ম্যাচের বয়স তখন ১১২ মিনিট। ২-১ গোলে পিছিয়ে থাকা ক্রোয়েশিয়া যখন সমতা ফিরিয়ে উল্লাসে মাতল, পর্তুগাল শিবিরে তখন স্তব্ধতা। সবাই ধরে নিয়েছেন যে, নিশ্চিতভাবেই ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে যাচ্ছে। কিন্তু তখনই নাটকের শুরু। নরওয়েজিয়ান রেফারি এসপেন এসকাস ভিএআর মনিটর দেখে ক্রোয়েশিয়ার গোলটি অফসাইডের কারণে বাতিল করে দিলেন!
টেলিভিশন ক্যামেরার সাধারণ ফুটেজে যা ধরা পড়া অসম্ভব ছিল, সেটা সেকেন্ডের মধ্যে নিখুঁতভাবে প্রমাণ করে দিল বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বলের ভেতরে থাকা একটি অদৃশ্য চিপ। ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ ব্যবধানে বিদায় করে ২০২৬ বিশ্বকাপের রাউন্ড অব সিক্সটিনে জায়গা করে নিল পর্তুগাল, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ শক্তিশালী স্পেন। ১০ মিনিট যোগ করা সময় শেষ হলো ১৯ মিনিটে গিয়ে!
চলতি বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল ‘ট্রিওন্ডা’-র চারপাশের প্যানেলের ভেতরে একটি বিশেষ মোশন সেন্সর বা চিপ বসানো রয়েছে। এই সেন্সরটি বলের ওপর যেকোনো ধরনের স্পর্শের নিখুঁত ডেটা তাৎক্ষণিকভাবে ভিএআর কক্ষে পাঠিয়ে দেয়।
ক্রোয়েশিয়ার ইগর মাতানোভিচ যখন হেড করার জন্য লাফিয়ে ওঠেন, তখন বলটি তার মাথায় সামান্যতম স্পর্শ করেছিল কি না, তা সাধারণ ক্যামেরায় বোঝা যাচ্ছিল না। কিন্তু টিভির গ্রাফিক্সে দেখা যায়, বলের ডেটা লাইনে স্পাইক ভেসে উঠেছে। এর মানে হলো, ঠিক ওই নির্দিষ্ট মিলিসেকেন্ডে বলটিতে আলতো স্পর্শ লেগেছিল। আর ওই স্পর্শের মুহূর্তেই জোসকো গাভার্দিওল অফসাইড পজিশনে থাকায় প্রযুক্তি সেই গোল বাতিল করে দেয়।
এটি মূলত ফিফার সেমি-অটোমেটেড অফসাইড টেকনোলজির (এসএওটি) একটি অংশ। স্টেডিয়ামের চারপাশে থাকা ১৬টি বিশেষ ক্যামেরা প্রতি সেকেন্ডে ৫০ বার বল এবং প্রতিটি খেলোয়াড়ের ২৯টি করে ডেটা পয়েন্ট ট্র্যাক করে। বলের ভেতরের চিপের টাইমিং এবং ক্যামেরার ডেটা এক সুতোয় গেঁথে অফসাইডের নিখুঁত থ্রিডি অ্যানিমেশন তৈরি করা হয়।
পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে এই সেমি-অটোমেটেড প্রযুক্তি তিন-তিনবার হস্তক্ষেপ করেছে। প্রথমে যখন পর্তুগাল ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিল, তখন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর একটি গোল বাতিল হয়। এরপর ম্যাচ যখন ১-১ সমতায়, তখন ক্রোয়েশিয়ার পেতার সুচিচের আরেকটি গোল অফসাইডের বাতিল হয়। এরপর আসে যোগ করা সময়ের সেই নাটকীয় মুহূর্ত।
ফুটবলপ্রেমীদের মনে থাকার কথা, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও এই চিপ প্রযুক্তির কারণে খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। উরুগুয়ের বিপক্ষে ব্রুনো ফার্নান্দেসের একটি ক্রসে রোনালদো লাফিয়ে উঠে নিজের চেনা স্টাইলে ‘সিইউইউইউ’ উদযাপনে মেতে উঠেছিলেন। রোনালদো দাবি করেছিলেন গোলটি তার, কিন্তু তৎকালীন অফিশিয়াল বল ‘আল রিহলা’র ভেতরের চিপের ডেটা প্রমাণ করেছিল বলটিতে রোনালদোর কোনো স্পর্শই লাগেনি। ফলে গোলটি ব্রুনোর নামে লেখা হয়। চার বছর আগে যে প্রযুক্তি রোনালদোর গোল কেড়ে নিয়েছিল, এবার নকআউটের অন্তিম মুহূর্তে সেই প্রযুক্তির কল্যাণেই উল্লাসে ভাসল পর্তুগাল।
































