• ঢাকা
  • শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
সিনেমারণ্য

হিল্লোলপুরের পবিত্র-ষড়যন্ত্র


বিধান রিবেরু
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২২, ০৪:১৩ পিএম
হিল্লোলপুরের পবিত্র-ষড়যন্ত্র

হঠাৎ করেই সেদিন ১৯২৫ সাল ফিরে এলো, এই ২০২২ সালে। অর্থাৎ তিন কম এক শ বছর আগের ঘটনা যেন চোখের সামনে ঘটে গেল আবার। মনে করিয়ে দিল বাংলাদেশের কথাও। বাংলাদেশের মশহুর মূকাভিনেতা পার্থ প্রতীম মজুমদার সুদূর ফ্রান্স থেকে আমাকে ব্যক্তিগত চাবি (পাসওয়ার্ড) দিয়ে পাঠিয়েছেন ‘আ হলি কন্সপিরেসি’ চলচ্চিত্রটি, পরিচালক শৈবাল মিত্র। কলকাতায় মাসখানেক আগে ছবিটি মুক্তি পেয়েছে। ছবিটি শুধু সময়ের নয়, ঘটনারও সূত্রধর হয়ে ওঠে আমার কাছে। কোন সময়, কোন ঘটনা, সেটি একটু পরই পরিষ্কার হবে।

বাংলা ও ঝাড়খন্ড এলাকার মাঝামাঝি কোনো এক কল্পিত অঞ্চল হিল্লোলপুরে রয়েছে একটি মিশনারি স্কুল। সেখানে বিজ্ঞান শিক্ষক কুনাল ডারউইনের বিবর্তনবাদ পড়ান। কিন্তু স্কুল কমিটির নিয়ম অনুসারে এই বিষয়ে পাঠদানের আগে পড়াতে হয় বাইবেলের জেনেসিস অধ্যায়টি, যেখানে রয়েছে ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্ব। তো কুনালের ক্লাসে সবাই খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী, তারা বাইবেলের অধ্যায়টি সম্পর্কে জানে। তাই কুনাল বাধ্যতামূলক বাইবেল পড়িয়ে সময় নষ্ট না করে সরাসরি বিজ্ঞান শিক্ষায় চলে যান। এটা নিয়ে শিক্ষার্থীদের কোনো অভিযোগ নেই। এরই মধ্যে নতুন বিষয় এসে হাজির হলো: প্রাচীন ভারতে বৈদিক বিজ্ঞান, যেখানে বলা হয়েছে বিজ্ঞানে সব আবিষ্কারের কথা আগে থেকে বেদে উল্লেখ করা আছে। এই বইটি ক্লাসে পড়ানোর আদেশ হয়েছে ওপরের মহল থেকে। যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হিসেবে কুনাল এই গ্রন্থের অসারতা ধরতে পারেন এবং এটি যে সাম্প্রদায়িক জায়গা থেকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান পরিকল্পনার অংশ, সেটাও তার বুঝতে বাকি থাকে না। বিষয়টির সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতির সম্পৃক্ততা কুনালকে আরও বেশি শঙ্কিত করে। তাই কৌশলে তিনি ক্লাসে বলেন, এ বিষয়ে তার যথেষ্ট জ্ঞান নেই, এটি পড়ানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। সাঁওতাল বিজ্ঞান শিক্ষকের এই ‘ঔদ্ধত্য’ কেন মেনে নেবে হিন্দুত্ববাদী পাণ্ডারা? এত বড় সাহস, বেদের প্রশংসা করতে চাইছে না সামান্য আদিবাসী শিক্ষক! বাইরে থেকে গন্ডগোল পাকিয়ে, স্কুলে ভাঙচুর করে বিজ্ঞান শিক্ষক কুনালকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয় এবং পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। 

মিশনের পাদ্রির আমন্ত্রণে হিল্লোলপুরে আসেন রেভারেন্ড বসন্ত কুমার চ্যাটার্জি (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)। তাকে এনে মামলা পরিচালনার উদ্দেশ্য কুনালকে নাস্তিক ও মাওবাদী ‘ট্যাগ’ লাগিয়ে প্রতিশোধ নেওয়া। কুনালকে যদি দোষী সাব্যস্ত করা যায়, তাহলে হিন্দুত্ববাদের উত্থান আরও সহজ হয়ে উঠবে। এই অভিপ্রায় ধরা পড়ে যায় অনেকের কাছেই। সাংবাদিকরা লেখালেখি শুরু করেন। কুনালের সহকর্মী ও সাংবাদিকের অনুরোধে সত্যের পক্ষে লড়াই করতে রাজি হন একসময়ের নামকরা উচ্চ আদালতের আইনজীবী আন্তন ডি সুজা (নাসিরউদ্দীন শাহ)। কোর্টরুম ড্রামা জমে ওঠে বসন্ত আর আন্তনের যুক্তিতর্কের ভেতর দিয়েই। আদালতে যেন কুনালকে উপলক্ষ করে লড়াই চলে ধর্ম ও বিজ্ঞানের। একদিকে ধর্মের অন্ধবিশ্বাস, অন্যদিকে বিজ্ঞানের যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা। শেষ পর্যন্ত ছবিটি স্বাধীনতা ব্যবসায় গিয়ে নোঙর ফেলে। অর্থাৎ লিবারেল জায়গা থেকে এই বার্তাই দেওয়া হয়, ধর্ম ধর্মের জায়গায় থাকুক, বিজ্ঞান বিজ্ঞানের জায়গায়। বিজ্ঞান শিক্ষা ও ধর্মশিক্ষা দুটো স্বতন্ত্র বিষয়। তবে এই বার্তার ফাঁক দিয়ে পরিচালক মূলত বর্তমান ভারতে যে হিন্দুত্ববাদের ভয়ংকর উত্থান ঘটছে, রাজনীতির হাত ধরে, সেটার তীব্র সমালোচনা করেন। লাভের লাভ অতটুকুই।

