জেন জি-র ভোটে বদলে যেতে পারে ভারতের রাজনীতির সমীকরণ


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: আগস্ট ৬, ২০২৬, ১১:১৮ পিএম
জেন জি-র ভোটে বদলে যেতে পারে ভারতের রাজনীতির সমীকরণ

ভারতের রাজনীতিতে নতুন এক পরিবর্তনের আভাস স্পষ্ট হচ্ছে। এটি শুধু নতুন প্রজন্মের ভোটার বৃদ্ধির বিষয় নয়; বদলে যাচ্ছে রাজনৈতিক প্রচার, জনমত গঠন এবং নির্বাচনী কৌশলের ধরনও। সম্প্রতি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনার মধ্যেই সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—জেন জি বা তরুণ ভোটাররাই কি আগামী দিনের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে উঠছেন?
বিশ্লেষকদের মতে, ককরোচ জনতা পার্টি আপাতত নিজেদের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিকারী একটি গোষ্ঠী হিসেবেই রাখতে চায়। তবে ভবিষ্যতেও তাদের আন্দোলন একইভাবে জনসমর্থন পাবে কি না, কিংবা একসময় তারা পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে পরিণত হবে কি না—তা নিয়েও আলোচনা চলছে। এমনকি দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ না করলেও ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং তার আগে বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে তাদের প্রভাব কতটা পড়বে, সেটিও এখন আলোচনার বিষয়।
দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনে তরুণদের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে।
নেপালে ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৪২ শতাংশের বেশি। সরকারবিরোধী তরুণদের আন্দোলনের মুখে সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়। পরে আকস্মিক নির্বাচনে যুব নেতৃত্বাধীন ‘ন্যাশনাল ইন্ডিপেনডেন্ট পার্টি’ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে।
বাংলাদেশেও ছাত্র আন্দোলনের জেরে শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে হয়। একইভাবে শ্রীলঙ্কার ‘আরাগালয়া’ আন্দোলন প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তিকে সরিয়ে দিয়ে অনুরা কুমার দিসানায়েকের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করে।
২০২৪ সালের ভোটার তালিকা অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা প্রায় ২১ কোটি, যা মোট ভোটারের প্রায় ২২ শতাংশ। আর ৪০ বছরের নিচের সব ভোটারকে ধরলে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে ৫ কোটি ৭৩ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪১ দশমিক ৫ শতাংশের বয়স ছিল ১৮ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। এই নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত মুখ ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী বিজয়।
‘অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া’র নির্বাচনী সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রথমবার ভোট দেওয়া নাগরিকদের ৬৮ শতাংশ বিজয়ের দল টিভিকে-কে সমর্থন করেছেন। ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এই সমর্থন ছিল ৫৯ শতাংশ এবং ৩০ থেকে ৩৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ। বিপরীতে, ৪০ বছরের বেশি বয়সী ভোটারদের মধ্যে টিভিকে-র জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
অনেকের ধারণা ছিল, কম শিক্ষিত বা শুধু চলচ্চিত্রপ্রেমী ভোটারদের সমর্থনেই বিজয়ের উত্থান হয়েছে। কিন্তু তথ্য বলছে, মাধ্যমিক উত্তীর্ণ, স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পেশাগত ডিগ্রিধারী ভোটারদের মধ্যেও টিভিকে এগিয়ে ছিল। শুধু নিরক্ষর এবং নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষিত ভোটারদের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী দ্রাবিড় দলগুলো এগিয়ে ছিল।
এই ফলাফলের পর তামিলনাড়ুর প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের প্রচার কৌশল বদলাতে শুরু করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি শাখাকে আরও সক্রিয় করা, সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও প্রকাশ বাড়ানো এবং তরুণদের জন্য আলাদা কর্মসূচি নেওয়ার মতো উদ্যোগ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও সম্প্রতি মন্ত্রীদের সামাজিক মাধ্যমে আরও সক্রিয় হওয়ার এবং আকর্ষণীয় ছোট ভিডিও প্রকাশের পরামর্শ দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি রাজনৈতিক প্রচারের পরিবর্তিত বাস্তবতারই প্রতিফলন।
তবে বিজেপির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জও দেখা দিচ্ছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে বিজেপির ভোটের হার প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে কংগ্রেসের সমর্থন প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে।
২০১৪ সালে যে তরুণদের বিপুল সমর্থন নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমতায় এনেছিল, এক দশক পর সেই প্রজন্মের রাজনৈতিক পছন্দে পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আন্তর্জাতিক বিভাগের আরো খবর

Link copied!