বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিনিয়োগ সহযোগিতাসহ ১৩টি সমঝোতা (এমওইউ) স্মারক সই হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের উপস্থিতিতে এসব স্মারক সই হয়।
এর আগে দুই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বিনিয়োগ সহযোগিতায় চারটি চুক্তি ও বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি, গণমাধ্যম খাতে সহযোগিতা জোরদারে বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে চারটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এ ছাড়া গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ, হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের ডিফারেন্ট কো-অপারেশন প্ল্যান, বাংলাদেশ থেকে জাতীয় ফল কাঁঠালের রপ্তানি, চীনের ভাষা ম্যান্ডারিন স্কুল কারিকুলামে যুক্ত করা এবং টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল এডুকেশন কো-আপরেশনে পৃথক দুটি এমওইউ স্বাক্ষর হয়েছে। এ ছাড়া চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়।
সমঝোতা স্মারকে সই করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের উপস্থিতিতে চীনের সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি ও চায়না মিডিয়া গ্রুপের (সিএমজি) প্রধানদের সঙ্গে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে সমঝোতা স্মারকগুলোতে স্বাক্ষর করেছেন তথ্যমন্ত্রী। স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকগুলোর আওতায় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সংবাদ ও তথ্য বিনিময়ে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, গণমাধ্যম খাতে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারি, গ্লোবাল সাউথভুক্ত গণমাধ্যম বিষয়ে যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সম্প্রচার ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।
এই সমঝোতা স্মারকগুলো দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরো সুদৃঢ় করবে এবং গণমাধ্যম ও তথ্য খাতে পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া বিনিয়োগ সহায়তায় চারটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে—বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের পাশে চীন-বাংলাদেশ মোংলা পোর্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল সম্পর্কিত একটি চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে China Civil Engineering Construction Corporation (CCECC)-এর সঙ্গে স্বাক্ষর ও বিনিময় করা হয়। বাংলাদেশে বিনিয়োগ প্রচার, ব্যাবসায়িক সংযোগ বৃদ্ধি এবং চীনা বিনিয়োগকারীদের সহায়তা জোরদার করতে বিডা এবং সিসিপিআইটির মধ্যে একটি সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়।
এ ছাড়া কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে Handa Industries Ltd.-এর অনুকূলে জমির প্রভিশনাল অ্যালটমেন্ট সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সেখানে ২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে একটি কারখানা স্থাপন করবে, যা প্রায় ১৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি হবে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির দ্বিতীয় কারখানা। গত বছর প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে তাদের প্রথম কারখানা স্থাপন করে, যেখানে প্রায় ১২ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেএমকে, হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজসহ বিভিন্ন শীর্ষ চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকও করেন এবং বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
গতকাল সন্ধ্যায় চীনের বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ‘১৩টি মোমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যাডিংয়ের মধ্যে রয়েছে—ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন কিভাবে আমরা গ্রিন ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে প্রমোট করতে পারি, জয়েন্ট অ্যাকশন প্ল্যানের বিষয়ে কথা হয়েছে। বাংলাদেশের এক্সপোর্ট ক্যাপাসিটি বাড়িয়ে যেন চীনে আমরা রপ্তানি করতে পারি এবং বিভিন্ন ডেভেলপমেন্টাল কো-অপারেশন নিয়ে কথা হয়েছে। কনসেশনাল লোন অর্থাৎ বাংলাদেশে যে ঋণটা চীন থেকে যাচ্ছে, সেখানে কিভাবে আমরা ইন্টারেস্ট রেট কমাতে পারি, গ্রেস পিরিয়ড বাড়াতে পারি, সেটি নিয়ে কথা হয়েছে।’
মাহদী আমিন আরো বলেন, ‘ব্রিকসে বাংলাদেশ যুক্ত হওয়ার বিষয়ে চীন ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আমাদের (বাংলাদেশের) ব্রিকসে সম্পৃক্ততার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং ব্রিকসে বাংলাদেশের সংযুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে উনারা (চীন) ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন, সেটি বলেছেন।’
ব্রিকস হলো উদীয়মান অর্থনীতির পাঁচটি দেশ। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও সাউথ আফ্রিকার প্রথম অক্ষরের সমন্বয়ে নামকরণ করা একটি জোট এই ব্রিকস।
তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ অর্থাৎ যার অধীনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামগ্রিক এলাইনমেন্ট রিলেটেড ম্যানপাওয়ার ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট রিলেটেড যে কাজগুলো আছে, সেগুলো নিয়ে এমওইউ হয়েছে। একই সঙ্গে হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের একটা ডিফারেন্ট কো-অপারেশন প্ল্যান সাইন করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠালের রপ্তানি বিষয়ে একটা এমওইউ হয়েছে।’
মাহদী আমিন বলেন, ‘একই সঙ্গে চীনা ভাষা ম্যান্ডারিন বাংলাদেশে আমরা শুরু করতে যাচ্ছি। আমাদের স্কুল কারিকুলামে সেটি এবং টেকনিক্যাল এবং ভোকেশনাল এডুকেশন কো-আপরেশনে দুটি পৃথক এমওইউ হয়েছে। মিডিয়ার ক্ষেত্রে কিভাবে দুই দেশের কোলাবোরেশন বাড়ানো যায়, থিংক ট্যাংক ফোরাম নিয়ে আমরা কিভাবে সামনের দিকে আগাতে পারি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত টিভি চ্যানেল এবং নিউজ পেপারের বিষয়ে চারটা এমওইউ হয়েছে।’
বিনিয়োগসংক্রান্ত সমঝোতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ বোর্ড বিডার সঙ্গে এর পাশাপাশিভাবে পৃথকভাবে আমাদের চট্টগ্রামের আনোয়ারা এবং মোংলাতে কিভাবে বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, সেখানে ইকোনমিক জোন দিয়ে আমরা কিভাবে বাংলাদেশের নতুন চীনা ফ্যাক্টরি, চীনা প্রোডাকশন ফ্যাসিলিটি এবং তার মাধ্যমে এমপ্লয়মেন্ট জেনারেট করতে পারি, সেগুলো নিয়ে পৃথক এমওইউ হয়েছে।’ এর আগে গতকাল সকালে বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘তিয়াওইউথাই’-এ চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এ সমঝোতায় সই করেন দলের যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক) এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাই সিং এই সমঝোতায় সই করেন।
সমঝোতার আওতায় দুই দলের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে গণমাধ্যম, থিংক ট্যাংক, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির এ নেতা।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বেইজিংয়ের গ্রেট হলে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং। গতকাল বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘তিয়াওইউথাই’ থেকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে গ্রেট হলে এসে পৌঁছালে চীনের প্রধানমন্ত্রী তাঁকে স্বাগত জানান। শুভেচ্ছা বিনিময় এবং দুই দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিচয় পর্বের পরে প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা দিয়ে অভিবাদন মঞ্চে নিয়ে যান লি ছিয়াং। অভিবাদন মঞ্চে তারেক রহমান ও লি ছিয়াংকে সশস্ত্র সালাম দেয় চীনের সশস্ত্র বাহিনীর সুসজ্জিত একটি চৌকস দল। এ সময় দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিবাদন জানিয়ে তোপধ্বনি দেওয়া হয়। পরে দুই প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীর প্যারেড পরিদর্শন করেন। এরপর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।


































