২০-৩০ জন করে ছোট একটি নৌকায় খাল পার হচ্ছেন শিক্ষার্থীসহ নানা বয়সী সাধারণ মানুষ। তখনো পার হওয়ার অপেক্ষায় খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে অর্ধশত মানুষ। একমাত্র ছেলে রবিন বিশ্বাসকে (৯) নৌকায় তুলে দিয়ে খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন মা সর্বিতা বিশ্বাস। শুধু সর্বিতা বিশ্বাসই নন, তার মতো আরও অর্ধশত অভিভাবক তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর জন্য নৌকায় তুলে দিয়ে খালের অপর পাড়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকেন। যেন কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে নিজের সন্তানদের যেন নিজেরাই উদ্ধার করতে পারেন।
কৃষক সুশান্ত মণ্ডল (৫০) তার নিজের আবাদি জমিতে উৎপাদিত শাক নিয়ে যাবেন পশ্চিমপাড় বাজারে। পার হতে হবে খাল, তাই প্রথম খেয়ায় জায়গায় না হওয়ায় অপেক্ষায় রয়েছেন পরবর্তী খেয়ার। সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে না পারলে ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করতে পারবেন না শাক।
আমিনুল ইসলাম (৪৫) নামের এক ব্যক্তি তার অসুস্থ মাকে ভ্যানে করে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন খালপাড়ে। ওপার থেকে নৌকা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
এভাবেই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার মুশুরিয়া গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ওয়াপদার কাটাখালের ওপর একটি সেতুর অভাবে প্রতিনিয়ত চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন ১০ গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ। স্কুল-কলেজসহ দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা দিয়ে পারাপার হতে হয় তাদের। এই খাল পার হওয়ার সময় প্রায়ই ঘটে ছোট-বড় নৌকাডুবির ঘটনা। কয়েক বছর আগে খরস্রোতা এ খাল পার হতে গিয়ে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারায় দুই শিক্ষার্থী। এর পর থেকে সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন অভিভাবকেরা।
কোটালীপাড়া উপজেলার রামশীল ইউনিয়নের মুশুরিয়া গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে পয়সাটহাট-মোস্তাপুরের ওয়াপদার কাটাখাল। গ্রামটিকে দুই ভাগে বিভক্তও করে রেখেছে এ খালটি। এ খাল পাড়ি দিয়ে মুশুরিয়া, চলবল, উত্তর চলবল, শৈলদাহ, নবগ্রাম, উত্তর রামশীলসহ ওই এলাকার অন্তত ১০টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ যাতায়াত করে থাকেন। এ ছাড়া খালের এক পাড়ে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় অন্য পাড়ের শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা পার হয়ে আসতে হয় পাঠশালায়। খালের দুই পাড়ে শত শত একর আবাদি জমি থেকে উৎপাদিত কৃষিপণ্য আনা নেওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় দুই পাড়ের বাসিন্দাদের। এ ছাড়া অসুস্থ রোগী আনা-নেওয়ায় পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে।
স্থানীয় বাসিন্দা সর্বিতা বিশ্বাস বলেন, “সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে সব সময় আমরা দুশ্চিন্তায় থাকি। এই বুঝি কোনো খারাপ সংবাদ আসে। বর্ষায় আরও বেশি ভয়ে থাকি। তখন পানি বেড়ে যাওয়ায় স্রোতও বেড়ে যায়।”
এ বিষয়ে এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমাদের বছরের পর বছর এভাবে কষ্ট করে স্কুল কলেজে যেতে হয়। প্রায় সময় নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। অনেকে শুধু নৌকা পারাপারে দুর্ভোগের কারণে পড়ালেখাও ছেড়ে দিয়েছে।”
কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, “বিষয়টি আগেই জেনেছি। ওই এলাকায় খোঁজখবর নিয়েছি। আসলেই ওই এলাকার মানুষের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছি। আশা করি দ্রুতই সমাধান হবে।”



























