বাজারে পদ্মার ইলিশের সংকট


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: আগস্ট ২১, ২০২৬, ০১:৩৫ পিএম
বাজারে পদ্মার ইলিশের সংকট

বাজারের ডালায় বরফের আবরণে সাজানো বিভিন্ন আকারের ইলিশ। আড়তে থরে থরে সাজানো এসব মাছের দৈহিক গঠনেও আছে ভিন্নতা। কোনোটি সাধারণ আকৃতির, আবার কোনোটি তুলনামূলক কিছুটা লম্বাটে। তবে এত ইলিশ থাকলেও বাজারে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ‘পদ্মার ইলিশ’।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর অন্যতম প্রধান পাইকারি ও খুচরা বাজার কারওয়ান বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতারা ঘুরে ঘুরে পদ্মার ইলিশ খুঁজলেও পাচ্ছেন না; বাধ্য হয়ে অন্য অঞ্চল থেকে আসা মাছ কিনেই বাড়ি ফিরছেন।

কথা হয় সেখানকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। কথা বলে জানা যায়, বাজারে বর্তমানে যে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে, তার সিংহভাগই চাঁদপুরের মোহনা, মেঘনা নদী এবং বরিশাল অঞ্চল থেকে আসা।

কারওয়ান বাজারের ইলিশ ব্যবসায়ী মো. আয়নাল মিয়া বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই বাজারে আসল পদ্মার ইলিশ আসছে না। পদ্মার ইলিশের যা সরবরাহ থাকে, তা চাঁদপুর ঘাটে পৌঁছানোর পরই শেষ হয়ে যায়। ঢাকার বাজার পর্যন্ত পৌঁছায় না। অনেক বিক্রেতা পদ্মার ইলিশ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও তা সত্য নয়। আমরা ক্রেতাদের কাছে মিথ্যা বলি না, জিজ্ঞেস করলেই আসল সত্যটা জানিয়ে দিই।’

তবে বাজারে ইলিশের অতিরিক্ত দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ক্রেতারা। মাছ কিনতে আসা সরকারি চাকরিজীবী মো. আহসান হাবীব বলেছেন, ‘অন্যান্য বছর এই সময়ে ইলিশের দাম তুলনামূলক সহনীয় থাকে। কিন্তু এবার দাম আকাশছোঁয়া। চড়া দাম দিয়েও পদ্মার ইলিশ পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে বেশি দামেই বরিশালের ইলিশ কিনলাম।’

বাজার ঘুরে দেখা যায়, আকারভেদে প্রতি কেজি/দেড় কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার টাকায়, ১২০০ গ্রামের ইলিশ ২ হাজার ৭০০ টাকা, এক কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৬০০ টাকা এবং ৮০০ গ্রামের ইলিশ ২ হাজার ৪০০ টাকায়। এ ছাড়া ৭০০ গ্রাম ২ হাজার ২০০ টাকা, ৫০০ গ্রামের ইলিশ ১৮০০ টাকা, ৩০০ গ্রামের ইলিশ ১৬০০ টাকা এবং ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৪০০ টাকা কেজি দরে।

ঢাকার বাজারে পদ্মার ইলিশ না পৌঁছানোর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন চাঁদপুর বড়স্টেশন মাছঘাটের ব্যবসায়ী নবীর হোসেন। তিনি জানান, ঘাটে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলে তবেই তা ঢাকায় পাঠানো সম্ভব হয়। কিন্তু বর্তমানে চাঁদপুরসংলগ্ন পদ্মা নদীতে মাছের আহরণ অনেক কম। ফলে স্থানীয় বাজার ও অনলাইন অর্ডারের চাহিদা মেটাতেই তা শেষ হয়ে যায়। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চল বা সামুদ্রিক ইলিশের তুলনায় চাঁদপুর ও পদ্মার ইলিশের স্বাদ ও কদর বেশি থাকায় এর দামও কিছুটা বেশি থাকে।

চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী মোহাম্মদ শবে বরাত সরকার আগামীর সময়কে জানান, সরবরাহ ভালো থাকলে চাঁদপুর থেকে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ মণ মাছ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। তবে বর্তমানে সংকট চলায় দেশের অন্যান্য স্থানে চালান পাঠানো অনেকটাই কমে গেছে।

এদিকে নদীতে ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ার পেছনে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট নানা কারণ চিহ্নিত করেছে মৎস্য বিভাগ। নদীতে ডুবোচর সৃষ্টি, নাব্যতা-সংকট, শিল্পবর্জ্যে পানি দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইলিশ তার স্বাভাবিক বিচরণ পথ পরিবর্তন করছে।

ইলিশের এই সংকট ও সরবরাহ হ্রাসের মূল কারণ অনুসন্ধানে গত সোমবার চাঁদপুরে কাজ করছে ৫ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বর্তমান ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমানের নেতৃত্বে এ অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।

গবেষক ড. আনিসুর রহমানের মতে, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে নদীতে বড় ইলিশের চেয়ে ছোট ইলিশের সংখ্যা বেশি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নদীর সামগ্রিক পরিবেশ, পানির প্রবাহ, মাছের চলাচলের পথ ও প্রাকৃতিক পরিবর্তন বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। গবেষণা শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্তসহ মৎস্য অধিদপ্তরে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।

Link copied!