শুরু হয়ে গেল এল নিনো, কীভাবে বদলে দিতে পারে বৈশ্বিক আবহাওয়া?


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ২৭, ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম
শুরু হয়ে গেল এল নিনো, কীভাবে বদলে দিতে পারে বৈশ্বিক আবহাওয়া?

আটলান্টিক মহাসাগরে হ্যারিকেন বা ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম সবেমাত্র শুরু হয়েছে, যা আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এবং সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে এই ঝড়ের প্রকোপ সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করবে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এই ঝড়গুলো মূলত ক্যারিবীয় অঞ্চলসহ যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব ও উপসাগরীয় উপকূলবর্তী এলাকার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করে।


তবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’-এর আবহাওয়াবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছেন, এবারের আটলান্টিক হ্যারিকেন মৌসুম স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই শান্ত থাকতে পারে। আর এর পেছনে মূল কারিগর হিসেবে কাজ করছে ‘এল নিনো’ নামক একটি বিশেষ জলবায়ুগত ঘটনা। সংস্থাটির মতে, এবার আটলান্টিকে স্বাভাবিকের চেয়ে কম ঝড় হওয়ার সম্ভাবনা ৫৫ শতাংশ, স্বাভাবিক থাকার সম্ভাবনা ৩৫ শতাংশ এবং স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঝড় হবার সম্ভাবনা মাত্র ১০ শতাংশ।

 

এল নিনো কি এবং এটি কীভাবে আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে?

সহজ ভাষায়, এল নিনো হলো মধ্য ও পূর্ব ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের উপরিভাগের পানির তাপমাত্রা পর্যায়ক্রমিক ও সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার একটি প্রক্রিয়া। এই উষ্ণায়নের ফলে বিশ্বব্যাপী বায়ুপ্রবাহ এবং বৃষ্টিপাত চক্রে বড় ধরণের ওলটপালট ঘটে, যা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র বন্যা, খরা এবং দাবদাহের সৃষ্টি করে। এমনকি এল নিনো সক্রিয় থাকাকালীন বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রাও কিছুটা বেড়ে যায়।

সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর এল নিনোর আগমন ঘটে এবং এটি সাধারণত ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়, যদিও কিছু ক্ষেত্রে এর চেয়েও দীর্ঘায়িত হতে পারে। এর ঠিক বিপরীত অবস্থাকে বলা হয় ‘লা নিনা’, যার অর্থ প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে শীতল থাকা। এই দুটি অবস্থাই ‘এনসো’ নামক একটি বৃহত্তর জলবায়ু চক্রের অংশ, যার তিনটি দশা রয়েছে:

১. নিরপেক্ষ দশা: এই সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরে ‘আয়ন বায়ু’ বা ট্রেড উইন্ড স্বাভাবিকভাবে পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হয়। এই বায়ু আমেরিকার উপকূল থেকে উষ্ণ পানিকে এশিয়ার দিকে ঠেলে দেয় এবং সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে আমেরিকার উপকূলীয় অঞ্চলের সমুদ্রের তলদেশ থেকে ঠাণ্ডা পানি ওপরে উঠে আসে।

২. শীতল দশা বা লা নিনা: এটি এল নিনোর ঠিক উল্টো। এই দশায় আয়ন বায়ু স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং এশিয়ার দিকে প্রচুর উষ্ণ পানি ঠেলে দেয়, ফলে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা গড়ের চেয়ে অনেক কমে যায়।

৩. উষ্ণ দশা বা এল নিনো: এই সময়ে আয়ন বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা উল্টো দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করে। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের সেই উষ্ণ পানি পুনরায় পূর্ব দিকে ধেয়ে এসে আমেরিকার উপকূল অভিমুখে জমা হয়। এই এল নিনো আটলান্টিক মহাসাগরে হ্যারিকেন তৈরিতে বাধা দেয় কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরে ঝড়ের সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়; পক্ষান্তরে লা নিনা ঠিক এর উল্টো কাজ করে অর্থাৎ আটলান্টিকে আরও বেশি ও শক্তিশালী হ্যারিকেন তৈরি করে।


গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় কীভাবে তৈরি হয়?

