গাজীপুরের টয়লেটের বর্জ্য ও কারখানার রাসায়নিক মিশ্রিত পানিতে ধোয়া শাকসবজি যাচ্ছে বিভিন্ন হাটে বাজারে। এসব শাকসবজি স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি বলছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি গাজীপুরের হাটগুলোতে সরেজমিনে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। জেলার কাপাসিয়া ও শ্রীপুরের লোহাই, বরমী, মাওনা বাজারে হরহামেশাই এমন দৃশ্যের দেখা মেলে। কাপাসিয়া বাজারের টয়লেট, আবর্জনা ও গৃহস্থালি বর্জ্যের স্তূপের পাশে শীতলক্ষ্যা নদীর পানিতে শাকসবজি ধোয়া হচ্ছে। বাজারটিতে হাজারের বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কাঁচা তরকারির দোকান রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, এক বিক্রেতা মুলা শাক, লাল শাক, ডাঁটাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি পিকআপ ভ্যান থেকে নামিয়ে প্রথমে মাটিতে রাখছেন। পরে সেগুলো একে একে দূষিত পানিতে চুবিয়ে ধুয়ে আবার মাটিতে রেখে বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে যাচ্ছেন।
সপ্তাহে দুদিন বসে জেলার শ্রীপুর উপজেলার লোহাই বাজার। এই বাজারে টাটকা শাকসবজির বড় হাট বসে। বেশির ভাগ দোকানি বিভিন্ন গ্রাম থেকে শাকসবজি সংগ্রহ করে ধোয়ার জন্য বেছে নেন বাজারের অদূরে আবদার এলাকার সাতচুঙ্গি নামক একটি স্থান। সেখানে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের রাসায়নিক বর্জ্য মিশ্রিত পানি জমা হয় নিচু জমিতে। সেখানেই শাকসবজি ধোয়ার কাজ করেন দোকানিরা।
কাপাসিয়া বাজারের সবজি বিক্রেতা সোহেল রানা বলেন, ‘এখানে টয়লেটের পাশেই সবজি ধোয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো জায়গা নেই। শুধু আমি নই, দীর্ঘদিন ধরে সবাই এখানেই সবজি ধুয়ে বাজারে বিক্রি করছে। নদীর পানি বর্ষাকালে পরিষ্কার থাকে, তাই শাকসবজি ধোয়া হয়। আমার কাছে এই পানিকে পরিষ্কারই মনে হয়েছে। তাই শাকসবজি নিয়মিত ধোয়া হয়।’
লোহাই বাজারের সবজি বিক্রেতা ফারুক হোসেন বলেন, আশপাশের গ্রাম থেকে শাকসবজি সংগ্রহ করে বাজারের অদূরে ডোবায় জমে থাকা পানিতে ধোয়া হয়। এখানে শুধু আমি না বাজারের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী এখানে শাকসবজি ধোয়ার পর হাটে নিয়ে বিক্রি করে।
এ ছাড়া গাজীপুর জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রির জন্য একাধিক নদী, খাল, নালা, বিল ও ডোবায় জমে থাকা ময়লাযুক্ত পানিতে সবজি ধোয়ার চিত্রও দেখা গেছে।
বরমী-শ্রীপুর আঞ্চলিক সড়কের লোহাগাছ রেলগেট এলাকায় দেখা যায়, সড়কের পাশে জমে থাকা ময়লাযুক্ত পানিতে এক ব্যক্তি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থামিয়ে সবজি ধুচ্ছেন। পরে ধোয়া সবজি সড়কের পাশেই স্তূপ করে রাখা হচ্ছে।
ক্রেতারা জানান, টয়লেট-সংলগ্ন নোংরা পানিতে সবজি ধোয়ার দৃশ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাদের দাবি, বাজারের টয়লেটের বর্জ্য লাইন নদীতে সংযুক্ত থাকায় ওই পানি আরও ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টয়লেটের পাশের পানিতে পেটের পীড়া সৃষ্টিকারী সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়াসহ নানা ক্ষতিকর জীবাণু থাকতে পারে। এ ছাড়া কারখানার বর্জ্যে মিশ্রিত পানিতে থাকে নানা ভারী ধাতু। দীর্ঘ মেয়াদে এই ভারী ধাতু ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাফিজুল হক বলেন, ‘ময়লা পানিতে সবজি ধোয়ার বিষয়টি আমি জেনেছি। ঘটনাস্থলের পাশেই বাজারের টয়লেট রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
বেসরকারি সংস্থা নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, ‘দূষিত নদী, খাল, নালা কিংবা ডোবার পানিতে ধোয়া সবজিতে হেভি মেটালসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান থাকার আশঙ্কা থাকে। এ ধরনের সবজি মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। দূষিত পানি দিয়ে যাতে কোনোভাবেই সবজি ধোয়া না হয়, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ময়লা বর্জ্য কেমিক্যাল মিশ্রিত পানিতে শাকসবজি ধোয়ার ফলে এই সবজি খেলে মানবদেহের নানা ধরনের জটিল এবং কঠিন রোগের দেখা দেয়। ময়লা বর্জ্য পানিতে থাকা ব্যাকটেরিয়া থাকে। যার ফলে টাইফয়েড কমন ব্যাপার। এ ছাড়া লিভার ক্যানসার হতে পারে। এটি মারাত্মক উদ্বেগের বিষয়। এটি তীব্র মাঝারি বা মৃদু নয়। এটি মারাত্মক ঝুঁকি।’




























