• ঢাকা
  • রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০২২, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

জেমস ওয়েবের ছবিটি যুগান্তকারী : দীপেন ভট্টাচার্য


অঞ্জন আচার্য
প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২২, ০৯:৩০ পিএম
জেমস ওয়েবের ছবিটি যুগান্তকারী : দীপেন ভট্টাচার্য

ড. দীপেন ভট্টাচার্য, জ্যোতির্বিদ, অধ্যাপক ও লেখক। মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ম্যারিল্যান্ড-এ নাসার (NASA) গডার্ড স্পেস ফ্লাইট ইনস্টিটিউটের গবেষক ছিলেন। পরে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড ক্যাম্পাসে (ইউসিআর) গামা রশ্মি জ্যোতি জ্যোতিঃপদার্থবিদ হিসেবে যোগ দেন। মহাশূন্য থেকে আসা গামা-রশ্মি পর্যবেক্ষণের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে বায়ুমণ্ডলের ওপরে বেলুনবাহিত দুরবিন ওঠানোর অভিযানসমূহে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করছেন ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড কমিউনিটি কলেজে। এছাড়া পদার্থবিদ্যা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানে অধ্যাপনা করছেন ক্যালিফোর্নিয়ার মোরেনো ভ্যালি কলেজে। অতি সম্প্রতি জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে তোলা মহাশূন্যের ১৩৫০ কোটি বছর আগের বিরল ছবি প্রকাশ করে নাসা। বিষয়টি পুরো বিশ্বে তোলপাড় তোলে। বাংলাদেশেও সেই ঢেউ এসে পড়েছে। গণমাধ্যম থেকে গণমানুষের মুখে মুখে ফিরছে সেই ছবি নিয়ে নানা কথা। প্রকাশিত ছবিটি নিয়ে সংবাদ প্রকাশকে একান্ত সাক্ষাৎকার দেন বিশিষ্ট এই জ্যোতির্বিজ্ঞানী। কথা বলেন সংবাদ প্রকাশ-এর যুগ্ম বার্তা সম্পাদক অঞ্জন আচার্য।

 

সংবাদ প্রকাশ : মহাবিশ্বের এক রঙিন ছবি দিয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপ জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের তোলা গ্যালাক্সিগুলোর এমন ছবি এই প্রথম প্রকাশ করা হলো বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। এই প্রজেক্টটি সম্পর্কে আপনার কাছে সংক্ষেপে জানতে চাই।
দীপেন ভট্টাচার্য : জেমস ওয়েব হচ্ছে হাবল দুরবিনের উত্তরসূরি। অর্থাৎ হাবল যখন কক্ষপথে পাঠানো হয়েছিল, তখনই জেমস ওয়েবের ডিজাইন শুরু হয়। মোটামুটিভাবে বলতে গেলে প্রায় ৩০ বছর লেগেছে এটাকে বাস্তবায়িত করতে। এটাকে গত বছর ক্রিসমাসের দিনে উৎক্ষেপণ করা হয়। এটা পৃথিবী থেকে প্রায় দেড় মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে লাগ্রাঞ্জ পয়েন্টে স্থাপন করা হয়, যেখানে সূর্যের ও পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এমনভাবে কাজ করে যে, কোনো মহাকাশযান সেখানে স্থাপন করলে তা মোটামুটি এক জায়গায় থাকে। পৃথিবী থেকে দূরে রাখার কারণ হলো, এটা অবলোহিত (ইনফ্রারেড) তরঙ্গে কাজ করে, এবং এই তরঙ্গের ডিটেকটরদের ঠাণ্ডা রাখা প্রয়োজন। তাই এটার একটা বিশেষ ছাতা আছে, যেটা সূর্যের আলো থেকে নিজেকে রক্ষা করে। সূর্য ও আকাশ একই দিকে থাকায় এটা আকাশের একটা অংশকে নিরবচ্ছিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

