খুলল পায়রা সেতু , বন্ধ হলো ফেরি


পটুয়াখালী প্রতিনিধি
প্রকাশিত: অক্টোবর ২৪, ২০২১, ১১:৩৬ এএম
খুলল পায়রা সেতু , বন্ধ হলো ফেরি

পটুয়াখালীর লেবুখালীতে পায়রা নদীর ওপর বহুল প্রতিশ্রুত পায়রা সেতুটির দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে যেমন যুক্ত হলো নতুন মাত্রা, তেমনি শেষ হলো বরিশাল-কুয়াকাটা রুটে ফেরির দিন।

রোববার (২৪ অক্টোবর) বেলা ১১টায় গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেন।

উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের ৫০ লাখ মানুষের স্বপ্নপূরণ হলো।

এখন পদ্মার এপার অর্থাৎ কাঁঠালবাড়ি থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়কপথে ফেরি বিড়ম্বনার কোনো অবকাশ রইল না। পার হতে হবে না ১০টি সেতু। এতে দক্ষিণাঞ্চলে সমৃদ্ধ হবে অর্থনীতি, গড়ে উঠবে শিল্প-কারখানা। ঘুঁচবে বেকারত্ব। প্রসারিত হবে পর্যটনশিল্প।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বরিশাল-পটুয়াখালীর একটা সংযোগ সৃষ্টি করবে এই পায়রা সেতু। আমি নামটা পছন্দ করেছি।”

পায়রাকে শান্তির প্রতীক উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, “এ অঞ্চলে এই সেতু হওয়ার পর মানুষের যে আর্থিক উন্নতিটা হবে, তার ফলে মানুষের মনে একটা শান্তি আসবে, মানুষ সুন্দরভাব বাঁচতে পারবে।”

শেখ হাসিনা আক্ষেপ করে বলেন, “যদি পায়রা নদীর ওপর নির্মিত আধুনিক সুবিধা সম্পন্ন সেতু দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যেতে পারতাম, তাহলে অনেক আনন্দ পেতাম। একদিন অবশ্যই এই সেতু পার হাওয়ার জন্য চলে আসব। পায়ে হেঁটে এই সেতু পার হব। এই সেতু নির্মাণের ফলে কুয়াকাটা পর্যন্ত নিরবিচ্ছন্ন সড়ক যোগাযোগ স্থাপন হলো। অবহেলিত পটুয়াখালী উন্নয়নের মহাসড়কে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।”

১ হাজার ৪৪৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতু উদ্বোধন শেষে সব ধরনের যান চলাচল করতে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে কর্তৃপক্ষ।

গণভবন প্রান্তে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউসের সঞ্চালনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য প্রদান করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গণভবন প্রান্তে সাবেক চিপ হুইপ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন, সংসদ সদস্য আমির হোসেন আমু উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়াও পটুয়াখালীর দুমকী প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মেজর (অব) জাহিদ ফারুক, সাবেক ধর্মপ্রতিমন্ত্রী সংসদ সদস্য মো.শাহজাহান মিয়া, সংসদ সদস্য এসএম শাহজাহাদা, শেখ হাসিনা সেনানিবাসের জেওসি মেজর জেনারেল আবুল কালাম মো. জিয়াইর রহমান, বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম বাদল, ডিআইজি এসএম আক্তারুজ্জামান, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসেন, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ, বরিশাল ও পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।

স্থানীয়রা জানান, সেতুটি চালু হওয়ার ফলে বরিশাল, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের সঙ্গে পর্যটন নগরী কুয়াকাটা ও পায়রা বন্দর পর্যন্ত ফেরিবিহীন সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হলো। আগামী দিনে যোগাযোগ ব্যবস্থা, পণ্য পরিবহন এবং পর্যটনের নতুন দ্বার উন্মোচন হয়ে অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে এই সেতু।

সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা যায়, পায়রা নদীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে চার লেনের লেবুখালী পায়রা সেতু। সেতু বিভাগ জানায়, পটুয়াখালী-বরিশাল মহাসড়কের লেবুখালী পয়েন্টে পায়রা নদীতে পায়রা সেতু নির্মাণ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পায় ২০১২ সালে। নকশা জটিলতায় দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ থাকলেও নির্মাণযজ্ঞ শেষ করে এখন যান চলাচলের জন্য প্রস্তুত এই সেতু। ১ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৬ সালে ২৪ জুলাই সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু করেন চীনের একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান লংজিয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ কোম্পানি লিমিটেড। 

নান্দনিক নির্মাণ শৈলীতে দ্বিতীয় কর্ণফুলি সেতুর আদলে করা প্রায় দেড় কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে ও ২০ মিটার প্রস্থের সেতুর মাঝ বরাবর একটি মাত্র পিলার বসানোর ফলে নদীর গতিপথ থাকবে সচল। দুই পাড়ে প্রায় ৭ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ও আধুনিক টোল প্লাজা নির্মাণ করা হয়েছে। রাখা হয়েছে ওজন পরিমাপের ব্যবস্থা। সেতুটি চালু হলে এর কোনো সমস্য হচ্ছে কিনা তা নির্ণয়ের জন্য সচল থাকবে ব্রিজ হেলথ মনিটরিং সিস্টেম। আধুনিক এ সেতু চালু হওয়ায় খুশি দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী আলমগীর, সাধারণ সম্পাদক ভিপি আবদুল মান্নান, সাংগঠনিক সম্পাদক উজ্জ্বল বোসসহ একাধিক নেতা জানান, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাঙিক্ষত একটি স্বপ্নপূরণ করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার প্রতি এ অঞ্চলের মানুষের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকলে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন হয় এটা বারবার প্রমাণিত।

পায়রা লেবুখালী সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল হালিম জানান, দীর্ঘ কর্মযজ্ঞ শেষে পায়রা সেতু প্রধানমন্ত্রী সকালে যানচলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। এটি একটি অত্যাধুনিক সেতু। পদ্মা সেতু চালু হলে সারা দেশের সঙ্গে এই সেতু চালুর মাধ্যমে কুয়াকাটা পর্যন্ত ফেরি বিহীন সড়ক পথের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। এছাড়া পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটাকে ঘিরে পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটবে বলেও দাবি করেন তিনি। পর্যটন শিল্প বিকশিত হওয়ার পাশাপাশি এ সেতু চালু হলে পায়রা বন্দরের মাধ্যমে ব্যবসা বাণিজ্যের নতুন দ্বার উন্মুক্ত হবে এবং পটুয়াখালী তৃতীয় অর্থনৈতিক করিডোরে রূপান্তরিত হবে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানান, এ সেতু চালুর ফলে পায়রা বন্দর, পর্যটন নগরী কুয়াকাটা, নির্মাণাধীন পটুয়াখালী ইপিজেডসহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবন মান পাল্টে যাবে। কৃষি এবং মৎস্য শিল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হবে। কুয়াকাটা পর্যটন নগরী হবে ঢাকার সবচেয়ে কাছের সমুদ্র সৈকত।

আগামী দিনে পটুয়াখালী দেশের তৃতীয় অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে আর্বিভূত হবে বলে জানান তিনি।

Link copied!