প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরে আলোচনায় কী থাকবে


সংবাদ প্রকাশ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরে আলোচনায় কী থাকবে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের শীর্ষ বৈঠক শেষে ২৬ জুন যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করতে যাচ্ছে দুই দেশ। ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তির পর এটা হবে দুই দেশের মধ্যে তৃতীয়বার যৌথ ইশতেহার ঘোষণা।

বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরে এবার ১২টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হবে। আলোচনায় আসবে বিভিন্ন খাতের প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন ও সহযোগিতার প্রসঙ্গগুলো। তবে যৌথ ইশতেহার ঘোষণার সিদ্ধান্ত থেকে এটা স্পষ্ট যে এবারের সফরে রাজনৈতিক এবং ভূকৌশলগত অংশীদারত্বের বিষয়গুলোতে বিশেষ গুরুত্ব থাকবে।

প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী সোমবার রাতে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে পাঁচ দিনের সফরে চীনে পৌঁছাবেন।

সফরসঙ্গী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন প্রমুখ।


১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর নিউইয়র্কে এবং ২০০৫ সালে বাংলাদেশ ও চীনের প্রধানমন্ত্রীদের বৈঠকের পর সম্পর্কের তিন দশক পূর্তিতে বেইজিংয়ে দুই দেশ যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করেছিল। এবার পাঁচ দশক পূর্তির পর নতুন ইশতেহার ঘোষণার প্রস্তুতি দুই দেশের সম্পর্কের রাজনৈতিক গুরুত্বকে সামনে আনছে।

ঢাকা ও বেইজিংয়ের কূটনৈতিক সূত্রগুলো প্রথম আলোকে জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেইজিং সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তিনি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে। পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাউ লেজি সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এটি হবে প্রথম চীন সফর। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর সফরে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) তিন শীর্ষ নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের বার্তাটি স্পষ্ট।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সফর সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। সিপিসির আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান লিউ হাইসিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এ ছাড়া সিপিসির জাদুঘর পরিদর্শন করবেন তারেক রহমান।

বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরে এবার ১২টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হবে। আলোচনায় আসবে বিভিন্ন খাতের প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন ও সহযোগিতার প্রসঙ্গগুলো।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতির চারটি উদ্যোগের অন্যতম জিডিআই বা বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগে বাংলাদেশের যুক্ততার ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে।

উন্নয়নকে কেন্দ্রে রেখে টেকসই উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে সহযোগিতার বিকাশে ২০২১ সালে জিডিআই ঘোষণা করেন সি চিন পিং। পাঁচ বছর ধরে চীন এতে বাংলাদেশকে যুক্ত হতে অনুরোধ জানিয়ে আসছে। জিডিআইয়ে বাংলাদেশে যুক্ততার বিষয়ে একটি সমঝোতা সইয়ের জন্য চূড়ান্ত হয়েছে। এটি সই হলে প্রায় ১০ বছর পর চীনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো বৈশ্বিক উদ্যোগে বাংলাদেশ যুক্ত হবে। এর আগে ২০১৬ সালের অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশ বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) যুক্ত হয়েছিল। ওই সফরের সময় বিআরআইয়ে দুই দেশের সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল।

কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরটি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
জেনেভায় বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো মোহাম্মদ সুফিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, অতীতে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা অনেকাংশে প্রকল্পনির্ভর ছিল। বন্ধুত্ব শুধু আর্থিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে এগোতে পারে না। সেটা এগিয়ে যায় রাজনৈতিক পরিসরে গভীর সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তাবিত বৈঠকগুলোতে গভীর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার আভাস আছে।

কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরটি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করবে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে ভারত আর যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা গোপন বিষয় নয়। ফলে দেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে ত্রিমুখী ভারসাম্য বজায় রেখে চলাটা বাংলাদেশের জন্য জরুরি।

‘সামার ডাভোসে’ অংশগ্রহণ
মাসখানেক আগে ২৩ থেকে ২৬ জুন সূচি ধরে প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরটি এখন হচ্ছে ২২ থেকে ২৬ জুন।

