১০৬ মিনিটে তোরেসের পা থেকে বেরিয়ে আসা শটটি বদলে দিয়েছে স্পেনের ফুটবল ইতিহাস। বলটি জালে জড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই থেমে গিয়েছিল সময়। একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়েছিল স্টেডিয়াম, গ্যালারি আর স্পেনের কোটি মানুষের হৃদয়। সেই এক গোল স্পেনকে পৌঁছে দিয়েছিল বিশ্বকাপের চূড়ায়।
১০৬ মিনিটের সেই মুহূর্তে পৌঁছানোর গল্প শুরু হয়েছিল বহু বছর আগে। একটি ছোট্ট শহরের মাঠে, যেখানে এক শিশু স্বপ্ন দেখত একদিন দেশের জার্সি গায়ে মাঠে নামার। ফেরান তোরেসের ফুটবলের শুরু হয়েছিল স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ার মাটিতে। ছোটবেলা থেকেই বল পায়ে তার গতি, সাহস আর গোলের ক্ষুধা আলাদা করে নজর কেড়েছিল। পরিবার, কোচ আর নিজের কঠোর পরিশ্রম তাকে ধীরে ধীরে নিয়ে গিয়েছিল বড় মঞ্চের দিকে।
তোরেসের ফুটবল জীবনের প্রথম বড় অধ্যায় শুরু হয় ভ্যালেন্সিয়া সিএফের একাডেমিতে। সেখানেই তৈরি হয় তার ফুটবলের ভিত্তি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার গতি, ড্রিবলিং তাকে আলাদা করে তোলে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ভ্যালেন্সিয়ার মূল দলে অভিষেক ঘটে তার।
তিনি পাড়ি দেন ইংল্যান্ডে। ম্যানচেস্টার সিটির জার্সিতে খেলেন। পরে যোগ দেন এফসি বার্সেলোনাতে। ক্লাব ফুটবলে প্রশংসা, সমালোচনা দুইয়ের মধ্য দিয়েই এগিয়েছেন তিনি। জাতীয় দলে তোরেসের পথচলাও ছিল সংগ্রামের। স্পেনের মতো দলে জায়গা পাওয়া সহজ নয়। তার গতি এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল করার ক্ষমতা তাকে কোচদের আস্থার জায়গায় নিয়ে যায়।
ম্যাচ তখন ক্লান্তির শেষ প্রান্তে। দুই দলের খেলোয়াড়দের পায়ে আর আগের মতো শক্তি নেই। পায়ের চেয়ে বেশি কাজ করছে মানসিক শক্তি। পাসে সতর্কতা, ট্যাকলে ভয়, প্রতি মুহূর্তে চাপ। ঠিক তখনই আসে সেই সুযোগ। নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ। তারপর শট। বল জালে। ইতিহাস লেখা হয়ে যায়। গোলের পর তোরেস ছুটতে শুরু করেন। দুই হাত আকাশের দিকে তুলে ধরেন। সতীর্থরা দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেন। গ্যালারিতে অচেনা মানুষ একে অন্যকে আলিঙ্গন করছে। কেউ কাঁদছে। কেউ চিৎকার করছে। কেউ বিশ্বাসই করতে পারছে না বহু বছরের অপেক্ষা সত্যিই শেষ হয়েছে।
ম্যাচ শেষে তোরেস বলেছিলেন, ‘ছোটবেলা থেকে এমন একটি মুহূর্তের স্বপ্ন দেখেছি। দেশের জন্য বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল করা ভাষায় প্রকাশ করার মতো অনুভূতি নয়। এই গোল শুধু আমার নয়, পুরো স্পেনের। যখন বলটা জালে ঢুকল, মনে হয়েছিল সময় থেমে গেছে। চারপাশের সব শব্দ হারিয়ে গিয়েছিল। শুধু বুঝেছিলাম, আমরা ইতিহাসের খুব কাছে পৌঁছে গেছি।’
গোলের পরও পরীক্ষা শেষ হয়নি। বাকি সময়টা ছিল অনন্ত দীর্ঘ। প্রতিটি সেকেন্ড যেন এক একটি মিনিট। স্পেনের সমর্থকেরা দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করছিলেন। বেঞ্চে বসা ফুটবলারদের চোখে উদ্বেগ। রেফারির শেষ বাঁশির অপেক্ষা হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা। সেই বাঁশি বাজে। সব বাঁধ ভেঙে যায়। কেউ হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন। কেউ চোখের জল লুকাতে পারেন না। কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে দুই হাত তুলে দেন। তোরেসকে ঘিরে ধরেন সতীর্থরা। সেই আলিঙ্গনে ছিল আনন্দ, স্বস্তি, ত্যাগ আর ইতিহাস ছোঁয়ার অনুভূতি।
বিশ্বকাপ ট্রফি যখন স্পেনের অধিনায়কের হাতে ওঠে, তখন হয়ত সবার চোখে ভেসে উঠেছিল ১০৬ মিনিটের সেই মুহূর্ত। ট্রফি জয়ের গল্প অনেক সময় একটি গোল থেকেই শুরু হয়। বহু বছর পর মানুষ হয়তো এই ম্যাচের পাস, ট্যাকল ও পরিসংখ্যান মনে রাখবে না। কিন্তু মনে রাখবে ১০৬ মিনিট। মনে রাখবে তোরেসের দৌড়। মনে রাখবে দুই হাত আকাশের দিকে তুলে ধরা সেই উদ্যাপন।
একদিন কোনো বাবা সন্তানকে বলবেন, ‘আমি সেই রাত দেখেছিলাম।’ কোনো শিশু ভিডিওতে সেই গোল দেখে স্বপ্ন দেখবে।
ফুটবল শেষ পর্যন্ত গোলের খেলা। কিছু গোলের মূল্য স্কোরবোর্ডে মাপা যায় না। কিছু গোল হয়ে যায় একটি দেশের স্মৃতি, একটি জাতির গর্ব, একটি প্রজন্মের আবেগ, কত শব্দ। ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের সেই গোলও তেমনই—যে গোল শুধু একটি বিশ্বকাপ জেতায়নি, সময়ের বুকেও নিজের জন্য চিরস্থায়ী একটি জায়গা তৈরি করে নিয়েছে।



