নিরক্ষরেখার কাছাকাছি অঞ্চলের সমুদ্রের পানি উষ্ণ হলে তার ওপরের বাতাসও গরম হয়ে ওপরে উঠে যায়, যা সেখানে একটি নিম্নচাপ বলয় তৈরি করে। এই ওপরে উঠে যাওয়া বাতাস যখন আবার ঠাণ্ডা হয়, তখন নিচ থেকে উঠে আসা আরও গরম বাতাস একে একপাশে ঠেলে দেয়। বাতাসের এই চক্রাকার ঘূর্ণনই তীব্র বাতাস ও বৃষ্টির জন্ম দেয়।

এই চক্রটি যখন আরও গতি ও শক্তি সঞ্চয় করে, তখন এটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়ে রূপান্তরিত হয়। ঝড়টি যত দ্রুত ঘোরে, তার কেন্দ্রস্থলে একটি শান্ত ও পরিষ্কার অঞ্চল তৈরি হয় যাকে ঝড়ের ‘চোখ’ বলা হয়। এই তীব্র ঘূর্ণনের কারণে বাতাস বাইরের দিকে ছিটকে যাওয়ায় ঝড়ের কেন্দ্রে বায়ুচাপ অত্যন্ত কম থাকে।

যখন বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৬৩ কিলোমিটারে পৌঁছায়, তখন তাকে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় বলা হয়। আর এই গতিবেগ যখন ঘণ্টায় ১১৯ কিলোমিটার বা তার বেশি হয়, তখন তা সাইক্লোন, টাইফুন বা হ্যারিকেনে রূপ নেয়।

 

হ্যারিকেন, সাইক্লোন ও টাইফুন কি একই জিনিস?

গাঠনিক দিক থেকে বিচার করলে হ্যারিকেন, সাইক্লোন এবং টাইফুন—সবই মূলত একই ধরণের ধ্বংসাত্মক ঝড়। এদের মধ্যে একমাত্র পার্থক্য হলো এদের উৎপত্তিস্থল বা ভৌগোলিক অবস্থান। ঘণ্টায় ১১৯ কিলোমিটারের বেশি গতিসম্পন্ন এই ঝড়গুলো বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত:

হ্যারিকেন: উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর এবং উত্তর-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট ঝড়কে হ্যারিকেন বলা হয়, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল, মেক্সিকো উপসাগর এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলকে আঘাত করে। ১ থেকে ৫ মাত্রার উইন্ড স্কেলে এর তীব্রতা মাপা হয়। ক্যাটাগরি-১ হ্যারিকেনের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৯-১৫৩ কিলোমিটার হলেও ক্যাটাগরি-৫ ঝড়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ২৫২ কিলোমিটারের বেশি হতে পারে।

সাইক্লোন: দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগরে উৎপন্ন ঝড়কে সাইক্লোন বলা হয়, যা অস্ট্রেলিয়া থেকে শুরু করে মোজাম্বিক পর্যন্ত বিস্তৃত দেশগুলোতে আঘাত হানে। সাধারণত নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সাইক্লোনের মরশুম ধরা হয়।

টাইফুন: উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট ঝড়কে টাইফুন বলা হয়, যা ঘন ঘন ফিলিপাইন ও জাপানে আঘাত হানে। মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এর প্রকোপ বেশি থাকলেও এটি বছরের যেকোনো সময় তৈরি হতে পারে। এর সবচেয়ে ভয়াবহ রূপকে বলা হয় ‘সুপার টাইফুন’।

 

বিশ্বজুড়ে ঝড়ের ওপর এল নিনোর প্রভাব

পৃথিবীর কোন অঞ্চলে আপনি আছেন, তার ওপর ভিত্তি করে এল নিনো আবহাওয়ার ওপর ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলে:

