সম্প্রীতির বাংলাদেশ প্রত্যাশা করি: নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু


রেজওয়ান সিদ্দিকী অর্ণ
প্রকাশিত: অক্টোবর ১৯, ২০২১, ০৮:৫২ পিএম
সম্প্রীতির বাংলাদেশ প্রত্যাশা করি: নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু

সাম্প্রদায়িক হিংসার আগুনে জ্বলছে দেশ। ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দুর্গোৎসবে ভাঙা হলো মন্দির। রংপুরের পীরগঞ্জে পোড়ানো হলো হিন্দু পল্লী। মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা এই সাম্প্রদায়িকতায় আতঙ্কিত সনাতন ধর্মের মানুষ, ছাড়তে চান দেশ। তবে তাদের আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা ও চলচ্চিত্র পরিচালক নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু। জানালেন, মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হবে নিজ জন্মভূমিতে। একদিন জয় আসবেই।


সংবাদ প্রকাশ: দুর্গোৎসবে মন্দিরগুলোতে ভাঙচুর। রংপুরের পীরগঞ্জে হিন্দু পল্লীতে আগুন। এসব কি জাতিবিদ্বেষ থেকে হচ্ছে নাকি এর পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে—কী মনে করছেন আপনি?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু: জাতিবিদ্বেষ জড়িয়ে আছে। এর পেছনে রাজনৈতিক ব্যর্থতা আছে। সমাজ এখন আর আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। এখানে ধর্মান্ধতার শেকড় গেড়ে বসেছে মাদ্রাসা ও অন্যান্য শিক্ষার মধ্য দিয়ে। রাজনীতি সমাজ থেকে অনুপস্থিত। সেকারণে সমাজে নানা ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থার জন্য অবশ্যই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের উপস্থিতি থাকতে হয়। এখন রাজনৈতিক সমাবেশ বন্ধ, সাংস্কৃতিক চর্চা হচ্ছে না। একমাত্র মৌলবাদীদের মাহফিলগুলো চলছে। তাদের বয়ান থেকে মানুষ ভুল শিক্ষা গ্রহণ করে মনের অগোচারে এ রকম অন্যায় কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এখানে রাজনীতির অভিলাষ থাকতে পারে। দেশে যদি হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমে যায় তাহলে রাজনীতির খেলা পাল্টে যাবে। 

 

সংবাদ প্রকাশ: আওয়ামী লীগ সরকার বারবার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার কথা বলে আসছে। কিন্তু তারপরও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হচ্ছে। এটাকে সরকারের ব্যর্থতা বলবেন?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু: সরকারকে আংশিক ব্যর্থতা স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু এ ধরনের গর্হিত কাজ সরকার করাচ্ছে না সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। সরকারের ব্যর্থতা হলো, তারা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা দিতে পারছে না। পরপর এত জায়গায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটল। প্রতিটি হামলার শিকার হিন্দু সম্প্রদায়। এ থেকে বুঝতে হবে, হিন্দু ধর্মের মানুষ যে রকম নিরাপত্তা প্রত্যাশা করে সরকারের কাছ থেকে সে রকম নিরাপত্তা পায়নি। পেলে তারা একের পর এক হামলার মুখে পড়ত না।

সংবাদ প্রকাশ: কী ধরনের নিরাপত্তার কথা বলছেন আপনি?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু: প্রথমত, পুলিশের উপস্থিতি থাকা দরকার ছিল। দ্বিতীয়ত, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারত। কিন্তু তারা সেটা করেনি। করোনা মোকাবিলায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ব্যাপারে সরকার তো সফল হয়েছে। সব মানুষ সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। সংগঠনগুলো সরকারকে সাহায্য করেছে। আমরা সংস্কৃতিকর্মীরা হাতে হাত রেখে কাজ করেছি। আমাদের যে মূল সাংস্কৃতিক ধারা, সেটা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। এর বড় কারণ, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। সমাজে দুটি অংশ থাকে—ধনী অংশ ও গরিব অংশ। ধনী অংশ তো সাংস্কৃতি কর্মকাণ্ডের পৃষ্ঠপোষকতা করতে চায় না। তারা মাদ্রাসা করতে আগ্রহী। এমন চলতে থাকলে, এই ঘটনাগুলো থামবে না। সামনে আরও ঘটবে।

