ইরানের তেল বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা সাময়িক প্রত্যাহারের পর এবার বিদেশে জব্দ থাকা তেহরানের ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার সম্পদ ছাড়ের বিষয়েও রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্থানীয় সময় গত সোমবার দেশটির সংবাদমাধ্যমকে এ তথ্য জানান।
এদিকে সুইজারল্যান্ডে ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া শান্তি আলোচনা চালিয়ে নিতে চারটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ প্রণালি ও ইরানের বন্দর ঘিরে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে ইরান চুক্তি না মানলে যা করা দরকার, তা করা হবে।
মার্কিন চাপ সত্ত্বেও লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় আরও ১৭ জন নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করার আগে থেকেই ইরান বলে আসছে, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে হামলা বন্ধ করতে হবে। সমঝোতা স্মারকেও বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে।
* দুই ধাপে ৬০০ কোটি ডলার করে এ অর্থ ছাড় হবে। * শান্তি আলোচনা চালিয়ে নিতে চারটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন।
সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান শান্তি আলোচনা শুরু হয় গত রোববার। প্রথম দিনের আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ। তিনি সোমবার দেশটির সংবাদমাধ্যমে বলেন, বিভিন্ন দেশে জব্দ থাকা ইরানের মোট ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার ছাড় করতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দুই দফায় ৬০০ কোটি ডলার করে এই অর্থ ছাড় করবে ওয়াশিংটন।
গালিবাফের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার থেকে ৬০ দিনের জন্য এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার কথা। এদিন ইরানের তেল বিক্রিতে ৬০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা জানায় যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন–ইরান আলোচনা সম্পর্কে জানেন এমন একাধিক সূত্রের বরাতে আল–জাজিরা বলেছে, ইরানের সম্পদ ছাড়ের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। এ নিয়ে সুইজারল্যান্ডে সমঝোতা সই হতে পারে।
আল–জাজিরাকে ওই সূত্রগুলো আরও বলেছে, ১৭ জুন সই হওয়া ১৪ দফার প্রাথমিক সমঝোতা অনুযায়ী, ৬০ দিন যে আলোচনা চলবে, সেই সময়ে আরও ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার ছাড় হতে পারে। আর দুই পক্ষ যদি চূড়ান্ত চুক্তিতে রাজি হয়, তাহলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ তহবিলসহ মোট ৫ হাজার কোটি ডলার ছাড় পেতে পারে ইরান।
প্রাথমিক সমঝোতা সইয়ের পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়া এবং এরপর ইরানের তেল বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও দেশটির জব্দ করা সম্পদ ছাড়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজি হওয়াকে দুই পক্ষের জয় হিসেবে দেখছেন সাবেক মার্কিন উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেন্রি এনশার। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, এসব ঘটনা দেখাচ্ছে যে দুই পক্ষই যা চাইছে, সেটাই পাচ্ছে তারা।
তহবিল ব্যবহার নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
ইরানের জব্দ করা তহবিল ছাড়ের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এ তহবিল কীভাবে ছাড়া হবে ও এর ব্যবহার কীভাবে হবে, তা নিয়ে দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছে।
জব্দ এ তহবিল শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্যপণ্য কিনতে ব্যবহার করা যাবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘এ অর্থ দিয়ে তারা শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্যপণ্য কিনতে পারবে, যা তাদের জন্য এখন খুব দরকার। অর্থাৎ তাদের এ অর্থ যাবে আমাদের কৃষকদের কাছে।’
তবে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি বলেছেন, সমঝোতা অনুযায়ী এই অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য কেনার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সমঝোতায় প্রথম ৬০০ কোটি ডলার দিয়ে নিত্যপণ্য ও ওষুধ কেনার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। আর অন্য দেশের তুলনায় যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সুলভ মূল্যে পণ্য পাওয়া যায়, তাহলে সে ক্ষেত্রে বিষয়টি বিবেচনা করবে ইরান।
আবারও হুমকি দিলেন ট্রাম্প
পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ১৭ জুন সই হওয়া সমঝোতা স্মারক নিয়ে আবারও তেহরানকে সতর্ক করেছেন ট্রাম্প। গতকাল মঙ্গলবার তিনি ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, ‘যদি ইরান চুক্তি মেনে না চলে বা যদি তারা ঠিকঠাক আচরণ না করে, তাহলে যেটা করা দরকার করব। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা (ইরান) আমাদের প্রতি সম্মান দেখাবে, আমরা কোনো সমস্যা হতে দেব না।’
সমঝোতা হওয়া বিষয়গুলো নিয়ে এলোপাতাড়ি মন্তব্য না করার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ট্রাম্পের হুমকির পর গতকাল এক্সে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, আলোচনার অগ্রগতি নির্ভর করছে সমঝোতা হওয়া বিষয়গুলো কতটা কার্যকর হচ্ছে, তার ওপর। সমঝোতা হওয়া নথির বাইরে যেকোনো মন্তব্য আলোচনা এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে না।
এখন চলছে কারিগরি আলোচনা
সুইজারল্যান্ডে রোববার পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় বৈঠকে বসেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। তাতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। গালিবাফের নেতৃত্বে ইরানের প্রতিনিধিদলে ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
উচ্চপর্যায়ের এ বৈঠকের পর কারিগরি বিষয়ে আলোচনার জন্য কিছু ‘ওয়ার্কিং কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। এখন সুইজারল্যান্ডে মধ্যস্থকারীদের নিয়ে কারিগরি এসব দলের মধ্যে আলোচনা চলছে।
কারিগরি বিষয়ে এ আলোচনায় ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি। গতকাল তিনি জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক কর্মসূচি, আর্থিক বিষয়াবলি ও সমঝোতা স্মারক নিয়ে চারটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। শিগগিরই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হবে।
সুইজারল্যান্ডে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সরাসরি বৈঠক চলছে বলেই সমঝোতা নিয়ে আশাবাদী হওয়া যায় বলে মনে করেন প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ সৈয়দ হোসেইন মৌসাভি। তিনি বলেন, অনেক বিষয়ে একমত হওয়ার জন্য এটা সুবর্ণ সুযোগ।






