অবলোহিত তরঙ্গে কাজ করার কারণ হচ্ছে খুব দূরের যে গ্যালাক্সি আছে, সেখান থেকে যে আলো এসে আমাদের কাছে পৌঁছায়, তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে ইনফ্রারেড তরঙ্গ হয়ে যায়। মানে তারা দৃশ্যমান তরঙ্গে বিচরণ করলেও আমাদের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেই তরঙ্গের দৈর্ঘ্যটা বড় হতে হতে ইনফ্রারেড হয়ে যায়। এ জন্য সবচেয়ে দূরবর্তী গ্যালাক্সি দেখার জন্য এই তরঙ্গ ব্যবহার করতে হয়। জেমস ওয়েবের মূল আয়নার ব্যাস হাবল থেকে প্রায় তিনগুণ বড়। এর আয়নাগুলি বেরিলিয়াম দিয়ে তৈরি, তার ওপরে একটা সূক্ষ্ম সোনার প্রলেপ দেওয়া আছে, সেটার ওপরে আলো প্রতিফলিত হয়ে একটা বিন্দুতে ফোকাস হয়ে যায় এবং সেখানে যন্ত্রপাতি আছে, সে যন্ত্রপাতি দিয়ে ছবি তোলা হয়, বর্ণালী বিশ্লেষণ হয়।

সংবাদ প্রকাশ : এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য কী?
দীপেন ভট্টাচার্য : একটা বড় উদ্দেশ্য হচ্ছে, সবচেয়ে দূরবর্তী যে গ্যালাক্সি অর্থাৎ যা কিনা বিগ ব্যাংয়ের কিছুদিন পরেই সৃষ্টি হয়েছিল, সেই প্রথম গ্যালাক্সিগুলোকে দেখা। হাবল ইতিমধ্যে অনেকখানি এগিয়েছে। বিগ ব্যাং হওয়ার ৭০০ মিলিয়ন বছরের মধ্যে যেসব গ্যালাক্সি সৃষ্টি হয়েছে, এর কিছু হাবল দেখেছে। কিন্তু এটা আমাদের আরও দূরে নিয়ে যাবে অর্থাৎ বিগ ব্যাং হওয়ার ৩০০-৪০০ মিলিয়ন বছরের মধ্যে যদি কোনো গ্যালাক্সি সৃষ্টি হয়, সেটা হয়তো আমরা এই দুরবিন দিয়ে দেখতে পাব। এছাড়া কী করে নতুন তারারা সৃষ্টি হয়, সেটা আমরা আরও ভালোভাবে জানতে পারব। দূরবর্তী তারাদের চারদিকে আরও অন্য গ্রহ আছে কি না, সেগুলো আবিষ্কারও এই দুরবিনের উদ্দেশ্য। কাজেই এটার আরও অনেক প্রয়োগ আছে।

সংবাদ প্রকাশ : জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় এটা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ?
দীপেন ভট্টাচার্য : গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই, কারণ বিগ ব্যাং হওয়ার পর পরেই প্রথম তারারা কীভাবে গঠিত হয়েছিল, প্রথম গ্যালাক্সি কীভাবে গঠিত হয়েছিল, সেটা এখনো আমরা ভালভাবে জানি না। কাজে এটা নিঃসন্দেহে একটা বিশাল পদক্ষেপ হবে, যদি প্রথম তারা বা প্রথম গ্যালাক্সি জেমস ওয়েব আবিষ্কার করতে পারে। এছাড়া আমরা সৌরজগতের বাইরের গ্রহের বায়ুমণ্ডল আছে কিনা এবং থাকলে তাতে প্রাণ যে সমস্ত গ্যাস সৃষ্টি করে সেটাও আবিষ্কার করতে পারে।

সংবাদ প্রকাশ : শুরুতে ছবিটি নিয়ে বিভ্রম দেখা দেয়, কেন?

দীপেন ভট্টাচার্য : এই ছবি তোলা হয়েছে সাড়ে বারো ঘণ্টা ধরে, যেটা আসলে খুবই কম সময়। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কী দেখছি এই ছবিটার মধ্যে? কোনো বিশ্লেষণ না করে আমাকে যদি একটা সুন্দর ছবি দেখানো হয়, তবে সেটার কোনো মূল্য নেই আমার কাছে। নাসা যখন প্রথম ছবিটা প্রকাশ করে, তারা এটার বিশেষ কোনো বর্ণনা দেয়নি, যে আসলে আমরা কী দেখছি? এখন অবশ্য সেই অবস্থাটা বদলেছে।

সংবাদ প্রকাশ : ছবিটিকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করছেন?

