রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা: সাড়ে ৬ বছরে ঝরেছে ১৫ সহস্রাধিক প্রাণ


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: আগস্ট ৮, ২০২৬, ০৩:০৩ পিএম
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা: সাড়ে ৬ বছরে ঝরেছে ১৫ সহস্রাধিক প্রাণ

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা: সাড়ে ৬ বছরে ঝরেছে ১৫ সহস্রাধিক প্রাণ
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩ হাজার ৫৪৮টি দুর্ঘটনায় মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে, ৫ হাজার ৪৯৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। এছাড়া ভারী যানবাহনের ধাক্কায় ৬ হাজার ৩১৪টি এবং অন্যান্য কারণে ৭০৬টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে।
দেশে সাড়ে ছয় বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ১৪৩ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৬ হাজার ৬৫টি দুর্ঘটনায় এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
এর মধ্যে ২০২০ সালে ১ হাজার ৩৮১টি দুর্ঘটনায় নিহত ১ হাজার ৪৬৩ জন, ২০২১ সালে ২ হাজার ৭৮টি দুর্ঘটনায় নিহত ২ হাজার ২১৪ জন, ২০২২ সালে ২৯৭টি দুর্ঘটনায় নিহত ৩ হাজার ৯১ জন, ২০২৩ সালে ২ হাজার ৫৩২টি দুর্ঘটনায় নিহত ২ হাজার ৪৮৭ জন, ২০২৪ সালে ২ হাজার ৭৬১টি দুর্ঘটনায় নিহত ২ হাজার ৬০৯ জন, ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২৯টি দুর্ঘটনায় নিহত ২ হাজার ৬৭১ জন, আর ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ৩১১টি দুর্ঘটনায় নিহত ১ হাজার ১৭৭ জন।
 শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে সংস্থাটি। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩ হাজার ৫৪৮টি দুর্ঘটনায় মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে, ৫ হাজার ৪৯৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। এছাড়া ভারী যানবাহনের ধাক্কায় ৬ হাজার ৩১৪টি এবং অন্যান্য কারণে ৭০৬টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে।
এসব দুর্ঘটনার জন্য ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল চালক এককভাবে দায়ী, ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ দুর্ঘটনায় বাসের চালক দায়ী, পণ্যবাহী যানবাহন দায়ী (ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি ইত্যাদি) ৪০ দশমিক ৩৪ শতাংশ ঘটনায়, প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস-অ্যাম্বুলেন্স-জিপ দায়ী ২ দশমিক ৭২ শতাংশ ঘটনায়, থ্রি-হুইলার দায়ী ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ ঘটনায়, বাইসাইকেল ও রিকশা দায়ী দশমিক ৭৬ শতাংশ ঘটনায় এবং ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য পথচারী দায়ী।
দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে জাতীয় মহাসড়কে ঘটেছে ৪ হাজার ৭৭৩টি, আঞ্চলিক সড়কে ৬ হাজার ৬৮৯টি, গ্রামীণ সড়কে ১ হাজার ৯৫৭টি এবং শহরের সড়কে ২ হাজার ৬৪৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, বাংলাদেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের ৭১ শতাংশ মোটরসাইকেল, যার একটি বড় অংশ চালায় কিশোর-যুবকরা। তাদের মধ্যে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা বাড়ছে। এক্ষেত্রে মোটরসাইকেল উৎপাদন ও বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপনের ভাষা-ভঙ্গি কিশোর যুবকদের অতিরিক্ত গতিতে বাইক চালাতে উৎসাহিত করছে। তারা গতির মধ্যে রোমাঞ্চ অনুভব করে। ফলে বাইক চালকরা নিজে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং পথচারী-সহ অন্যান্য সড়ক ব্যবহারকারীদের আক্রান্ত করছে। বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালকদের অধিকাংশই শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। তারাও বেপরোয়া যানবাহন চালিয়ে মোটরসাইকেলে চাপা-ধাক্কা দিয়ে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছেন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের ৫৮ শতাংশ ১৩ থেকে ৩৫ বছর বয়সী। মোটরসাইকেল ৪ চাকার যানবাহনের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু দেশে গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত ও সহজলভ্য না হওয়া এবং যানজটের কারণে মানুষ মোটরসাইকেল ব্যবহারে উৎসাহিত হচ্ছেন। ফলে দুর্ঘটনা বাড়ছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বৃদ্ধির একটি অন্যতম কারণ মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার না করা। মানসম্পন্ন হেলমেট দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৮% কমায়।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, কিশোর-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, রাজনীতিতে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর সংস্কৃতি, ট্রাফিক আইনের দুর্বল প্রয়োগ, সচেতনতামূলক কর্মসূচি না থাকা, ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্বল সড়ক অবকাঠামো, প্রযুক্তির ব্যবহার ও নজরদারীর অভাব, সহজ-সাশ্রয়ী গণপরিবহনের ঘাটতি, ও অসহনীয় যানজট- এগুলোই মূলত এসব দুর্ঘটনার পেছনের কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
দুর্ঘটনা রোধে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছে, যার মধ্যে রয়েছে—মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার করা, মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা, বিটিআরসির মাধ্যমে সোশা মিডিয়ায় নিরাপত্তামূলক প্রচারণা চালানো, মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের ভাষা-ভঙ্গি পরিবর্তন করা, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করা এবং সহজ-সাশ্রয়ী যাত্রীবান্ধব গণপরিবহন চালু করা।

Link copied!