পশ্চিমবঙ্গে মসজিদের মাইক খোলা নিয়ে চরম বিতর্ক


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: আগস্ট ৮, ২০২৬, ১১:২৯ এএম
পশ্চিমবঙ্গে মসজিদের মাইক খোলা নিয়ে চরম বিতর্ক

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম মেনে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন মসজিদ থেকে মাইক সরানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোর ক্রমেই বাড়ছে। সংখ্যালঘু জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও কার্যত একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেই বেশি লক্ষ্য করা হচ্ছে। এ অভিযোগ নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দ্বারস্থ হয়েছেন তিন সাংসদ। অন্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধী শিবিরও।

বৃহস্পতিবার অমিত শাহের সঙ্গে দেখা করে মসজিদ থেকে মাইক খোলার বিষয়টি তুলে ধরেন এনসিপিআইয়ের তিন সাংসদ খলিলুর রহমান, আবু তাহের খান ও ইউসুফ পাঠান। তাদের বক্তব্য, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ এবং প্রশাসনের বিধি কার্যকর করতে হলে তা কোনো একটি ধর্মের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে প্রয়োগ করা যায় না। সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই একই নিয়ম কার্যকর করা প্রয়োজন।

সাংসদদের প্রশ্ন, লাউডস্পিকার শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্থানে ব্যবহার করা হয় না। হিন্দুদের বিভিন্ন ধর্মীয় স্থান ও অনুষ্ঠানেও এর ব্যবহার রয়েছে। তাহলে সেসব স্থানে একই ধরনের ব্যবস্থা না নিয়ে মসজিদগুলো থেকেই বারবার মাইক খোলা হচ্ছে কেন—এই প্রশ্ন তুলেছেন তারা। তাদের দাবি, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের পার্থক্য রাখা উচিত নয়।

এরই মধ্যে মাইক খোলার পরিসংখ্যান তুলে ধরে সরকারের পক্ষ থেকেও পাল্টা বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যের বিভিন্ন মসজিদ থেকে ৮ হাজার ২০৩টি এবং মন্দির থেকে ১ হাজার ৯৬টি মাইক সরানো হয়েছে। সরকারের দাবি, এই পদক্ষেপের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করার সম্পর্ক নেই। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম মেনেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশ কার্যকর করতে পুলিশকে প্রয়োজনীয় সব নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত শব্দসীমা অতিক্রম না করে, তা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের লক্ষ্য। সরকারের বক্তব্য, নিয়ম যখন সবার জন্য প্রযোজ্য, তখন তা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও পক্ষপাতের প্রশ্ন ওঠার কথা নয়।

তবে সরকারের এই ব্যাখ্যায় মোটেও সন্তুষ্ট নয় বিরোধীরা। শুক্রবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠকে মাইক খোলার বিষয়টি তোলেন বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তার সঙ্গে ছিলেন বিরোধী দলের মুখ্য সচেতক আখরুজ্জামান। বৈঠকের পর ঋতব্রত বলেছেন, ধর্ম মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সমতা ও সংবেদনশীলতা বজায় রাখা জরুরি।

বিষয়টি নিয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী বিপ্লব ও অরূপের সঙ্গে ইতিমধ্যে আলোচনা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। ঋতব্রত বলেছেন, প্রয়োজন হলে আগামী সপ্তাহেই তারা হাইকোর্টে যাবেন।

তার অভিযোগ, পুরোনো সরকারি নির্দেশিকার ভিত্তিতে মাইক খোলার প্রক্রিয়া শুরু হলেও বাস্তবে এর প্রভাব একটি সম্প্রদায়ের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়ছে। তিনি আরও বলেছেন, আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে তাদের আপত্তি নেই। তবে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে এর প্রয়োগে কোনো পার্থক্য থাকা উচিত নয়।

ফলে মসজিদের মাইক খোলাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন শুধু শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় অধিকার এবং প্রশাসনের বিধি প্রয়োগে সমতার প্রশ্নও। মাইক খোলার এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, এখন সেদিকেই নজর রাজ্য রাজনীতির।

Link copied!