সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি বছরের শেষে কিংবা আগামী জানুয়ারিতেই অনুষ্ঠিত হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবারের নির্বাচনের আগেই নানা ধরনের কূটকৌশলে ব্যস্ত সময় পার করছে দেশের বড় দুইটি রাজনীতিক দল। তবে গুরুত্ব পাচ্ছে ইসলামি দল ও সংগঠনগুলো। ইতোমধ্যে তাদের কাছে টানতে নানা তৎপরতা শুরু হয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রায় এক বছর বাকী থাকলেও ক্ষমতায় থাকা দল আওয়ামী লীগ এবং রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি ছাড়াও অন্য রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে কাছে নিতে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে। শুধু তাই নয়, নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই কদর বাড়ছে। আওয়ামী লীগ যেকোনো মূল্যে তার নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে ইসলামি দল ভেড়ানোর চেষ্টা করছে। যারা এখন আছে তাদের অন্তত একটি আসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জোটে ধরে রাখারও চেষ্টা করছে।
আর জাতীয় সরকারে রাখার কথা বলে বিএনপি আন্দোলনে টানছে ইসলামি দল ও সংগঠনগুলোকে। এ সুযোগে তারাও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে দরকষাকষির চিন্তা করছে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে রয়েছে খেলাফত মজলিস ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (একাংশ)। আর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে রয়েছে তরিকত ফেডারেশন।
ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস একসময় বিএনপির জোটে ছিল। বর্তমানে তারা স্বতন্ত্র অবস্থানে। যদিও এখনও খণ্ডিত একটি অংশ ২০ দলে রয়েছে। সংগঠন দুটি স্বতন্ত্রভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বিএনপি ইতিমধ্যে কয়েক দফা সংলাপ করে কয়েকটি ইসলামি দলকে তাদের ছায়াতলে নিয়েছে। আরও কয়েকটি দলকে নানাভাবে বুঝিয়ে বশে আনার চেষ্টা করছে। বিএনপির বড় মিত্র জামায়াতে ইসলামী যুগপৎ আন্দোলনে (কৌশলে) ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামছে।
দলের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, “আমরা যেহেতু যুগপৎ আন্দোলনে আছি, কর্মসূচিও একই হবে। একই দিনে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে নিজ নিজ ব্যানারে গণমিছিল করবে। বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করে কর্মসূচি ও জায়গা ঠিক করা হবে। কেউ কারও কর্মসূচিতে অংশ নিবে না।”
সর্বশেষ ১০ ডিসেম্বর ২০ দলীয় জোটের শরিক এনডিপির (ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম) চেয়ারম্যান কারী মোহাম্মদ আবু তাহের, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল রকিব, মুসলিম লীগের মহাসচিব শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম, বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টির মহাসচিব অ্যাডভোকেট আবুল কাশেম যৌথ বিবৃতিতে বিএনপির সঙ্গে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন।
তবে এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “একমাত্র আওয়ামী লীগ ছাড়া আর সব দলের জন্য তাদের দরজা খোলা রয়েছে। তাই ২০ দল ছাড়াও ডান, বাম ও ইসলামিসহ সবাইকে যুগপৎ আন্দোলনে আনার চেষ্টা করছি। আর ইসলামি দলগুলোকে ধরে রাখতে মরিয়া আওয়ামী লীগ। যদি তা সম্ভব না হয়, সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের চাওয়া-ইসলামি দলগুলো আলাদা নির্বাচন করুক। তবুও বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে যেন অংশ না নেয়।”
এ বিষয়ে কথা হয় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ঢাকা মহানগর ১৪ দলীয় জোটের প্রধান সমন্বয়ক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রমের সঙ্গে। তিনি বলেন, “ইসলামি দলের মধ্যে আমাদের সঙ্গে তরিকত ফেডারেশন আছে। তারা মুক্তিযুদ্ধ ও আমাদের আদর্শকে ধারণ করে। এর বাইরে ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী ইস্যুতে আলাপ-আলোচনা হতে পারে, তবে তারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ধারণ করে কি না সেটি দেখার বিষয়।”
একক শক্তিশালী সংগঠন ইসলামী আন্দোলন
বর্তমানে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সংগঠন শক্তিশালীকরণে জোর দিচ্ছেন দলের আমির মুফতি সৈয়দ রেজাউল করিম। দলীয় সরকারের অধীনে হওয়ায় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি দলটি। তবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯৯ আসনে প্রার্থী দেয়। অনিয়মের অভিযোগে নির্বাচনের দিন ভোট বর্জন করে। বর্তমানে ইসলামী আন্দোলন বিভিন্ন ইস্যুতে মাঠে সরব।
ইসলামী আন্দোলনের ১৯ দফা
সর্বশেষ গত ২ জানুয়ারি রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত জাতীয় সম্মেলনে ১৯ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছেন দলটির যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান। তিনি বলেন, “জনমতের ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র ও জনপ্রশাসনের সংস্কার, অর্থনীতি-শিল্প-কৃষি ও জ্বালানি খাতে বিদ্যমান দুর্নীতি-অনিয়ম দূর করে স্বনির্ভর এনার্জি সেক্টর নির্মাণসহ ১৯ দফা প্রস্তাব দিয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ নবীন হলেও আমাদের রয়েছে হাজার বছরের গৌরবময় ইতিহাস, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং বিস্ময়কর যাত্রার অভিজ্ঞতা।”
অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম
বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম নিজেদের শুরু থেকে অরাজনৈতিক দাবি করে আসছে। কিন্তু তাদের সংগঠনের বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত। তবে সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব মুহিউদ্দিন রাব্বানি জানান, নির্বাচনসহ বিভিন্ন সময় তাদের সংগঠনকে একটা রাজনৈতিক চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে তারা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন। ১৩ দফা নিয়ে দাবি নিয়ে তারা মাঠে আছেন। কোনো দলের সঙ্গে জোটে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। এমনকি কোনো ব্যক্তি বা দলকে সমর্থনও করবে না।
৩৯টির কার্যক্রম চললেও ইসির নিবন্ধন পেয়েছে ১০টি
দেশে ৩৯টি ইসলামি ও একটি ইসলামপন্থি দল সাংগঠনিকভাবে কার্যক্রম চললেও নির্বাচন কমিশন থেকে নিবন্ধন পেয়েছে ১০টি। এগুলো হলো- বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল), খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন ও জাকের পার্টি (ইসলামপন্থি)। এ ছাড়া নিবন্ধনের বাইরেও অনেক ধর্মভিত্তিক দল রয়েছে, যার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৪১টি। এরমধ্যে ১০টি রয়েছে ইসলাম ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগের ১৪ দলীয় জোটে রয়েছে একটি ইসলামি দল। বিএনপির ২০ দলীয় জোটেও রয়েছে তিনটি ইসলামি দল। এদিকে, সম্প্রতি গঠিত জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ‘সম্মিলিত জাতীয় জোটে’ যুক্ত হয়েছে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধতি কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল। এই জোটে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে নিবন্ধিত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ অনিবন্ধিত দলও রয়েছে।
২০১৩ সালের ১ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের এক রায়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করা হয়। দলটির নিবন্ধন নম্বর ছিল ১৪।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট প্রসঙ্গে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা মহাজোটের সঙ্গে আছি। নির্বাচনের আগে মহাজোট সক্রিয় হবে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। ছোট দলগুলো নিজেদের সুযোগ-সুবিধার জন্য বিভিন্ন জোটে যায়। বড় দলগুলোও নির্বাচনে প্রভাব বাড়াতে ছোট দলগুলোকে জোটে টানে।”






























