নাফ নদীতে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে চাকমা শ্রমিক নিখোঁজ


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ১০:৪২ এএম
নাফ নদীতে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে চাকমা শ্রমিক নিখোঁজ

টেকনাফ-উখিয়া সীমান্তের নাফ নদী এলাকায় কাঁকড়া সংগ্রহ করতে গিয়ে এক চাকমা দিনমজুর নিখোঁজ হয়েছেন। পরিবারের দাবি, তাকে অপহরণ করা হয়েছে।

বুধবার সকাল ১০টার দিকে উখিয়ার পালংখালীর আঞ্জুমান পাড়া সীমান্তসংলগ্ন নাফ নদী এলাকায় কাঁকড়া সংগ্রহ করতে যান সা মুং চিং চাকমা। এরপর থেকে তিনি আর বাড়ি ফেরেননি বলে তার স্ত্রী ছাম্মিয়াউ তঞ্চঙ্গ্যা জানিয়েছেন।

সা মুং চিং চাকমা টেকনাফ উপজেলার লাম্বাঘোনা এলাকার বাসিন্দা উগবার ছেলে। এর আগে একইভাবে নিখোঁজ হওয়া আরও দুই চাকমা যুবকেরও এখন পর্যন্ত কোনো সন্ধান মেলেনি।

ছাম্মিয়াউ তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “আমার স্বামী অপহরণের শিকার হয়েছেন বলে আমরা সন্দেহ করছি। ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। আমরা খুব উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে আছি।”

এ ঘটনায় উখিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে উখিয়া থানার ওসি মো. মুজিবুর রহমান বলেন, “বিষয়টি নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা কাজ করছেন।”

একই থানার এসআই আব্দুল আজাদ বলছেন, “সীমান্ত এলাকায় নিখোঁজ হওয়ায় এবং এখন পর্যন্ত কোনো ক্লু না পাওয়ায় তদন্তে তেমন অগ্রগতি নেই। তবে আমরা কাজ করছি।”

দুই বছর আগে নিখোঁজ দুই যুবক

স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি নতুন ঘটনা নয়। প্রায় দুই বছর আগে একইভাবে কাঁকড়া ও মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন দুই চাকমা যুবক ছৈলা মং চাকমা ও ক্যমংখোএ তঞ্চঙ্গ্যা। এখনও তাদের কোনো সন্ধান মেলেনি।

৩০ বছর বয়সী ছৈলা মং চাকমা এবং ১৯ বছর বয়সী ক্যমংখোএ তঞ্চঙ্গ্যা টেকনাফ উপজেলার ১ নম্বর হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের লম্বাঘোনা চাকমা পল্লীর বাসিন্দা।

ছৈলার ভাই পিরামং চাকমা বলেন, ২০২৪ সালের ১৬ মে সকাল ৭টার দিকে টেকনাফ থানার হাউস দ্বীপের পাশে ৫ নম্বর গেইট সংলগ্ন নাফ নদীতে কাঁকড়া আহরণ করতে গিয়ে তার ভাই ও ক্যমংখোএ নিখোঁজ হন।

তিনি বলেন, “ওই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক প্রত্যক্ষদর্শী আমাদের জানিয়েছিলেন, তাদের সেখানে আটকে রাখা হয়েছে। ধারণা করছি, কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তাদেরকে ধরে রেখেছে। কিন্তু কেন আটকে রাখা হয়েছে, তা আমরা জানি না। আজ পর্যন্ত কোনো মুক্তিপণও দাবি করা হয়নি।

“দুই বছর পার হতে চলেছে। এখন আমরা তাদের জীবনের ঝুঁকি কিংবা প্রাণনাশের আশঙ্কা করছি।”

অভিযোগের পরও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই

ওই দুই চাকমা যুবক নিখোঁজের ঘটনায় টেকনাফ মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ এবং বিজিবি, র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাকে জানানো হলেও এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি স্বজনদের অভিযোগ।বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম কক্সবাজার জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক প্রভাত তঞ্চঙ্গ্যা আলো বলেন, “নিখোঁজের ঘটনার পর দিন ১৭ মে টেকনাফ মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়।

“এ ছাড়া বিজিবি, র‍্যাবসহ সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে প্রশাসনের কাছে বারবার ধরনা দিয়েও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ আমরা দেখিনি।”

‘সীমান্ত পেরিয়ে গেলে উদ্ধার কঠিন’

তবে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মানুষ অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারের ভেতরে চলে যায়। ফলে নিখোঁজের ঘটনা ঘটে।

এ বিষয়ে বিজিবির উখিয়া ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নাফ নদীতে মাছ ধরা ও কাঁকড়া ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু অনেকেই স্থানীয় মহাজন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সেখানে যায়।”

তিনি বলেন, “কেউ নিখোঁজ হয়, কেউ মাইন বিস্ফোরণে আহত হয়; তবু মানুষের যাওয়া থামছে না। অনেক সময় তারা অবৈধ ব্যবসা, বিশেষ করে মাদক সংশ্লিষ্ট কাজেও জড়িয়ে পড়ে।”

বিজিবির এ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা মানুষকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করছি। রোহিঙ্গারাও যেন সীমান্তে না যায়, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কাজ করছি। কিন্তু একজন নাগরিক হিসেবে কেউ নিজের দেশের সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশে গেলে সেটি তার ব্যক্তিগত দায়ও।

“জেলেদের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, যারা অপহরণের অভিযোগ করে তাদের ৯৫ থেকে ৯৯ শতাংশই মিয়ানমারের ভেতরে চলে যায়। বাংলাদেশের ভেতরে থেকে তাদের অপহরণ করা হয়েছে, এমন প্রমাণ সাধারণত পাওয়া যায় না।”

এ বিষয়ে জানতে টেকনাফ থানার ওসি সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি এখানে আসছি নির্বাচনের আগে। দুই বছর আগের এই ঘটনায় বিষয়ে আমার জানা নেই। জেনে বলতে পারব।”

আদিবাসী ইউনিয়ন কক্সবাজারের জেলা সভাপতি মং থোয়াইহ্লা রাখাইন বলেন, “সীমান্ত এলাকায় জীবিকার তাগিদে কাঁকড়া ও মাছ ধরতে যাওয়া অনেকেই আর ফিরে আসছেন না। কিন্তু নিখোঁজদের উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগের অভাব তাদের হতাশ করে তুলছে।”

সূত্র: বিডি নিউজ

Link copied!