যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর এবার নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের নিয়ন্ত্রণও হারিয়েছে দলটি। এর মধ্য দিয়ে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির হাতে চলে যাচ্ছে। ফলে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শেষ দুই বছরে তাঁর প্রশাসনের ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা পাচ্ছে বিরোধী দল।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, ৪৩৫ আসনের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ২১৮টি আসন। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ২১৮টি আসনেই জয় লাভ করেছে এবং ৩৯টি আসনে এগিয়ে আছে। বিপরীতে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি জিতেছে ১২৬টি আসনে এবং ৪৬টি আসনে এগিয়ে আছে।
ট্রাম্পের ঐতিহাসিকভাবে কমে যাওয়া জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে বড় ধরনের জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এমনকি রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত একাধিক অঙ্গরাজ্যেও জয় পেয়েছে দলটি। এর মধ্যে রয়েছে সাউথ ক্যারোলিনা, নর্থ ক্যারোলিনা, টেক্সাস, ওহাইও ও কানসাসের সিনেট আসন। এসব অঙ্গরাজ্যের কয়েকটিতে কয়েক দশক ধরে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রাজ্যব্যাপী নির্বাচনে জয় পাননি।
এর আগে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাতে নির্বাচনী ফলাফলে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার নিশ্চিত হয় ডেমোক্র্যাটদের। রিপাবলিকানদের কাছ থেকে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রয়োজনীয় চারটি আসনই নিজেদের দখলে নিতে সক্ষম হয় দলটি।
সাউথ ক্যারোলিনায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও চিকিৎসক অ্যানি অ্যান্ড্রুজ রিপাবলিকান প্রার্থী ডারলেইন গ্রাহামকে পরাজিত করে সিনেটের আসনটি পুনরুদ্ধার করেছেন। ডারলেইন গ্রাহাম প্রয়াত দীর্ঘদিনের সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের বোন। অঙ্গরাজ্যটিতে সর্বশেষ ১৯৯৮ সালে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছিলেন।
নর্থ ক্যারোলিনায় সাবেক গভর্নর ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রয় কুপার তাঁর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইকেল হোয়াটলিকে পরাজিত করে আসনটি দখলে নেন। অন্যদিকে, রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাসে বড় জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো। ধর্মতত্ত্বের শিক্ষার্থী টালারিকো অঙ্গরাজ্যটির অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করেছেন। টেক্সাসে সর্বশেষ ১৯৯৪ সালে কোনো ডেমোক্র্যাট রাজ্যব্যাপী নির্বাচনে জয় পেয়েছিলেন।
ওহাইওতে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান সিনেটর জন হাস্টেডকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী শেরউড ব্রাউন। এর মধ্য দিয়ে আসনটি রিপাবলিকানদের হাতছাড়া হয়েছে। কানসাসে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও একটি মেগাচার্চের যাজক অ্যাডাম হ্যামিলটন।
বিদায়ী ১১৯ তম কংগ্রেসের ১০০ সদস্যের সিনেটে বর্তমানে রিপাবলিকানদের আসনসংখ্যা ছিল ৫৩। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটদের ছিল ৪৫টি আসন। এ ছাড়া দুজন স্বতন্ত্র সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে একই ককাসে ছিলেন। মঙ্গলবারের নির্বাচনী ফলাফলের পর সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাচ্ছে।
এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটনে রিপাবলিকানদের ‘ট্রাইফেক্টা’রও অবসান ঘটছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর দলটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র—সিনেট, প্রতিনিধি পরিষদ ও প্রেসিডেন্টের পদ—নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। কিন্তু এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মধ্য দিয়ে সেই একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের জয় অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। কারণ, সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য দলটির মাত্র তিনটি আসন বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল আসন হারায়।
তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ বদলানো তুলনামূলকভাবে কঠিন বলে ধারণা করা হয়েছিল। কারণ, প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর হলেও সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর। পাশাপাশি সিনেট নির্বাচন পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হয়। ফলে প্রতিবার নির্বাচনে সিনেটের মোট আসনের মাত্র এক-তৃতীয়াংশে ভোট অনুষ্ঠিত হয়।
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩টি নিয়মিত নির্বাচন এবং ওহাইও ও ফ্লোরিডায় দুটি বিশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৫ সালে ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসনে যোগ দেওয়ার পর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সিনেটের সদস্যপদ ছেড়ে দেন। তাঁদের ছেড়ে যাওয়া আসন দুটি শূন্য হওয়ায় ওহাইও ও ফ্লোরিডায় বিশেষ নির্বাচনের প্রয়োজন হয়।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে অন্তত সাতটি সিনেট আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা ছিল। অঙ্গরাজ্যগুলো হলো আলাস্কা, আইওয়া, কানসাস, মেইন, ওহাইও, টেক্সাস ও মিশিগান। তবে টেক্সাস ও কানসাস সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের তালিকায় থাকে না। কারণ, অঙ্গরাজ্য দুটি রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। কানসাসে সর্বশেষ ১৯৩২ সালে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছিলেন।
রিপাবলিকানদের একাধিক ঘাঁটি ধসিয়ে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিল ডেমোক্র্যাটরা
এদিকে, নিজেদের দখলে থাকা বেশ কয়েকটি আসনও ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। এর মধ্যে সুইং স্টেট হিসেবে পরিচিত জর্জিয়ায় সিনেটর জন অসফের পুনর্নির্বাচিত হওয়া উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি সিনেটে ১৭ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করা মার্ক ওয়ার্নারও ভার্জিনিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে নিজের আসন ধরে রেখেছেন।
ট্রাম্পবিরোধী জনমত ও নির্বাচনী ফল
বিশ্লেষকদের মতে, রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে মূল্যস্ফীতি, ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক, ইরান যুদ্ধ এবং তাঁর আচরণ ও ব্যক্তিগতভাবে সম্পদ অর্জনের বিষয়ে ভোটারদের উদ্বেগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সিএনএনের ভোটার জরিপে দেখা গেছে, ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের বেশি ভোটার ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড অনুমোদন করেন না। তাঁদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই তাঁর প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। জরিপে অংশ নেওয়া দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার মনে করেন, ট্রাম্পের নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল গণনা শেষ না হওয়ায় কংগ্রেসের দুই কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুনির্দিষ্ট ব্যবধান এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে উভয় কক্ষেই দলটি এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে, যাতে কিছু সদস্যের সমর্থন হারালেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার সুযোগ থাকবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর বাড়বে নজরদারি
কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের ওপর তদন্ত ও নজরদারির ক্ষমতা বাড়বে বিরোধী দলটির। নিজেদের বিবেচনায় বিভিন্ন বিষয়ে তদন্ত শুরু করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে হাজির করতে সমন জারির ক্ষমতাও পাবে তারা।
অন্যদিকে, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ট্রাম্পের বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়াও আটকে দিতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে কোনো বিচারকের পদ শূন্য হলে সেই পদে ট্রাম্পের মনোনীত প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত করতে পারবে দলটি।
তবে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও নিজেদের পছন্দের আইন ও নীতিগত কর্মসূচি বাস্তবায়নে ডেমোক্র্যাটদের সামনে বাধা থাকবে। কারণ, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। এ ছাড়া সিনেটে অধিকাংশ আইন পাসের জন্য ৬০ ভোটের প্রয়োজন হয়। ফলে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও তাদের পক্ষে নিজেদের সব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনছে। প্রেসিডেন্টের পদ রিপাবলিকানদের হাতে থাকলেও কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আগামী দুই বছর আইন প্রণয়ন, বিচারক নিয়োগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।
















