বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে লাতিন আমেরিকার দল আর ইউরোপীয় দল যে কখনোই মুখোমুখি হয়নি, তা নয়। সবশেষ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালেই মুখোমুখি হয়েছে আর্জেন্টিনা-ফ্রান্স। ফরাসিদের হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবারও উঠেছে ফাইনালে। কিন্তু এবারের ব্যাপারটা যে একেবারে আলাদা। যে দুই দল মুখোমুখি হচ্ছে, তাদের মধ্যে দারুণ মিলও রয়েছে।
ইংল্যান্ড না ওঠায় ‘অল-ইউরোপীয় ফাইনাল’ হচ্ছে না ঠিকই। কিন্তু পরশু নিউজার্সিতে যে ফাইনাল হতে যাচ্ছে, সেটাকে ‘অল-স্প্যানিশ ফাইনাল’ বললেও ভুল হবে না। ঘটনার প্রেক্ষাপট হয়তো অনেকেরই জানা। স্পেনের মতো আর্জেন্টিনার জাতীয় ভাষাও স্প্যানিশ। শুধু এখানেই শেষ নয়, যে দুই কোচ মুখোমুখি হচ্ছেন, তাদের সম্পর্কটা যতটা না গুরু-শিষ্যের, তার চেয়ে বেশি বন্ধুত্বের। একজন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। যাঁর জাদুর স্পর্শে বদলে গেল আকাশী-নীলেরা। অপরজন স্পেনের ভিসেন্তে দে লা ফুয়েন্তে। যিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলে কোচিং শুরুর আগে এক ক্লাব থেকেই চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন।
শুরুটা স্কালোনিকে দিয়েই করা যাক। একটা সময় যে আর্জেন্টিনাকে প্রতিপক্ষের ভক্ত-সমর্থকেরা ‘আর জেতে না’ বলে ট্রল করতেন, সেই দল এখন উড়ছে। অথচ এই স্কালোনি আর্জেন্টিনার কোচ নাও হতে পারতেন। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ ব্যর্থতায় আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) সঙ্গে মৌখিক সম্মতিতে চাকরি ছাড়েন হোর্হে সামপাওলি। তখন শূন্যস্থান পূরণে হন্যে হয়ে উঠেছিল এএফএ। আলোচনায় আসেন স্কালোনি। যার তখন আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-২০ দলে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা ছিল। ক্লাব ফুটবল বলতে সেভিয়ার সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল।
আলোচনায় এলেও স্কালোনির ওপর ভরসা করার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। খোদ দিয়েগো ম্যারাডোনা এ ব্যাপারে তীব্র আপত্তি তুলেছিলেন। ম্যারাডোনার মতে স্কালোনি নাকি ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব সামলানোর মতো উপযুক্ত ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত স্কালোনি আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ হয়েছেন। সহকারী কোচ থেকে দ্রুত বনে গেলেন প্রধান কোচ। যাঁর হাত ধরেই শিরোপা শব্দটি হয়ে গেল আর্জেন্টিনার। দলের মধ্যে একটা সুখী পরিবারের মতো পরিবেশ তৈরি করেছেন।
যে মেজর শিরোপার জন্য আর্জেন্টিনা ২৮ বছর অপেক্ষা করত, তাদের অপেক্ষা ঘুচেছে ২০২১ সালে এসে স্কালোনির হাত ধরেই। মারাকানায় ২০২১ কোপা আমেরিকার ফাইনালে আনহেল দি মারিয়ার গোলে ব্রাজিলের বিপক্ষে ১-০ গোলে জিতে আর্জেন্টিনা জেতে কোপা আমেরিকার শিরোপা। একই ধারাবাহিকতায় ২০২২ ফিনালিসিমা, ২০২২ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা জিতেছে আলবিসেলেস্তেরা। যে বিশ্বকাপ জয়ের জন্য আর্জেন্টিনা ৩৬ বছর অপেক্ষা করত, সেই অপেক্ষা ঘুচেছে কাতারে ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর। লিওনেল মেসিরও পূর্ণ হলো আজন্মলালিত স্বপ্ন।
মেসির এক সময়ের সতীর্থ হওয়ায় স্কালোনির সঙ্গে তাঁর (মেসি) বোঝাপড়াটাও দারুণ। দুই লিওনেল জুটিতে একের পর এক শিরোপাজয়ী আর্জেন্টিনার হুলিয়ান আলভারেস, লাউতারো মার্তিনেস, এনসো ফার্নান্দেসরাও দলের প্রয়োজনে জ্বলে উঠছেন। যে লাউতারো ২০২২ বিশ্বকাপে একের পর এক গোলের সুযোগ মিস করেছিলেন, এবারের বিশ্বকাপে তিনি প্রয়োজনের মুহূর্তে গোল করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছেন।
কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে ২-১ গোলে হারের পর ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে’ টানা ১৩ ম্যাচ জিতেছে আর্জেন্টিনা। এই ১৩ ম্যাচেই দুই বা ততোধিক গোলের কীর্তি গড়েছে আলবিসেলেস্তেরা। ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্তিনেসের মতো ডিফেন্ডাররাও গোল করছেন। আর বাজপাখি নামে পরিচিত এমিলিয়ানো মার্তিনেস তো আছেনই। অপরদিকে আরেক ফাইনালিস্ট স্পেন এবারের বিশ্বকাপে ১৩ গোলের বিপরীতে হজম করেছে ১ গোল। গোলরক্ষক উনাই সিমন প্রতিপক্ষের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে দিচ্ছেন। মিকেল ওইয়ারসাবাল করেছেন ৫ গোল।
সিমন-ওইয়ারসাবালদের ভিড়ে দে লা ফুয়েন্তে আড়ালে চলে গেলেও মূলত তিনিই (স্পেনের কোচ) আসল কারিগর। ২০১১ সালে স্পেনের আলাভেস ক্লাব তাঁকে বরখাস্ত হওয়ার পর জাতীয় দলের কোচ হতে ১১ বছর সময় লেগেছে। স্পেন অনূর্ধ্ব-১৯, স্পেন অনূর্ধ্ব-২১, স্পেন অনূর্ধ্ব-২৩ দল ২০২২ সালে হয়েছেন স্পেন জাতীয় দলের কোচ। ট্যাকটিকাল জায়গা থেকে বলতে গেলে লামিনে ইয়ামালকে খেলিয়েই বদলে দিয়েছেন দৃশ্যপট। কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের ম্যাচে ইয়ামালকে শুরুর একাদশে খেলানো হয়নি। কিন্তু যখন থেকে ইয়ামালকে শুরুর একাদশে খেলানো হচ্ছে, তখন থেকেই খেলার গতি বেড়ে গিয়েছে। টুর্নামেন্টে একটা গোলও করেছেন।
কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিশের মতো তারকাখচিত ফ্রান্সকে ২-০ গোলে স্পেন হারিয়েছে দে লা ফুয়েন্তের কৌশলেই। ডালাসে গত ১৪ জুলাই ফ্রান্সকে পেদ্রো পোরো, পাও কুবারসি, মার্ক কুকুরেয়ার মতো স্প্যানিশ ডিফেন্ডাররা দারুণভাবে রুখে দিয়েছেন। পোরো তো একটা গোলও করেছেন। যেটা তাঁর এবারের বিশ্বকাপে দ্বিতীয় গোল। সেদিনই আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে চাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন দে লা ফুয়েন্তে। মূলত স্কালোনির কোচিং কোর্সের গুরু হওয়াতেই এমনটা চেয়েছিলেন তিনি (দে লা ফুয়েন্তে)। ফরাসিদের হারানোর পর স্প্যানিশ কোচ বলেছিলেন, ‘স্কালোনির সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের কারণে আমি আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলতে চাই। তবে ইংল্যান্ডও খুব কঠিন প্রতিপক্ষ হবে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দলই এবার সেমিফাইনালে উঠেছে, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবার।’
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের আগে কোচিং গুরু লা ফুয়েন্তের প্রশংসা করেছেন স্কালোনি। আর্জেন্টিনা কোচ বলেন, ‘লুইসের জন্য আমি খুশি। তিনি এটার যোগ্য। তিনি অসাধারণ একজন মানুষ। তিনি সবসময় আমাকে সাহায্য করেছেন। কী হবে, সেটা দেখা যাবে। তবে তিনি অবশ্যই এই জায়গায় আসার যোগ্যতা অর্জন করেছেন।’
স্কালোনি, দে লা ফুয়েন্তে যা চেয়েছেন শেষ পর্যন্ত তা-ই হচ্ছে। পরশু নিউজার্সিতে ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে স্পেন-ফ্রান্স। দুই ‘মাস্টারক্লাস’ কোচের কেউ একজন জিতবেন। অপরজনকে রানার্সআপ হওয়ার সান্ত্বনা নিয়েই টুর্নামেন্ট শেষ করতে হবে। সব মিলিয়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী ‘অল-স্প্যানিশ’ ফাইনাল দেখার অপেক্ষাতেই আছেন।

































