।








