পরিচালক এই ছবির কাহিনি বলতে ভর করেছেন সেই ১৯২৫ সালের বিখ্যাত স্কোপস মাংকি ট্রায়ালের ওপর। সে বছর টেনেসির মার্কিন শিক্ষক জন টি স্কোপসকে নিয়ে বিচার বসে। রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত স্কুলে তিনি মানুষের বিবর্তন পড়িয়েছিলেন, যা বাইবেলে বর্ণিত অ্যাডাম-ইভ আখ্যানের পরিপন্থী। বিজ্ঞান ও ধর্মের দ্বৈরথ নিয়ে সেই মামলা তখন নজর কাড়ে বহু মানুষের। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই শত বছর আগের শিক্ষক স্কোপস বা কাহিনিচিত্রের শিক্ষক কুনালের মতো একজন বিজ্ঞান শিক্ষকের দেখা মিলেছে আমাদের বাংলাদেশেও, তা-ও কয়েক মাস আগেই। শিক্ষকের নাম হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল, তিনি মুন্সীগঞ্জ সদরের বিনোদপুর রামকুমার উচ্চবিদ্যালয়ে বিজ্ঞান পড়াতেন। 

বিজ্ঞান পড়ানোর সময় শ্রেণিকক্ষে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক প্রশ্ন করা হয়, তিনি যথাসম্ভব যুক্তির ভিত্তিতে উত্তর দিয়েছেন, কিন্তু সেটি গোপনে ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পূর্বপরিকল্পিত এ ঘটনা ঘটে দশম শ্রেণিতে, ২০২২ সালের ২০ মার্চ। তার পরদিন ১০-১২ জন ছাত্র বিজ্ঞান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ করে। ছাত্রদের অভিযোগের ভিত্তিতে স্কুল কর্তৃপক্ষ ওই শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার পাশাপাশি সাময়িকভাবে বরখাস্তও করে। তারপরও ২২ মার্চ শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। একই দিন ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয় এবং সেদিনই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। শুধু বিজ্ঞান পড়ানোর দায়ে ১৯ দিন কারাভোগ করতে হয় হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলকে। 

ছাড়া তিনি পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু শৈবাল মিত্রের চলচ্চিত্রে থাকা কুনালের মতো বলতে পারেননি—শিক্ষিত করে তোলার চেষ্টা তিনি চালিয়ে যাবেন। বলতে না পারার কারণ আমরা সবাই ভালো করে জানি। ভিটেমাটি ছাড়া তো হতেই হবে, আর কী কী ক্ষতি হবে, কে জানে! তাই অনেকটাই নিশ্চুপ হয়ে যান হৃদয় মণ্ডল। যাহোক, পার্থদাকে ধন্যবাদ ছবিটি পাঠানোর জন্য। তিনি নিজে এই ছবিতে পাদ্রির চরিত্রে অভিনয় করেছেন। গোটা ছবিটি আরও ভালো করে নির্মাণ করা যেত। মানে চিত্রনাট্য রচনা ও নির্দেশনায় দৌর্বল্য থাকায় শক্তিমান অভিনয়শিল্পীরা নিজেদের সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি। তারপরও যে বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে ছবিটি নির্মাণ করেছেন পরিচালক, সে জন্য তিনি ধন্যবাদার্হ। অনেক সময় খুঁতযুক্ত ছবি বিষয় ও বক্তব্যের কারণে গুরত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর থাকলই-বা খুঁত, নিখুঁত করার চক্করে চুপ করে তো থাকা যাবে না। নিরন্তর বলে যেতে হবে। কণ্ঠ ছাড়তে হবে। চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত লেনার্ড কোহেনের গানকেই তাই উদ্ধার করি সর্বশেষে:

Ring the bells that still can ring
Forget your perfect offering
There is a crack, a crack in everything
That‍‍’s how the light gets in

 

Link copied!