শরতের আকাশে শুভ্র মেঘের ভেলা। বাতাসে দুলছে কাশফুল। আর এসবই জানান দিচ্ছে দরজায় কড়া নাড়ছে দুর্গাপূজা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় এই উৎসবকে ঘিরে সর্বত্র বিরাজ করছে সাজ সাজ রব। শেষ সময়ে দেবী দুর্গার রূপ ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত প্রতিমাশিল্পীরাও। সোমবার (১১ অক্টোবর) থেকে শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বৃহৎ ও প্রধান ধর্মীয় উৎসব পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গাপূজা।
পূজা নির্বিঘ্ন করতে সদর আসনের সাংসদ নিজাম হাজারী, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে পৃথকভাবে পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। জেলা পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা।
বুধবার (৬ অক্টোবর) মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়েছে। তবে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে ১১ অক্টোবর মহাষষ্ঠীতে। তাই পূজার আগে দুর্গার চার সন্তানসহ অন্যান্য দেবদেবীর পরিপূর্ণ রূপ ফুটিয়ে তুলতে দিন-রাত কাজ করছেন প্রতিমাশিল্পীরা। এরই মধ্যে প্রতিমার অবয়ব তৈরি করেছেন তারা। এখন চলছে রং ও সাজসজ্জার কাজ। কারিগররা তাদের নিপুণ হাতে ফুটিয়ে তুলছেন দেবী দুর্গার রূপ। কেউ রং করছেন, কেউ তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলছেন চোখ-মুখ, কেউবা আবার ব্যস্ত মণ্ডপ তৈরিতে। একই সঙ্গে একাধিক প্রতিমা তৈরির কাজে দম ফেলার ফুসরত নেই শিল্পীদের। করোনার কারণে আগের মতো আয়-রোজগার নেই কারিগরদের। তবু দেবীর প্রতিমা তৈরি করতে পেরে তৃপ্ত তারা।
প্রতিমাশিল্পী কানাই পাল জানান, মায়ের প্রতিমা কিংবা দেব-দেবীর প্রতিমা তৈরি করার মধ্যে একটা আনন্দ আছে। বর্তমানে করোনার কারণে সেই রকম আয়-রোজগার নেই। লোকসান হলেও আগামীতে কাজ করার আশায় আমরা কাজ করে যাচ্ছি। মহালয়া হয়ে গেছে মানে আমাদের দেবী এসে গেছেন। এখন দেবীকে বরণ করে নেওয়ার পালা। এ মুহূর্তে রঙের কাজ চলছে। খুবই ব্যস্ত আছি এবং দ্রুত গতিতে এ কাজ এগিয়ে চলছে। দেবীর শাড়ি, অলংকার ও অন্যান্য সাজ পরানো হবে।
প্রতিমাশিল্পী বিধান আদি জানান, এবার ফেনীর বাঁশপাড়া দুর্গা মন্দিরে বিগ বাজেটের প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন তিনি। শিল্পী তার নিজস্ব মনের মাধুরী মিশিয়ে রং ব্যবহারের মধ্য দিয়ে প্রতিমাগুলো কারুকার্য ফুটিয়ে তোলে। তিনি এবার দেশে প্রায় ১০-১২টি প্রতিমা তৈরির কাজ করেছেন। তিনি জানান, ফেনীর বাঁশপাড়া, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও দেশের বাইরে পশ্চিমবঙ্গেও তারা কাজ করেন। প্রতিবারই ১২-১৫ জন শ্রমিক নিয়ে প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করেন।
ফেনী জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের দেওয়া তথ্যমতে, এবার ফেনীতে নতুন করে পাঁচটি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জেলার ১৪৩টি পূজামণ্ডপে এবার শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। দুর্গাপূজাকে ঘিরে বিভিন্ন ইউনিটে দফায় দফায় প্রস্তুতি সভা করা হয়েছে। করোনাকালের দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হওয়া সর্বজনীন শারদীয় দুর্গাপূজা পালনে প্রস্তুত সংশ্লিষ্টরা। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মতে ১৮টি নির্দেশনাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে, শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে, প্রতিমা নির্মাণসহ সাত্ত্বিক পরিবেশ নিশ্চিত করা ও প্রতিমা নিরঞ্জনে শোভাযাত্রা পরিহার করা হবে।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান শুসেন চন্দ্র শীল বলেন, করোনাকালে দ্বিতীয়বারের মতো শারদীয় দুর্গাপূজা এবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিটি পূজামণ্ডপে নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক ও পুলিশ সদস্য দ্বারা নিরাপত্তাব্যবস্থা, দর্শনার্থী ও সকলের জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে সব মন্দির কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
বাঁশাপাড়া দুর্গা মন্দিরের যুগ্ম সম্পাদক রাজীব পাল জানান, গতবার করোনার কারণে এই পূজা আনন্দের সাথে করতে পারিনি। এবার করোনার প্রকোপটা কম। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আশা করি এবার পূজা করতে পারব। পূজা উপলক্ষে এলাকাকে আরো সৌন্দর্যময় করে তুলতে এবার নতুন সংযোজন মায়ের আগমনী, শরৎকালের দৃশ্য, ঢাক-ঢোল ও আলপনা করে প্রায় ৫০০ গজের মধ্যে দেয়াল ও রাস্তা শিল্পী দিয়ে অলংকরণ করা হয়েছে। এর নাম দেয়া হয়েছে ‘আর্ট অব রোড’।
ফেনী পৌর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সমর দেবনাথ বলেন, বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে দল-মত নির্বিশেষে সকল ধর্মের মানুষ একসাথে উৎসব করবে এটাই প্রত্যাশা করি। বিভিন্ন মণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে রক্তদান কর্মসূচি, বস্ত্র বিতরণ, অসচ্ছলদের মাঝে সাহায্য প্রদানসহ নানাভাবে পালন করা হয়। এছাড়া পাঁচ দিনের পূজায় দেশ ও বিশ্ব শান্তি কল্যাণে প্রার্থনা করা হবে।
পুলিশ সুপার খোন্দকার নুরুন্নবী বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য সার্বিক নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবেন। পূজায় যাতে কোন দুষ্কৃতিকারী অপ্রীতিকর ঘটনা না করতে পারে সেজন্য গোয়েন্দা সদস্য, ট্রাফিক ব্যবস্থা জোরদার ও সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্বরত থাকবেন। সব মিলিয়ে নিরাপত্তার দিকে দিয়ে যেন কোনো ঘাটতি না হয় প্রতিবারের মতো এবারও সেই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।






