প্রধানমন্ত্রী ২৩ জুন সারা দিন এবং ২৪ জুন মধ্যাহ্নভোজের আগপর্যন্ত দালিয়ানে ব্যস্ত সময় কাটাবেন। ‘সামার ডাভোস’ হিসেবে পরিচিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সভায় যোগ দিতে তিনি সেখানে অবস্থান করবেন। ২৩ জুন বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যালোইস জুইনজি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। বিকেলে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে আয়োজিত এক আলোচনায় অংশ নেবেন। সন্ধ্যায় সামার ডাভোসের অতিথিদের সম্মানে চীনের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নৈশভোজে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। পরদিন অর্থাৎ ২৪ জুন তিনি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক বৈঠকে যোগ দেবেন। ওই দিন বিকেলে তিনি বেইজিংয়ের উদ্দেশে দালিয়ান ছেড়ে যাবেন।

বৈঠক শেষে দুই নেতার উপস্থিতিতে চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও প্রটোকল সই হবে। এরপর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে দেওয়া চীনের প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজে যোগ দেবেন তারেক রহমান।
বেইজিংয়ে দুই দিনের ব্যস্ত সূচি
২৫ জুন সকালে বাংলাদেশ বিনিয়োগ ফোরামে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের কর্মসূচি শুরু হবে। পরে চীনের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান চেরি গ্রুপ, হানদা গ্রুপ ও চায়নাট্যাক্স করপোরেশনের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাদাভাবে দেখা করবেন। এরপর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সিপিসির আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান লিউ হাইসিং, চীনের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থার (সিডকা) চেয়ারম্যান চেন শিয়াওডং এবং এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়নার (চায়না এক্সিম ব্যাংক) চেয়ারম্যান চেন হুয়াইউ সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।

ওই দিন বিকেলে গ্রেট হল অব পিপলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে। বৈঠক শেষে দুই নেতার উপস্থিতিতে চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও প্রটোকল সই হবে। এরপর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে দেওয়া চীনের প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজে যোগ দেবেন তারেক রহমান।

মনুমেন্ট অব দ্য পিপলস হিরোজে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেইজিং সফরের দ্বিতীয় দিন শুরু করবেন। পরে গ্রেট হল অব পিপলে তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাউ লেজি। এরপর তিনি বৈঠক করবেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে। ওই বৈঠক শেষে তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জাদুঘর পরিদর্শন করবেন। ওই দিন বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সফরসঙ্গীদের নিয়ে বেইজিং থেকে ঢাকার পথে যাত্রা করবেন।

সইয়ের জন্য প্রস্তুত করা চুক্তি তিনটি হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সংস্কারের বিষয়ে রূপরেখা চুক্তি এবং চীনা ভাষায় শিক্ষার বিষয়ে সহযোগিতা।

সম্ভাব্য চুক্তি ও সমঝোতা
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, প্রতিনিধি পর্যায়ের আলোচনা শেষে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে চুক্তি, সমঝোতা স্মারক, প্রটোকলসহ ১৫টির বেশি দলিল সইয়ের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে।

সইয়ের জন্য প্রস্তুত করা চুক্তি তিনটি হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সংস্কারের বিষয়ে রূপরেখা চুক্তি এবং চীনা ভাষায় শিক্ষার বিষয়ে সহযোগিতা।

সমঝোতা স্মারকের তালিকায় আছে বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ (জিডিআই) বাস্তবায়নের বিকাশ, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদন, ভূতাত্ত্বিক জরিপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ, কারিগরি শিক্ষা, চায়না মিডিয়া গ্রুপের সঙ্গে পৃথকভাবে বিটিভি, বাসস ও বাংলাদেশ বেতার, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার সঙ্গে পৃথকভাবে বাসস ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সহযোগিতা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফর দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের যে স্তর, তাতে আরও নতুন মাত্রা যোগ করবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জিডিআইতে যোগ দিচ্ছে। ব্রিকস, এসসিও এবং আরসেপে যোগ দিতে চীনের সমর্থন পেতে চাইছে। দ্বিপক্ষীয় অনেক ক্ষেত্রে সহযোগিতা আগের চেয়ে বিস্তৃতি লাভ করছে। বড় পরিসরে বিনিয়োগের দ্বার উন্মোচিত হবে।

জাতীয় বিভাগের আরো খবর

Link copied!