গুমের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সুগম করবে প্রস্তাবিত আইন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: আগস্ট ২৯, ২০২৬, ১১:২৩ পিএম
গুমের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সুগম করবে প্রস্তাবিত আইন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ গুমের শিকার ব্যক্তিদের সরাসরি আদালতে গিয়ে ন্যায়বিচার ও প্রতিকার পাওয়ার পথ সুগম করবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেছেন, বলপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে না ফেলে সরাসরি আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। মানবাধিকার সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধান, আইন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা এবং বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, গত ২৭ আগস্ট প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। আইনে গুমের ধরন ও অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে ক্ষেত্রবিশেষে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, গুমের শিকার কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকলে পাঁচ বছর পর আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে তার ওয়ারিশরা সম্পত্তির অধিকার পাবেন। দায়ী ব্যক্তি বা পক্ষ ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আইনটি বর্তমানে সংসদীয় কমিটিতে রয়েছে। সেখানে যেকোনো ভালো পরামর্শ অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও দেশের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

বাগেরহাটের মোংলায় মিরাজ শেখের কথিত গুমের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকায় যৌথ বাহিনীর ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ’ ও ‘অপারেশন সুন্দরবন’-এর ফলে জলদস্যু ও বনদস্যুরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। এ কারণে দস্যুদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, মিরাজ শেখের ঘটনায় দস্যু দলগুলোর নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের তথ্য রয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্তেও কোনো সরকারি বাহিনীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে যেকোনো নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনে সরকার প্রস্তুত রয়েছে।

বর্তমান সরকারের গত ছয় মাসের কার্যক্রম তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ সময়ে দেশে কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা গুমের ঘটনা ঘটেনি।

তিনি স্পষ্ট করেন, উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া দুর্বল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও পেশাদার হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাহিনীর মনোবল বাড়ানোর পাশাপাশি পুরস্কার ও শাস্তির নীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নতুন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে একটি বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের আইন মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছে।

গুমের অভিজ্ঞতার কথা
অনুষ্ঠানে নিজের গুমের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, তাকে দীর্ঘদিন অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে একটি প্রকোষ্ঠে বন্দী রেখে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছিল। বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়নি।

পরে চোখ বেঁধে তাকে ভারতের শিলংয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানান তিনি। সেখানে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় আন্তর্জাতিক সীমানা লঙ্ঘনের মামলায় দীর্ঘ সাড়ে নয় বছর তাকে আইনি লড়াই করতে হয়েছে। পরে ভারতীয় আদালত তাকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেন বলে জানান মন্ত্রী।

সংসদ সদস্য ও ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলির সভাপতিত্বে ও সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী, সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেন, মানবাধিকারকর্মী ও বলপূর্বক অন্তর্ধানসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান লিটন, আলোকচিত্রী শহীদুল আলম এবং নেত্র নিউজের নির্বাহী সম্পাদক নাজমুল আহসানসহ অন্যরা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে গুম, হত্যা ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে তাদের জন্য দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও অনুষ্ঠানে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।

এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী গ্যালারিতে গুম ও নির্যাতন নিয়ে আয়োজিত সাত দিনব্যাপী বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। ২৯ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রদর্শনীটি চলবে।

Link copied!