সংবাদ প্রকাশ: এ ধরনের সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটলেই রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের ওপর দোষ চাপায়। এটা কি সমাধানের কোনো রাস্তা?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু: রাজনৈতিক দলগুলো যে, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার দায় একে অপরের ওপর চাপাচ্ছে, এটা সম্পূর্ণ হাস্যকর। এর মাধ্যমে একধরনের বালখিল্যতা প্রকাশ পায়। এটাকে নিয়ে রাজনীতি করার কোনো প্রশ্ন আসে না। এসব সহিংসতা মানবিক বিপর্যয়।

 

সংবাদ প্রকাশ: এর আগেও একাধিকবার সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু দোষীরা গ্রেপ্তার হলেও শাস্তি দিতে পারেনি সরকার। এর পেছনে কারণ কী হতে পারে বলে মনে করেন?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু: ২০০১ সালের নির্বাচনের পর যে দাঙ্গা হলো তাতে অনেক হিন্দু দেশত্যাগ করেছে। ধরেই নিচ্ছি, তখন যে সরকার ছিল তারা একটি নির্দিষ্ট ধর্মের কথা বলে, তাই অপরাধীরা শাস্তি পায়নি। কিন্তু এখন তো আমাদের সরকার ক্ষমতায়। এই ১২-১৩ বছরে নাসিরনগর, অভয়নগর, শাল্লা, রামু, কুমিল্লা সবশেষ রংপুরে ক্রমাগত হিন্দুরা হামলার শিকার হয়েছেন। কেনো ঘটবে এসব ঘটনা? মানলাম, এটা বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের ষড়যন্ত্র। ওরা যদি ষড়যন্ত্র করে, তাহলে আমরা সেটা প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখি না? সুতরাং যে ঘটনাগুলো ঘটেছে সেগুলোর তদন্ত শেষ করে শাস্তির আওতায় আনা যেত, তাহলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটত না। সেই সঙ্গে আমি মনে করি, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন আনা উচিত। এর কোনো বিকল্প নেই।

 

সংবাদ প্রকাশ: সেই পরিবর্তন কেমন হওয়া উচিত?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু: একই পরিবারের তিনটি বাচ্চাকে যদি বাংলা, ইংরেজি ও আরবি শিক্ষা দেওয়া হয় তাহলে ২০ বছর পর তিনজন কী হিসেবে বের হবে? তিনটা ভিন্ন মানুষ হিসেবে বের হবে। বাঙালি হিসেবে বের হবে না। তাদের একজন ইউরোপ, একজন সৌদি আরব আর অন্যজন নামে বাঙালি হিসেবে বের হবে। ধর্মকে বাদ দিয়ে তো শিক্ষা হবে না। যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকু ধর্ম থাকবে। ধর্মের যে ভালো কথাগুলো আছে সেগুলো পাঠ্যবইয়ে থাকবে। কিন্তু কওমি মাদ্রাসাগুলো ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। তারা হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও আল্লাহর কথা বলে হিংসাত্মক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। যার প্রভাব আজ হয় তো পড়ছে না, কিন্তু এক মাস বা এক বছর পর পড়ছে।

 

সংবাদ প্রকাশ: দেশে যে হারে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে চলেছে, তার লাগাম টানতে হলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করা উচিত বলে মনে করেন?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু: এটা ভেবে দেখিনি। তবে আমি দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা চাই। যারা সংখ্যালঘু আছে তাদের নিরাপত্তা চাই, সেটা যেভাবেই হোক না কেন! একটা ধর্মীয় সম্প্রীতির বাংলাদেশ প্রত্যাশা করি সবসময়।

 

সংবাদ প্রকাশ: কুমিল্লা, রংপুরসহ সারা দেশের সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনার পর হিন্দুরা দেশ ছাড়তে চাইছেন বলে শোনা যাচ্ছে। এই দেশত্যাগ বহুদিন ধরেই চলছে, এখন আরও বাড়তে পারে। আপনার কী মত?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু: আমাকে অনেকে এমন কথা জানিয়েছে। আসলে আমার কিছু বলার নেই ক্ষমা চাওয়া ছাড়া। কোন মুখে তাদের থাকতে বলব? আমরা তো তাদের নিরাপত্তা দিতে পারছি না। এসব আমার অভিমানের কথা। বাধ্য হয়ে বললাম। এই দেশটা যেমন আমাদের, তেমনি হিন্দুদের। তাদের ভয় পেলে চলবে না। মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হবে।

Link copied!