পেনাল্টি আর লটারি নয়। এতদিনে ব্যাপারটা বদলেছে। এখন পেনাল্টি শুধু চাপ নয়, প্রস্তুতিও। এবারের বিশ্বকাপে খেলোয়াড়, কোচ ও গোলকিপাররা পেনাল্টিকে ভাগ্যের খেলা না ভেবে বিশেষ কৌশল হিসেবে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, যার পুরস্কারও হাতেনাতে মিলছে।
এবারের বিশ্বকাপে জার্মানি আর নেদারল্যান্ডসের মত ফেভারিট দুই দল বিদায় নিয়েছে টাইব্রেকারে হেরে। একের পর এক পেনাল্টি মিস করেছিলেন খেলোয়াড়রা। অন্যদিকে, বেলজিয়ামের ইউরি তিলেমান্স দেখিয়েছেন এর উল্টো ছবি। সেনেগালের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ বেলায় পেনাল্টি থেকে গোল করে অবিস্মরণীয় জয় এনে দেন তিনি।
নরওয়েজিয়ান স্কুল অব স্পোর্ট সায়েন্সেসের অধ্যাপক ও পেনাল্টি মনস্তত্ত্ব নিয়ে লেখা ‘প্রেশার’ বইয়ের লেখক গেইর ইয়রদেত জানিয়েছেন,'পেনাল্টি মানেই ভাগ্যের খেলা এই পুরনো ধারণাটিকে চামড়ার পুরনো ফুটবলের মতোই আলমারিতে বন্দি করে রাখার সময় এসেছে। একটি সফল বিশ্বকাপ অভিযানে পেনাল্টি শ্যুটআউটের মুখোমুখি হওয়াটা প্রায় অনিবার্য। তাই এর পেছনে সময় না দেওয়াটাই অদ্ভুত।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘শেষ পর্যন্ত হয়ত কোনো একজন তরুণ খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার এই পেনাল্টি শ্যুটআউটের ব্যর্থতা দিয়ে নির্ধারিত হবে। এটা সেই খেলোয়াড়ের ওপর এক বড় নেতিবাচক মানসিক আঘাত, যা কোচিং স্টাফ, ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এমনকি পুরো ফুটবল ইন্ডাস্ট্রি মিলে তার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।’
ইংলিশদের সেই মানসিক ক্ষত
নিজের ‘প্রেশার’ বইটির জন্য ইয়রদেত ১৯৭০ সালে শ্যুটআউট চালুর পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত- বিশ্বকাপ, ইউরো ও চ্যাম্পিয়নস লিগের প্রতিটি পেনাল্টি শ্যুটআউটের ৭১৮টি শটের ভিডিও বিশ্লেষণ করেছেন।
তার গবেষণায় দেখা গেছে, পেনাল্টি মিস করা ৫৩% খেলোয়াড়ই একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান। তারা নিজেদের গুটিয়ে নেন, মাটিতে ভেঙে পড়েন, দুই হাতে মুখ ঢাকেন, নিচের দিকে তাকিয়ে থাকেন কিংবা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সতীর্থদের এড়িয়ে মাঠ ছাড়েন। ইংল্যান্ড এই মানসিক ক্ষত খুব ভালো করেই জানে।
ইয়রদেত বলেছেন, ‘ইংল্যান্ডের গল্পটা বেশ আগ্রহের। তারা ৯০-এর দশক থেকে বড় টুর্নামেন্টে সাতটি পেনাল্টি শ্যুটআউটের ছয়টিতেই হেরেছিল। আর ইংল্যান্ডে সবার জানাই ছিল যে, আমরা টুর্নামেন্টে অনেক দূর যাব, আমাদের দুর্দান্ত সব প্রতিভা আছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেনাল্টিতে হারব! এরপর তারা নতুন কিছু তৈরি করে। তারা বড় ধরনের পেনাল্টি প্রজেক্ট শুরু করে। এর সুফল এখন পাচ্ছেন কেইনরা।’
কোচ টমাস টুখেলের অধীনে ইংল্যান্ড সেই প্রক্রিয়াটি চালু রেখেছে। টুখেল বিশ্বাস করেন, পেনাল্টি মানেই সঠিক বাস্তবায়ন এবং বারবার একই কাজের নিখুঁত অনুশীলন। তিনি বলেছেন, ‘ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা সেই পরিকল্পনাটি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলছি। নকআউট ম্যাচগুলোতে এটি ফুটবলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্দিষ্ট অংশ হিসেবে সামনে আসে।’
