• ঢাকা
  • বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫, ২ পৌষ ১৪৩২, ২৬ জমাদিউস সানি ১৪৪৭

তর তর করে বাড়ছে যমুনার পানি


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১, ২০২১, ০২:৫৭ পিএম
তর তর করে বাড়ছে যমুনার পানি

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে যমুনা নদীর পানি তর তর করে বাড়ছে। পানির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে দুর্ভোগ, মিলছে না ত্রাণ। 
সমতল ভূমি অল্পতেই ডুবে যায় ও চরাঞ্চলের এই পরিস্থিতি সব সময়ের বলে জানান এক ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা। ত্রাণ দেওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

জামালপুর

জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ, মেলান্দহ, বকশীগঞ্জ ও সরিষাবাড়িতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এদিকে ভাদ্রের অকাল বন্যার ফলে রোপা-আমন ধানসহ বীজতলা, বিভিন্ন ধরনের সবজি ক্ষেত নষ্টের তালিকায় উঠছে।

তবে এখনো পুরোপুরি হিসাব মেলাতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে পানির গতিবিধির ওপর। বুধবার (১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে যমুনার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে ৪৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদী তীরবর্তী চারটি উপজেলার ২০টি ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন প্রায় ২০ হাজার মানুষ। তিন দিন ধরে পানি অব্যাহতভাবে বেড়ে যাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে তলিয়ে যাচ্ছে নিম্নাঞ্চলের ফসলি জমি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পানি পরিমাপক (গেজ রিডার) আবদুল মান্নান বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে বিপৎসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যেভাবে পানি বাড়ছে, এতে নতুন নতুন আরও এলাকা প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ইসলামপুর উপজেলার চিনাডুলী, সাপধরী, বেলগাছা, পাথর্শী, কুলকান্দি, নোয়ারপাড়া, দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চিজাকাজানী, চুকাইবাড়ী, বাহাদুরাবাদ ও পৌরসভার আংশিক, মাদারগঞ্জ উপজেলার চরপাকেরদহ, জোড়খালী, বালিজুড়ী ও মেলান্দহ উপজেলার ঘোষেরপাড়া, ঝাউগড়া ও আদ্রা, সরিষাবাড়ি উপজেলার সাতপোয়া, পোগলদিঘা, আওনা ও পিংনা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে।

ইসলামপুর উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলে প্লাবিত হয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি বন্যা কবলিত এলাকা সাপধরী ইউনিয়ন পুরোটাই বন্যার পানিতে ভাসে গেছে। তলিয়ে গেছে রোপা-আমন ফসল ও বীজতলা। এছাড়াও চিনাডুলী, নোয়ারপাড়া, বেলগাছা ও কুলকান্দি চরাঞ্চল ও পৌর শহরের নিম্নাঞ্চলের বন্যার পানি প্লাবিত হয়ে রোপা-আমন, বীজতলা ফসল তলিয়ে গেছে। অকাল বন্যায় নিচু এলাকার পানিবন্দি মানুষ গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছে। বেলগাছা, গোয়ালের চর, জিগাতলাসহ কয়েকটি গ্রামে দুই শতাধিক বাড়িঘর নদীর গর্ভে বিলীন হয়েছে।

সাপধরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন জানান, তার ইউনিয়ন সম্পূর্ণভাবে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দী মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ইঞ্জিলামারী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকির মুখে পড়বে।

চিনাডুলী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুস সালাম বলেন, এই ইউনিয়ন নদীর একদম তীরবর্তী। ফলে বন্যার পানি ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে পুরো ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে। অনেক মানুষ এখন পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। এসব এলাকায় এখনই খাদ্যসহায়তার প্রয়োজন। এসব মানুষ দিনে এনে দিনে খাওয়া অবস্থা। পানিবন্দী অবস্থায় তাদের কষ্ট অনেক বেশি।

জামালপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. নায়েব আলী বন্যা মোকাবিলায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দুর্যোগ প্রতিরোধ কমিটির সভা হয়েছে। ইতোমধ্যে সাতটি উপজেলায় বন্যাকবলিত ব্যক্তিদের সহায়তার জন্য ৩৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেগুলো বিতরণ চলছে।

অপরদিকে দেওয়ানগঞ্জে যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, দশানী, জিঞ্জিরাম নদ-নদীর পানি বাড়ায় উপজেলার পৌরশহর, চুকাইবাড়ী, চিকাজানি, বাহাদুরাবাদ, সদর ইউনিয়নসহ ৮টি ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও দুর্গম চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার চুকাইবাড়ী ও চিকাজানি ইউনিয়নের আংশিক এলাকার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ পরেশ চন্দ্র দাস জানান, পানি বৃদ্ধি থাকায় উপজেলার ১ হাজার ৮০ হেক্টর জমির রোপা আমন ও বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধি থাকায় এ উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

সিরাজগঞ্জ

যমুনার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ৪৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছে অর্ধলাখেরও বেশি মানুষ, তলিয়ে গেছে প্রায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমির ফসল। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে টিউবওয়েল ও টয়লেট ডুবে যাওয়ায় বেড়েছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি, এভাবেই দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি।

এদিকে সিরাজগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদফতরের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের জন্য জেলা শহর ও পাঁচটি উপজেলায় মজুদ রাখা হয়েছে ১৭৬ মেট্রিক টন চাল ও সাড়ে সাত লাখ নগদ টাকা। তবে এখনো কোথাও কোনো ত্রাণ বিতরণের খবর পাওয়া যায়নি। বন্যা কবলিতদের বাড়িঘর ছেড়ে উঁচু রাস্তা বা স্কুল-মাদ্রাসার খোলা মাঠে থাকতে দেখা গেছে। তারা পাননি কোনো সহযোগিতা। তবুও জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা বলছেন, ত্রাণ দেওয়ার মতো কোনো অবস্থা সৃষ্টি হয়নি।

যমুনার পানি বিপৎসীমার ৪৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার বিষয়টি বুধবার (১ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় নিশ্চিত করেছেন সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাকির হোসেন।

এ ছাড়াও সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের শহর রক্ষা বাঁধ পয়েন্টের গেজ মিটার (পানি পরিমাপক) আব্দুল লতিফ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি শহর রক্ষা বাঁধ পয়েন্টে ৯ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৪৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, পানি আরও বাড়বে। 

গত ১৪ আগস্ট থেকে শুরু করে বুধবার পর্যন্ত যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার নদী তীরবর্তী আরও কিছু নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এ সকল এলাকার বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাটে পানি উঠায় বিপাকে পড়েছেন বন্যা দুর্গতরা। 

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, গত কয়েকদিন যমুনায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে, যমুনা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ৯ সেন্টিমিটার বেড়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অন্তত আরও দুদিন অব্যাহত থাকবে। তবে পানি বিপৎসীমার ৪৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত বন্যার তেমন কোনো ঝুঁকির পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুর রহিম জানান, যমুনা নদীতে পানি বেড়ে বিপৎসীমার ৪৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও ত্রাণ দেওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। কারণ সমতল ভূমি অল্পতেই ডুবে যায় ও চরাঞ্চলের এই পরিস্থিতি সব সময়ের। আমরা নিয়মিত পানির খোঁজ-খবর রাখছি।

আব্দুর রহিম আরও বলেন, জেলার কাজীপুর, সদর, বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুর উপজেলায় ১০০ মেট্রিক টন চাল ও এক লাখ করে নগদ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তারা সেটা তাদের চাহিদা অনুযায়ী যেকোনো সময় বিতরণ করবেন। এ ছাড়া জেলায় ৭৬ মেট্রিক টন চাল ও আড়াই লাখ টাকা মজুদ রাখা হয়েছে, কোনো এলাকায় ত্রাণের প্রয়োজন আছে কি না তা নিয়মিত খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। 

Link copied!