জাদু নয় কৌশলেই জিতেছে আর্জেন্টিনা


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ৪, ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
জাদু নয় কৌশলেই জিতেছে আর্জেন্টিনা

লিওনেল মেসি জাদুকর। এমিলিয়ানো মার্তিনেস অন্য গ্রহের গোলকিপার। আর্জেন্টিনার অন্য খেলোয়াড়রাও বিশ্বমানের। তুলনায় কেপ ভার্দে একেবারেই আনকোড়া এক দল। সেই দলটাই কিনা আর্জেন্টিনার জন্য জটিল করে তুলেছিল ম্যাচটা।

কেপ ভার্দে একদম নিখুঁত পরিকল্পনায় ম্যাচটা শেষ সীমা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। আর্জেন্টিনা কোন জাদুকরী পারফরম্যান্সে এর জবাব দেয়নি। বরং দেখিয়েছে কৌশলগত সচেতনতা, ক্রমাগত সমন্বয় আর ম্যাচ জেতার মতো যথেষ্ট ধৈর্য।

আর্জেন্টিনা ভুগেছে তবে জিতেছে। ব্যবধানটা খুব কম ছিল, কিন্তু তারা জিতেছে। কেপ ভার্দের বাস্তববাদী ফুটবল সত্যিই অনুকরণীয়। তারা নিখুঁতভাবে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। ম্যাচের প্রায় পুরোটা সময় নিজেদের ছক ধরে রেখেছে আর যখনই ম্যাচ উন্মুক্ত হয়েছে, তখনই সমান তালে লড়াই করার শক্তি খুঁজে নিয়েছে।

আর্জেন্টিনা নিজেদের সেরা ছন্দে ছিল না, তবে তারা আবারও এমন একটি গুণের পরিচয় দিয়েছে যা লিওনেল স্কালোনির দায়িত্ব নেওয়ার শুরু থেকেই তাদের আলাদা করেছে। সেটা হচ্ছে ম্যাচ বুঝতে পারা। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, সুবিধাগুলো কোথায় আছে। পরিস্থিতির প্রয়োজনে তারা তাদের আক্রমণের ধরন বদলেছে। শেষ পর্যন্ত নিছক আধিপত্য খাটিয়ে নয়, বরং ম্যাচের পরিস্থিতি পড়ার ক্ষমতায় জটিল ম্যাচের সমাধান করেছে।

আর্জেন্টিনার ৪-৪-২ ফরমেশন, যা আক্রমণের সময় মাঝমাঠে ডায়মন্ডের রূপ নেয়, এর জবাবে কেপ ভার্দে খেলে জমাট ও সংকীর্ণ ৪-১-৪-১ ফরমেশনে। আফ্রিকান দলটির সুশৃঙ্খল খেলা আর্জেন্টিনার দুই প্রান্তের আক্রমণ আটকে দেয়, তাই আর্জেন্টিনাকে মাঝমাঠ দিয়ে আক্রমণ করতে বাধ্য হতে হয়। সেখানে ডিফেন্সিভ ব্লক বা রক্ষণব্যূহ ভাঙার জন্য প্রতিটি পাসে নিখুঁত, গতি ও সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল।

ধৈর্যের সঙ্গে আর্জেন্টিনা ধীরে ধীরে ম্যাচটিকে সেই পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যায় যা তাদের জন্য সবচেয়ে সুবিধার ছিল। আর্জেন্টিনার আক্রমণের সেরা মুহূর্তগুলো তখন এসেছিল যখন দি পল মাঠের বিপরীত প্রান্তে অতিরিক্ত খেলোয়াড়ের চাপ তৈরি করতে নিচে নেমে আসছিলেন। তবে হাইড্রেশন ব্রেক পর্যন্ত কেপ ভার্দের দলগত প্রচেষ্টা ও অসাধারণ রক্ষণাত্মক পরিশ্রম আর্জেন্টিনাকে আটকে রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল।

হাইড্রেশন ব্রেকের পর আর্জেন্টিনা পাসের গতি বাড়ায় আর প্রথম গোলটি পেয়ে যায়। এই মুভের শুরুটা হয়েছিল লিসান্দ্রো মার্তিনেসের দূরদর্শিতা থেকে। কেপ ভার্দের রক্ষণভাগ লং পাসে ফাঁকা জায়গায় আক্রমণ করার সুযোগ দিচ্ছিল, যদিও মনে হচ্ছিল সেখানে কোনো জায়গা নেই। সেই নিখুঁত পাসটি মেসির কাছে পৌঁছায়, আর অসাধারণ দক্ষতায় বল জালে জড়ান তিনি।

