নেপালের বন্যা ভারতের জন্যও বিপদের ঘণ্টা


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম
নেপালের বন্যা ভারতের জন্যও বিপদের ঘণ্টা

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। কিন্তু এই বিপর্যয়ের অভিঘাত নেপালের ভূখণ্ডেই আটকে থাকার নয়, ভারতের জন্যও তা বড় সতর্কবার্তা। বৃহস্পতিবার বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের পাহাড়ে প্রবল বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস কিংবা হিমবাহজনিত বিপর্যয়ের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের বিস্তীর্ণ সমতলেও পৌঁছতে পারে।

নেপালে ছয় হাজারের বেশি নদী ও জলধারা রয়েছে। অধিকাংশই দক্ষিণমুখী হয়ে ভারতে ঢুকে গঙ্গা অববাহিকায় মিশেছে। পূর্বে কোসি, মধ্যাঞ্চলে গন্ডক, পশ্চিমে কর্নালি এবং পশ্চিম সীমান্ত বরাবর মহাকালী- এই বড় নদীগুলোর পাশাপাশি বাগমতী, কমলা, রাপ্তি ও বাবাইয়ের মতো ছোট নদীও বর্ষায় দ্রুত ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্রের জলবিদ মনীশ শ্রেষ্ঠের মতে, নেপাল থেকে ভারতের সমতলে নেমে আসা ৭ থেকে ৯টি প্রধান নদী ভারতে বন্যার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের কেন্দ্রীয় জল কমিশনও কোসি, গন্ডক, বাগমতী ও ঘাঘরাকে প্রধান আন্তঃসীমান্ত নদী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বিহার। উত্তর বিহারের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকা সরকারিভাবে বন্যাপ্রবণ। কোসি বা যাকে ‘বিহারের দুঃখ’ বলা হয়, গন্ডক, বাগমতী ও কমলার মতো প্রধান নদীগুলোর উৎস নেপালে। পূর্ব উত্তরপ্রদেশেও ঘাঘরা, রাপ্তি ও গন্ডকের কারণে নিয়মিত বন্যা হয়। গোরখপুর, বাহরাইচ, লখিমপুর খেরি ও শ্রাবস্তী জেলার মতো এলাকাগুলো বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উত্তরবঙ্গেও মেচি ও মহানন্দার জলপ্রবাহের প্রভাব রয়েছে। আইসিআইএমওডির জলবিদ প্রদীপ মন ডাঙ্গোলের কথায়, ব্যাপ্তির বিচারে বিহার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে এবং উত্তরপ্রদেশ দ্বিতীয় স্থানে।

তবে নেপালে বন্যা হলেই তার জল একই মাত্রায় ভারতে বিপর্যয় ডেকে আনবে—বিষয়টি এত সরল নয়। নেপালে কোথায় এবং কতটা বৃষ্টি হয়েছে, নদীতে কত পলি জমেছে, ভারতের গঙ্গায় তখন জলস্তর কত, বাঁধের অবস্থা কেমন এবং জলনিকাশি ব্যবস্থা কতটা বাধাগ্রস্ত- সব মিলিয়েই ঠিক হয় বিপর্যয়ের মাত্রা। ২০০৮ সালের কোসি বিপর্যয় তার বড় উদাহরণ। নেপালে বাঁধ ভেঙে বিহারে ভয়াবহ বন্যা হয় এবং প্রায় ৪০০ মানুষের মৃত্যু ঘটে। আইআইটি কানপুরের অধ্যাপক রাজীব সিনহার মতে, সেই সময় নদীতে বাঁধের ধারণক্ষমতার মাত্র প্রায় এক-দশমাংশ জল ছিল। অর্থাৎ অস্বাভাবিক জলপ্রবাহ নয়, দুর্বল ও ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ না করা বাঁধই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

সাধারণ বর্ষায় বন্যার জল নেপালের পাহাড় থেকে বিহারের সমতলে পৌঁছতে প্রায় এক দিন সময় নিতে পারে। কিন্তু চুরে পাহাড়ি অঞ্চলের আকস্মিক বন্যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নেমে আসতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বিপর্যয়ে রাসুয়া থেকে ভারতের সীমান্তের কাছে ত্রিবেনীতে বন্যার ঢেউ পৌঁছেছিল মাত্র সাড়ে সাত ঘণ্টায়।

আরও বড় উদ্বেগ হিমালয়ের বদলে যাওয়া প্রকৃতি। ২০২১ সালের চামোলি ও ২০২৫ সালের ধরালি বিপর্যয়ের মতো ঘটনায় জল, বরফ, পাথর ও বিপুল পলি মিশে ভয়ংকর স্রোত তৈরি হয়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম বৃষ্টিপাত বাড়ছে, উষ্ণায়নে বায়ুমণ্ডলে বেশি জলীয়বাষ্প জমছে। গলতে থাকা পারমাফ্রস্ট, হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক জলমুক্তি এবং শিলা-বরফ ধসের ঝুঁকিও বাড়ছে।

Link copied!