ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬-এ মরক্কো জাতীয় ফুটবল দলের প্রতিটি জয় যেন ফুটবল মাঠের সীমানা পেরিয়ে একেকটি রূপকথায় পরিণত হচ্ছে। বিশ্বমঞ্চে পরাশক্তিদের হারানোর পর মরক্কোর খেলোয়াড়দের গ্যালারিতে ছুটে যাওয়া এবং মায়েদের জড়িয়ে ধরে অশ্রুসিক্ত উদ্যাপনের দৃশ্যগুলো আজ পুরো ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ও আলোচিত গল্প। এই গভীর মাতৃভক্তি কোনো কাকতালীয় ঘটনা বা সাময়িক আবেগ নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর ধর্মীয় মূল্যবোধ, অভিবাসী জীবনের চরম সংগ্রাম ও মরোক্কান সংস্কৃতির এক অনন্য ঐতিহ্য।
কঠিন সংগ্রাম ও মায়েদের অবদান
চলমান বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর নকআউট ম্যাচে আজ মঙ্গলবার সকালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে মরক্কোর জয়টি ছিল তেমনই এক আবেগঘন মুহূর্ত। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে।
ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে ডাচ ডিফেন্ডার জান পল ফন হেকের সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষে মরক্কোর তরুণ স্ট্রাইকার ইসমাইল সাইবারির গাল কেটে রক্তারক্তি হয়ে যায়। এই রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত অবস্থাতেই দেশের জন্য পঞ্চম ও চূড়ান্ত পেনাল্টি শটটি নিতে আসেন তিনি। তীব্র মানসিক চাপের মুখে ঠান্ডা মাথায় গোল করে ৩-২ ব্যবধানে মরক্কোকে রাউন্ড অব ১৬-তে নিয়ে যান সাইবারি।
কিন্তু গোল করার পরপরই মাঠের সব উল্লাস পেছনে ফেলে সাইবারি সরাসরি গ্যালারিতে তাঁর মায়ের কাছে ছুটে যান। মাকে জড়িয়ে ধরে এই তারকা ফুটবলার যেভাবে অঝোরে কাঁদলেন, তা ফুটবল ভক্তদের চোখ ভিজিয়ে দিয়েছে।
এই কান্নার পেছনে আছে সাইবারির শৈশবের এক অলৌকিক সংগ্রামের ইতিহাস। মাত্র দুই বছর বয়সে চিকিৎসকেরা সাইবারির পায়ের পাতার বিকৃতির কারণে জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই ছেলে হয়তো স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেও পারবে না, কিন্তু তাঁর মা চিকিৎসকদের সেই রায় মেনে নেননি। আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস রেখে তিনি দিনরাত কেবল ছেলের সুস্থতার জন্য প্রার্থনা ও সেবা করেছিলেন।
মায়ের নিরলস সেবা, চিকিৎসা ও অদম্য বিশ্বাসের মধ্য দিয়েই সাইবারি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
কঠিন সংগ্রাম ও মায়েদের অবদান
সাইবারির মতো মরক্কো দলের আশরাফ হাকিমি বা সোফিয়ান বুফালের মতো অনেক তারকা খেলোয়াড়ের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। ইউরোপে অভিবাসী হিসেবে তাঁদের পরিবারকে প্রচণ্ড বর্ণবাদ ও চরম দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
আশরাফ হাকিমির মা স্পেনে অন্যের ঘর পরিষ্কারের কাজ করতেন এবং বাবা রাস্তাঘাটে হকারি করতেন। হাকিমি বহু সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমার মা নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে আমাকে ফুটবলার বানিয়েছেন। আজ আমি যা কিছু, তা আমার মায়ের কারণে।’
অন্যদিকে সোফিয়ান বুফালের মা ভোরে ফ্রান্সে ক্লিনিংয়ের কাজে যেতেন, যেন ছেলের ফুটবলের বুট কেনার টাকা জোগাড় হয়। ফুটবলার হওয়ার পর বুফাল প্রথম যে কাজটি করেছিলেন, তা হলো তাঁর মাকে চাকরি থেকে চিরতরে অবসর দেওয়া।
স্বাভাবিকভাবেই এই খেলোয়াড়েরা যখন সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছান, তখন তাঁরা সব অর্জন উৎসর্গ করেন সেই মায়েদের, যাঁরা তাঁদের এই অবস্থানে আনার জন্য সর্বোচ্চটাই করেছেন।
ধর্মীয় ও পারিবারিক মূল্যবোধ
মরক্কো মুসলিমপ্রধান দেশ, যেখানে পারিবারিক ও সামাজিক সংস্কৃতিতে মা-বাবাকে শ্রদ্ধা করাকে জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ও পুণ্য মনে করা হয়। এই মনস্তাত্ত্বিক শক্তিকে কাজে লাগাতে মরক্কো ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ফাউজি লেকজা এবং ২০২২ বিশ্বকাপে দলকে নেতৃত্ব দেওয়া কোচ ওয়ালিদ রেগ্রাগুই এক অভূতপূর্ব নীতি বেছে নেন। তাঁরা দলের খেলোয়াড়দের মানসিক শক্তি ও স্বস্তি বাড়াতে তাঁদের মায়েদের সব খরচ বহন করে হোটেলের একই ছাদের নিচে রাখার ব্যবস্থা করেন।
২০২২ বিশ্বকাপে ঐতিহাসিক সাফল্যের পথে মরক্কোর তৎকালীন কোচ ওয়ালিদ রেগ্রাগুইকেও ম্যাচ শেষে মাঠে নেমে তাঁর মায়ের সঙ্গে উদ্যাপন করতে দেখা গিয়েছিল। খেলোয়াড়দের মতো তিনিও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, তাঁর জীবনের সাফল্যের পেছনে মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি।
ফলে মরক্কো দলের এই মাতৃভক্তি কেবল কয়েকজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত আবেগ নয়, এটি দলটির সামগ্রিক সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অংশ। মরক্কো দল মনে করে, মাঠের তীব্র চাপের মুহূর্তে মায়েদের উপস্থিতি ও তাঁদের দোয়াই আসল শক্তি।
ট্যাকটিকসের আধুনিক ফুটবলে যখন সবাই রোবটের মতো লড়ে যাচ্ছেন, সেখানে মরক্কোর ফুটবলাররা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, দিনশেষে ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো শক্তি পৃথিবীতে নেই। মাঠের রক্ত মুছে মায়ের বুকে মাথা রাখার এই দৃশ্যগুলোই ফুটবলকে শুধু একটি খেলার চেয়েও অনেক বেশি কিছু করে তুলেছে।







