এগিয়ে যাওয়ার পর আর্জেন্টিনা বুঝেছিল, প্রতিপক্ষের রক্ষণের গভীরে চাপ সৃষ্টি করা দরকার। এরপর থেকে ওয়ান-টাচ পাস, ক্রমাগত মুভমেন্ট এবং ড্রিবলিংয়ে তারা ডিফেন্ডারদের টেনে বের করতে শুরু করে। যতক্ষণ না কোনো ডিফেন্ডার তার জায়গা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছিলেন, ততক্ষণ কেউ বল হাতছাড়া করছিল না। কেবল তখনই ফাঁকা জায়গা তৈরি হতে শুরু করে এবং কেপ ভার্দের রক্ষণাত্মক কাঠামো ভেঙে পড়তে শুরু করে।

বিরতির পর ম্যাচ শুরু হয়েছিল আফ্রিকান দলটির পরিকল্পনায় একটি বড় পরিবর্তনে। কেপ ভার্দে খেয়াল করেছিল মেদিনার সামনে রক্ষণাত্মক সাহায্য কিছুটা কম ছিল। তাদের দুই খেলোয়াড় মিলে সেই জায়গাটিতেই আক্রমণ করতে শুরু করে।
সেখান থেকেই দুয়ার্তের প্রথম শটটি আসে এবং ১৫ মিনিট পর সমতা ফেরায় তারা। এই মুভটির শুরু হয়েছিল এনসো ফের্নান্দেসের মনোযোগের অভাব থেকে, যিনি তার মার্কিং হারিয়ে ফেলেছিলেন আর লিসান্দ্রো মার্তিনেস কিছুটা দেরিতে কভার করার চেষ্টা করেছিলেন। এটি কোনো মারাত্মক ভুল ছিল না, তবে প্রতিপক্ষের জন্য সেই জায়গাটি খুঁজে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল যা তারা বেশ কয়েক মিনিট ধরে খুঁজছিল।

অতিরিক্ত সময়ের শুরুতে, বাম প্রান্ত থেকে নেওয়া একটি কর্নারের সময় কেপ ভার্দে জোনাল মার্কিংয়ে রক্ষণভাগ সামলাচ্ছিল। সেখানে লিসান্দ্রো মার্তিনেসকে কেউ মার্ক করেনি। সেই সুযোগে তিনি আনমার্কড হয়ে ভেসে উঠে একজন সেন্টার ফরোয়ার্ডের মতো হেডে এগিয়ে নেন আর্জেন্টিনাকে।

গোলটি আর্জেন্টিনাকে আবারও প্রতিপক্ষের হাফে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। নিকো গঞ্জালেস মাঠে নামার পর আক্রমণকে আরও প্রসারিত করেন। মোলিনা যোগ করেন গভীরতা। পাসের মাধ্যমে রক্ষণভাগকে এক পাশ থেকে অন্য পাশে নিয়ে যাওয়া শুরু করে আর্জেন্টিনা। এতক্ষণ এই রক্ষণভাগ মূলত সেন্ট্রাল চ্যানেল বা মাঝের পথ রক্ষা করাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিল।

বল হারানোর পর চাপ সৃষ্টি করে তারা দ্রুত বল পুনরুদ্ধার করতে আর আক্রমণের একটি দীর্ঘ ধারা বজায় রাখতে শুরু করে। এই তীব্রতার কারণে খেলোয়াড়দের ওপর ধকলও যায়, অন্যদিকে কেপ ভার্দে নতুন খেলোয়াড় মাঠে নামানোয় তাদের শক্তি ও ছন্দ ধরে রাখতে পেরেছিল।

ডিফেন্সের পেছনের ফাঁকা জায়গাগুলো ততক্ষণে শেষ হয়ে গিয়েছিল। আফ্রিকান ব্লকটি প্রায় পনেরো মিটার পিছিয়ে যায়, যা আর্জেন্টিনাকে অন্য বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করে। সেগুলো মাঝমাঠ দিয়ে পাস দেওয়া, দূরপাল্লার শট, ক্রস আর সেট পিস।
ম্যাচের নাটকের তখনও বাকি ছিল। আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় গোলের দশ মিনিট পর কেপ ভার্দে আবারও সমতায় ফেরে।

অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার সিডনি কাবরালের চাপে ছিলেন, যিনি তাকে ড্রিবলিংয়ে হারান আর অসাধারণ শটে গোল করেন।
ম্যাচটি যখন পেনাল্টি শুটআউটের দিকে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই আর্জেন্টিনা আরেকটি উত্তর খুঁজে পায়। আরেকটি সেট পিস, এবার ১১১ মিনিটে রোমেরোর হেড পরের রাউন্ডে যাওয়া নিশ্চিত করে- যা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি কষ্টের ছিল।

শেষ মিনিটগুলো ছিল সতর্কের। অনেকটা বক্সিং রিংয়ের লড়াইয়ের শেষ রাউন্ডের মতো, যেখানে চ্যাম্পিয়ন জানে যে সে পয়েন্টে এগিয়ে আছে, আর চ্যালেঞ্জার তার অবশিষ্ট সবটুকু শক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর্জেন্টিনা তাদের অবস্থান ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যায়। তবে তাদের গেম প্ল্যান ম্যাচ জেতালেও সেটা প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি কোণঠাসা করার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
 

Link copied!