আটত্রিশ দিনের সাইকেলযাত্রায় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছেছেন রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের ছেলে বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা। তার সেই রোমাঞ্চকর অভিযানের গল্প শুনিয়েছেন ইশতিয়াক হাসান
বীর কুমার পাহাড়ের মানুষ। তবে রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের পাহাড় আর হিমালয়ের উঁচু পর্বতমালার মধ্যে যোজন যোজন ব্যবধান। তবে এই বাধাকে থোড়াই কেয়ার করে প্রথম বাংলাদেশি সাইক্লিস্ট হিসেবে কক্সবাজার সৈকত থেকে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছেছেন বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা।
চলতি বছরের ১৬ আগস্ট কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের জিরো পয়েন্ট থেকে নিজের স্বপ্নের যাত্রা শুরু করেছিলেন ৩০ বছর বয়সী এ যুবক। রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার সন্তান তিনি; ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। এর আগে দেশের ৬৪ জেলা এবং ভারতের ১০টি রাজ্য সাইকেলে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা থাকলেও হিমালয়ের উচ্চতা জয় করার এই চ্যালেঞ্জ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা ও বহু গুণ কঠিন।
পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর ও ভারতের শিলিগুড়ি করিডর পার হয়ে নেপালের বন্ধুর পথে প্রবেশ করেন তিনি। এরপর শুরু হয় প্রকৃতির আসল পরীক্ষা। হিমালয়ের দুর্গম পথে সাইকেল চেপে এবং কখনো সাইকেল কাঁধে নিয়ে বৃষ্টি, তুষারপাত, তীব্র ঠান্ডা হাওয়া আর অক্সিজেনের স্বল্পতাজনিত শ্বাসকষ্ট উপেক্ষা করে এগিয়ে চলেন পাহাড়ের এই সন্তান। প্রতিটি প্যাডেল ঘুরছিল একটি বিশেষ বার্তা নিয়ে, ‘রক্তদান ও জলবায়ু ন্যায়বিচারের সচেতনতা।’
চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে হিমালয়ের বুকে একের পর এক কঠিন শৃঙ্গ ও পাস জয় করেন বীর কুমার।
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ৫ হাজার ৮৩ মিটার উচ্চতার নাংকারশাং পিক সামিট করেন। পরের দিন ৫ হাজার ৫৫০ মিটার উচ্চতার চুকাং রি পিকের পৌঁছান। আর ২১ সেপ্টেম্বর দুপুরে অতিক্রম করেন অন্যতম দুর্গম পাস কংমা লা পাস, যার উচ্চতা ৫ হাজার ৫৩৫ মিটার।
অবশেষে সব বাধা পেরিয়ে আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর সোয়া ২টায় ৩৮ দিনের দীর্ঘ যাত্রা শেষে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫ হাজার ৩৬৪ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পা রাখেন বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা। স্থলপথে সাইকেল চালিয়ে এই উচ্চতায় পৌঁছানোর মাধ্যমে তিনি রচনা করেন নতুন এক ইতিহাস। ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশে তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা মাত্র ৪৫ হাজার ৯৭২ জন (জনশুমারি ২০২২)। এই ছোট্ট জনগোষ্ঠীর বুকভরা আশা আর দেশের পতাকা নিয়ে তার এই অর্জন পুরো জাতির জন্যই এক গর্বের মুহূর্ত।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডর সাবেক চেয়ারম্যান নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা শুরু থেকেই উৎসাহ জুগিয়ে এসেছেন বীর কুমারকে। তিনি বলেন, ‘আমি শুরুর থেকেই ওর অভিযানের বিষয়ে একের পর এক পোস্ট দিয়ে গিয়েছি ফেসবুকে। এবার নেপাল যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে ঢাকার বাসায় দেখা করে বীর। তখন হাসতে হাসতে বলেছিলাম, ওই দুরারোহ ট্রেইলে দেখা যাবে, সাইকেলে চড়ার বদলে তোমাকেই সাইকেল কাঁধে নিয়ে যেতে হচ্ছে। ও বলেছিল, সমস্যা নেই, আমি পারব। সত্যি সে এভারেস্টে বেস ক্যাম্পে পৌঁছে গেল। স্পন্সর না পাওয়াতে তার একটা আক্ষেপ ছিল। আশা করি, এখন সামনের অভিযানগুলোতে এ সমস্যাও কেটে যাবে।’
বীর অবশ্য এখানেই থেমে থাকতে চান না, তার লক্ষ্য আরও অনেক বড়। তালিকায় আছে সাইকেলে সার্কভুক্ত সব দেশ ভ্রমণও। আমরাও আশা করি, কাপ্তাইয়ের পাহাড়ে বড় হওয়া এই যুবক পাহাড়সম সব প্রতিকূলতা এবং উঁচু সব পর্বত পেরিয়ে পৌঁছাবেন একের পর এক লক্ষ্যে।




