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেও একইভাবে বলেছেন,‘পেনাল্টি কিক কোন দৈব ঘটনা নয়। ফ্রি-কিক বা কর্নার কিকের জন্য যেমন আমাদের বিশেষজ্ঞ আছে, তেমনি পেনাল্টির জন্যও আমাদের স্পেশালিস্ট আছে। সবাই পেনাল্টি মারতে পারে না। আমাদের মনস্তাত্ত্বিক দিকটিতেও মনোযোগ দিতে হবে। কিছু খেলোয়াড়ের জন্য এটি অনেক বেশি কঠিন, আবার অন্যরা পেনাল্টি নেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে।’
শুরুর সংকেত
ইয়রদেতের গবেষণায় খেলোয়াড়দের চাপের সেই ছোট ছোট ছবিগুলো উঠে এসেছে। সেই হাফওয়ে লাইন থেকে পেনাল্টি স্পটের দিকে দ্রুত হেঁটে আসা, মুখের অভিব্যক্তি আর রেফারির বাঁশিকে রেসের 'স্টার্টিং গান' মনে করা। গোলকিপাররা তখন বিভ্রান্ত করতে নানা কৌশল নেন। সেই চাপটা খেলোয়াড়রা কীভাবে সামলান সেটাই আসল ব্যাপার।
ইয়রদেত বলেছেন,‘মুখের অভিব্যক্তি দেখে উদ্বেগ বোঝা যায়। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, আপনি কীভাবে এই আবেগগুলো সামলাচ্ছেন? পেনাল্টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি হলো যখন রেফারি বাঁশি বাজান। কিছু খেলোয়াড় এটিকে রেস শুরুর সংকেত হিসেবে দেখেন। যারা বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে খুব দ্রুত শট নেন, এটা ভালো লক্ষণ নয়। কারণ এটা বোঝায় তাদের মনোযোগ নিজেদের আবেগের ওপর, মূল কাজের ওপর নয়।’
সেনেগালের বিপক্ষে ছোট রান-আপ নিয়ে গোল করা তিলেমান্স বলেছেন, ‘ স্নায়ু ধরে রাখার প্রস্তুতি নেওয়াটা সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমরা গত কয়েকদিন ধরে অনুশীলন করছি। ওই মুহূর্তে আপনি শুধু আত্মবিশ্বাসী থাকার এবং নিজের দক্ষতার ওপর ভরসা রাখার চেষ্টা করবেন।’
এরপর আসে গোলকিপারদের কথা, তারা এখন আর - অনুমান করে যে কোনো এক দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো অসহায় চরিত্র নন। মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনো গ্লাভস হাতে এই দ্বৈরথকে দারুণ মনস্তাত্ত্বিক চালে রূপান্তর করেছেন। বোনোর প্রধান কৌশল হলো সেই শ্যুটারদের বিভ্রান্ত করা যারা গোলরক্ষকের নড়াচড়ার জন্য অপেক্ষা করেন। তিনি এটিকে একটি শিল্পে রূপান্তর করেছেন।
মরক্কো -নেদারল্যান্ডসের শেষ ৩২-এর সেই শ্যুটআউটে ডাচদের দুই খেলোয়াড় লক্ষ্যভ্রষ্ট শট নেন। অন্যজনের শট রুখে দেন বোনো। ইয়রদেত ব্যাখ্যা করেন, ‘বোনো গোললাইনে সঠিক মুহূর্তে ডাবল ফেক মুভমেন্ট করেন, যা শ্যুটারকে বিভ্রান্ত করে ভাবায় যে তিনি বাম দিকে যাচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবে তিনি ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েন।’
ইয়রদেত আরও যোগ করেন, ‘গোলকিপারদের মাঝে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন অনেক বেশি প্রস্তুত। এবারের বিশ্বকাপে আমরা দেখছি তারা পেনাল্টি শ্যুটারদের চেয়ে বেশি চতুর। আগের চেয়ে আরও উন্নত অ্যানালিটিক্স ও ডেটা ব্যবহার করে বাড়তি সুবিধাও নিচ্ছেন।’
ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তিও গুরুত্ব দিচ্ছেন পেনাল্টিকে। পুরো স্কোয়াডকে দুটি দলে ভাগ করে পুরোদমে শ্যুটআউটের মহড়া করান তিনি। সেই অনুশীলনে খেলোয়াড়রা হাফওয়ে লাইনে অপেক্ষা করেন, হেঁটে স্পটের দিকে যান আর নেন শট। কোচ দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করেন তাদের শারীরিক ভাষা ও প্রবণতাগুলো। এরপর দেন নিজের পরামর্শ।
































