মিকেল মেরিনো, স্পেনের নির্ভরতার আরেক নাম


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ১০:২৫ পিএম
মিকেল মেরিনো, স্পেনের নির্ভরতার আরেক নাম

একটি স্পর্শ একটি গোলেই বদলে যায় একটি দলের ভাগ্য, একটি জাতির স্বপ্ন। পর্তুগালের বিপক্ষে তেমনই এক মুহূর্তের জন্ম দিয়েছেন মিকেল মেরিনো। শেষ মুহূর্তের সেই গোলেই স্পেনকে তুলেছেন কোয়ার্টার ফাইনালে, আর বিদায়ের বেদনা উপহার দিয়েছেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পর্তুগালকে।

১৯৯৬ সালের ২২ জুন স্পেনের নাভারা অঞ্চলের পাম্পলোনায় জন্ম মিকেল মেরিনোর। ফুটবলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুরু হয় পরিবার থেকেই। বাবা মিগেল মেরিনো ছিলেন পেশাদার ফুটবলার। তাই ছোটবেলা থেকেই বল ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। বাবার পথ অনুসরণ করেই স্বপ্ন দেখেছিলেন একদিন দেশের জার্সি গায়ে বড় মঞ্চে খেলার।

সেই স্বপ্নের ভিত্তি গড়ে ওঠে ওসাসুনার একাডেমিতে। সেখান থেকে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে পাড়ি জমান জার্মানির বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে। এরপর খেলেছেন ইংল্যান্ডের নিউক্যাসল ইউনাইটেডে। তাঁর ক্যারিয়ারের আসল উত্থান ঘটে রিয়াল সোসিয়েদাদে। সেখানে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন স্পেনের অন্যতম সেরা বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার হিসেবে। সেই সাফল্যই তাঁকে নিয়ে যায় আর্সেনালে। ইংল্যান্ডেও নিজের পরিশ্রম, বল নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণ-রক্ষণে সমান দক্ষতার মাধ্যমে খুব দ্রুতই সমর্থকদের আস্থা অর্জন করেন।

স্পেনের বয়সভিত্তিক দলগুলোতে ধারাবাহিক সাফল্যের পর সিনিয়র জাতীয় দলেও নিজের জায়গা করে নেন মেরিনো। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন মাঝমাঠের অন্যতম ভরসার নাম। মাঠে তাঁর উপস্থিতি মানেই বাড়তি ভারসাম্য, শৃঙ্খলা এবং আত্মবিশ্বাস।

চলতি বিশ্বকাপেও স্পেনের নীরব শক্তি ছিলেন এই মিডফিল্ডার। শেষ ষোলোর ম্যাচেই তিনি নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় লিখেছেন। পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচটি যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছে, তখন যোগ করা সময়ে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বক্সের ভেতরে সুযোগ পেয়ে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জড়িয়ে দেন জালে। সেই একমাত্র গোলেই ১-০ ব্যবধানে জয় পায় স্পেন। কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত হয় লা রোহার, আর শেষ হয়ে যায় পর্তুগালের বিশ্বকাপ যাত্রা। এক মুহূর্তেই ম্যাচের সবচেয়ে বড় নায়কে পরিণত হন মিকেল মেরিনো।

 মাঝমাঠে তাঁর দাপটই তাঁকে আলাদা করে। আকাশে বল দখলের সক্ষমতা, নিখুঁত পাস, দূরপাল্লার শট এবং খেলার গতি বোঝার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম পরিপূর্ণ মিডফিল্ডারে পরিণত করেছে।

ঐতিহাসিক সেই জয়ের পর নিজের আবেগ লুকিয়ে রাখেননি মেরিনো। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের মুহূর্তের জন্যই আমরা ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখি। এই গোলটি আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম বিশেষ স্মৃতি হয়ে থাকবে। আমরা দল হিসেবে জিতেছি। আমি বিশ্বাস করি, এই স্পেন দল আরও অনেক দূর যেতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পর্তুগালের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারাতে হলে সবাইকে নিজেদের সেরাটা দিতে হয়। আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস হারাইনি। সেই বিশ্বাসই আমাদের জয় এনে দিয়েছে।’

স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেও মেরিনোর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘মিকেলকে যেকোনো কোচ নিজের দলে রাখতে চাইবে। সে কখনো আলো দাবি করে না, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সবসময় সামনে এসে দাঁড়ায়।’

সতীর্থ পেদ্রির কাছেও মেরিনো দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। তাঁর মতে, ‘মেরিনো আমাদের দলের ভারসাম্য। সে মাঠে থাকলে সবাই আরও আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলতে পারে।’

মাঠের বাইরের মেরিনো আবার সম্পূর্ণ অন্যরকম। শান্ত স্বভাব, বিনয়ী আচরণ এবং পরিবারকেন্দ্রিক জীবনই তাঁর পছন্দ। প্রচারের ঝলকানির চেয়ে কঠোর অনুশীলন আর নিজেকে আরও উন্নত করাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তার চেয়ে ফুটবল মাঠেই নিজের পরিচয় গড়ে তুলতে বিশ্বাস করেন।

স্পেনের বিশ্বকাপ অভিযানে মিকেল মেরিনো শুধু একজন মিডফিল্ডার নন,নির্ভরতার প্রতীক, বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের সেই গোলটি শুধু একটি ম্যাচ জেতায়নি, নতুন করে স্পেনের শিরোপা স্বপ্নও বাঁচিয়ে রেখেছে। বহু বছর পরও সেই মুহূর্ত স্প্যানিশ ফুটবলের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

Link copied!