উত্তর আটলান্টিক: এল নিনো চলার সময় আটলান্টিকে হ্যারিকেন নাটকীয়ভাবে কমে যায়। স্বাভাবিক মৌসুমে যেখানে ১৪টি নামধারী ঝড় এবং ৩টি বড় হ্যারিকেনসহ মোট ৭টি হ্যারিকেন আশা করা হয়, সেখানে এল নিনোর কারণে হ্যারিকেনের সম্ভাবনা প্রায় ৬০ শতাংশ কমে যায় এবং ঝড়ের তীব্রতাও হ্রাস পায়। তবে নোয়া’র ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের ডিরেক্টর কেন গ্রাহাম সতর্ক করে বলেছেন, এল নিনো ঝড়কে বাধা দিলেও প্রতিটি মৌসুমে কীভাবে মোড় নেবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। একটিমাত্র শক্তিশালী ঝড়ই পুরো মরশুমকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

উল্লেখ্য, আটলান্টিকের ঝড়গুলো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ও ব্যয়বহুল দুর্যোগ। ১৯৮০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই হ্যারিকেনের কারণে ৭,২১১ জন মারা গেছেন (বছরে গড়ে ১৬০ জন) এবং আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১.৫৫ ট্রিলিয়ন ডলার; যার মধ্যে ক্যাটরিনা (২০০৫), মারিয়া (২০১৭) এবং হেলেন (২০২৪) এর মতো ভয়াবহ দুর্যোগ শামিল রয়েছে।

উত্তর-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর (হাওয়াইয়ের কাছে): এল নিনো চলাকালীন এবং এর ঠিক পরবর্তী বছর হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের আশেপাশে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ঝড় তৈরি ও ধেয়ে আসতে দেখা যায়।

অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর: এই সময়ে অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে ঝড়ের সংখ্যা কমে যায়। তবে ঝড়গুলো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না, বরং সাগরের তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তনের কারণে এদের উৎপত্তিস্থল পূর্ব দিকে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার কাছাকাছি দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে স্থানান্তরিত হয়।

এশিয়া ও উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর: এশিয়ার উপকূলবর্তী অঞ্চলে টাইফুনের মোট সংখ্যা প্রায় একই থাকলেও এদের উৎপত্তিস্থল বদলে যায়। এশিয়ার কাছাকাছি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে কম টাইফুন তৈরি হয় এবং পূর্ব দিকে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার দিকে বেশি টাইফুন তৈরি হতে দেখা যায়।

ভারত মহাসাগর: দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এল নিনোর কারণে ঝড়ের সংখ্যার তেমন কোনো বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না।

 

ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ কীভাবে হয়?

মিডিয়া রিপোর্ট ও সতর্কবার্তায় সাধারণ মানুষ যাতে সহজে ও দ্রুত নির্দিষ্ট ঝড়কে সনাক্ত করতে পারে, সেজন্য গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়ের নামকরণের প্রথা শুরু হয়। শুরুর দিকে জাহাজের নাম বা কোনো ঘটনার ওপর ভিত্তি করে খামখেয়ালিভাবে ঝড়ের নাম দেওয়া হতো।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এসে ঝড়গুলোকে নারীদের নামে নামকরণ করা শুরু হয়। পরবর্তীতে আবহাওয়াবিদরা বর্ণানুক্রমিক তালিকা তৈরি করেন। ১৯৭৯ সাল থেকে হ্যারিকেনের নামকরণে পুরুষদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং বর্তমানে পর্যায়ক্রমে পুরুষ ও নারীর নাম ব্যবহার করা হয়।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ৬টি তালিকা প্রতি ছয় বছর পর পর আবর্তিত হয়ে হ্যারিকেনের নাম নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়। তবে কোনো ঝড় যদি অতিরিক্ত প্রাণঘাতী বা ধ্বংসাত্মক হয়, তবে সেই নামটি তালিকা থেকে চিরতরে বাদ করে দেয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে সেটি আর ব্যবহার না করা হয়।

এই বাদ পড়া নামগুলোর মধ্যে ক্যাটরিনা (২০০৫), স্যান্ডি (২০১২), ইরমা এবং মারিয়া (২০১৭) অন্যতম। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচিত শব্দের ওপর ভিত্তি করে আঞ্চলিক নিয়ম অনুযায়ী ঝড়ের নামকরণ করা হয়, যা দুর্যোগের সময় সাধারণ মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছানো অনেক সহজ ও কার্যকর করে তোলে।

আন্তর্জাতিক বিভাগের আরো খবর

Link copied!