দীপেন ভট্টাচার্য :  ছবিতে কয়েক জায়গায় খুবই উজ্জ্বল ছটা বের হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে আমাদের গ্যালাক্সির তারা, এরা খুব দূরে নয়, গুরুত্বপূর্ণও নয়। এই ছবির মধ্যে আমরা একটা গ্যালাক্সি ক্লাস্টার বা গ্যালাক্সি দল দেখছি দেখছি, যার নাম এসএমএসিএস ০৭২৩। কয়েকটি গ্যালাক্সির সমষ্টিকে একটি ক্লাস্টার বলে। ছবির মাঝখানে কিছু গ্যালাক্সি আছে, সেগুলো ওই গ্যালাক্সি ক্লাস্টার। এই গ্যালাক্সিগুলো থেকে আমাদের কাছে আলো আসতে সময় লাগছে ৪৬০ কোটি বছর। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৪শ কোটি বছর। এই গ্যালাক্সিগুলো মহাবিশ্বের শেষ প্রান্তে না, এটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, ছবিটির মাঝখানকে কেন্দ্র করে কিছু গ্যালাক্সি বক্র হয়ে যেন একটি বৃত্তে ছড়িয়ে আছে।  একটা কম্পাস নিয়ে বৃত্ত আঁকলে সেই বৃত্তের ওপর পড়বে ওই গ্যালাক্সিগুলো। এটা কিন্তু একটাই গ্যালাক্সি, সেটা ক্লাস্টারের পেছনে আছে। এটাকে বলে গ্রাভিটেশন লেন্সিং। পেছনের ওই গ্যালাক্সিটা আমরা সরাসরি দেখছি না, বরং সামনের ক্লাস্টারের মাধ্যাকর্ষণের ফলে সেটি তার চারদিকে কয়েকটি জায়গায় বিম্বিত হয়েছে।

ছবির কোনায় কিছু লাল রঙের গ্যালাক্সি আছে ছোট ও অস্পষ্ট। এই গ্যালাক্সিগুলো হতে পারে একেবারে প্রথম দিকের গ্যালাক্সি। এগুলো থেকে আলো আসতে ১৩০০ কোটি বছর লাগছে। ওয়েব দুরবিনের নিরস্পেক ডিটেকটর একই সাথে কয়েকটি গ্যালাক্সির আলো বিশ্লেষণ করে ওই গ্যালাক্সিগুলো যে বহু দূরে অবস্থিত সেটা আবিষ্কার করেছে। এই ছবিটা যখন প্রথম দেখানো হল তখন আমাদের কাছে যথেষ্ট তথ্য ছিল না এই ছবিটার যথাযথ মূল্যায়ণের জন্য। তাই প্রথমে তৃপ্ত হতে পারিনি। কিন্তু পরে অনেক তথ্য আমাদের কাছে আসে। 

সংবাদ প্রকাশ : ছবিটির আয়তন নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

দীপেন ভট্টাচার্য : এই ছবিটি আকাশের কতটা অংশ জুড়ে আছে? নাসা বলছে, একটি বালুকণাকে এক হাত দূরত্বে রাখলে সেটি আমাদের চোখে যে আকার সৃষ্টি করবে আকাশে এই ছবিটির আকার ততটুকুই। এই উপমাটা আমার পছন্দ হয়নি। একটি বালুকণার আকার কতটুকু? সেটা 0.05 থেকে 2 মিলিমিটার হতে পারে। আর এক হাত দূরত্বটাই বা কত? তাও সঠিক কারো জানা নেই। আমি যদি এক হাত দূরত্ব 0.5 মিটার ধরি, তবে সেই বালুকণা আমার চোখে 0.005 থেকে 0.2 ডিগ্রি কোণ প্রক্ষেপণ করবে। পূর্ণ চাঁদ হলো 0.5 ডিগ্রি। নাসা কি বলতে পারতেন না, এই ছবিটি চাঁদের 0.2/0.5 = 40% অংশ বা 0.005/0.5 = 1%? 1% আর 40%-এর মধ্যে তো বিশাল পার্থক্য। প্রথমেই এই ছবিটি চাঁদের তুলনায় আকাশের কত অংশ জুড়ে আছে সেটা বলে দিলে হতো। তবে এ কথা বলতেই হয়, জেমস ওয়েবের ছবিটি যুগান্তকারী বটে।

Link copied!