রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের জেরে ইউক্রেনের কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ক্রমেই যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ায় দেশটির লাখ লাখ টন শস্য রপ্তানি অনিশ্চয়তায় পড়েছে। পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগারের অভাবে এসব শস্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালিতে অব্যাহত হামলা ও নৌ চলাচলে বিঘ্নের কারণে জ্বালানি, সার ও খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। দুই সংকটের সম্মিলিত প্রভাবে ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ন্যাশনাল’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন ও রাশিয়ার হামলায় কৃষ্ণসাগর ও আজভ সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। অ্যামব্রে অ্যানালিটিকসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দুই পক্ষ মোট ৩১৭টি বাণিজ্যিক ও অন্যান্য জাহাজে হামলা চালিয়েছে। আগের ছয় মাসে এ সংখ্যা ছিল ৭৪। অর্থাৎ হামলার ঘটনা চার গুণেরও বেশি বেড়েছে।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জ্যঁ-মার্তিন বাউয়ার বলেন, বিশ্বে গম বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রাশিয়া ও ইউক্রেনের ওপর নির্ভরশীল। কৃষ্ণসাগরে অস্থিরতার কারণে ইউক্রেনের কৃষকেরা উৎপাদিত শস্য বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে তাঁদের গুদামে অতিরিক্ত মজুত জমছে এবং বাজারে দামও কমে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, কৃষ্ণসাগর ও হরমুজ প্রণালি একই খাদ্যব্যবস্থার ভিন্ন দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি শস্য রপ্তানির জন্য অপরিহার্য, অন্যটি তেল ও সার সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ। ফলে এ দুটি পথে বিঘ্ন ঘটলে খাদ্য উৎপাদন, পরিবহন ও কেনার খরচ—সবই বেড়ে যায়।
ইউক্রেনের কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত দেশটির শস্য রপ্তানি আগের মৌসুমের একই সময়ের তুলনায় ২৯ শতাংশ কমেছে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে দেশটি ৩ কোটি ৭৫ লাখ টন শস্য ও ডালজাতীয় পণ্য রপ্তানি করেছিল। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা ছিল এসব পণ্যের অন্যতম প্রধান বাজার।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সংযুক্ত আরব আমিরাতবিষয়ক রাষ্ট্রদূত লুসি বার্জার সতর্ক করে বলেছেন, নভেম্বরের মধ্যে ইউক্রেনের ৯০ লাখ টনের বেশি শস্য, তৈলবীজ ও সংশ্লিষ্ট পণ্য সংরক্ষণের জায়গা না-ও পাওয়া যেতে পারে। তাঁর মতে, খাদ্য উৎপাদন করাই যথেষ্ট নয়; তা সংরক্ষণ, পরিবহন এবং প্রয়োজনীয় দেশগুলোতে পৌঁছে দেওয়াও জরুরি।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে গমের দাম বেড়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ, যা তিন বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে পরিবহন সংকট এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা এ মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
সংকটের বড় প্রভাব পড়তে পারে মিসরে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গম আমদানিকারক দেশটি তুলনামূলক কম দামে গম পাওয়ার জন্য কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৬ সালে দেশটির অভ্যন্তরীণ গম উৎপাদন প্রায় এক কোটি টন হলেও ২০২৬-২৭ মৌসুমে আরও ১ কোটি ৩৫ লাখ টন গম এবং ১ কোটি ৫৫ লাখ টন ভুট্টা আমদানির প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছে এফএও।
ইয়েমেন, লেবানন ও গাজায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর হিসাবে, ইয়েমেনের সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাতেই ৪৭ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশটির ১৮ লাখ মানুষের জরুরি পর্যায়ের খাদ্যসংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
লেবাননে এক মাসে সবজির দাম ২০ শতাংশের বেশি এবং রুটির দাম ১৭ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে, গাজায় ১৪ লাখের বেশি মানুষের খাদ্যসংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এফএও সতর্ক করেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার সরবরাহ ব্যাহত হলে ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধ এবং ২০২৭ সালে বিশ্বজুড়ে কৃষি উৎপাদন কমে যেতে পারে। বিশেষ করে আফ্রিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের আমদানিনির্ভর দেশগুলো বেশি ঝুঁকিতে থাকবে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির কর্মকর্তা বাউয়ার বলেন, বিশ্বে সামগ্রিকভাবে খাদ্যের ঘাটতি নেই। মূল সমস্যা হলো, যাদের খাদ্য প্রয়োজন, তাদের কাছে তা সাশ্রয়ী দামে পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে না। জাহাজ চলাচলে বিলম্ব ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি সীমিত মানবিক সহায়তার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করছে।







