অচল দেশের সব আবহাওয়া রাডার, ঝুঁকিতে পূর্বাভাস ব্যবস্থা


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ৯, ২০২৬, ১২:২৪ পিএম
অচল দেশের সব আবহাওয়া রাডার, ঝুঁকিতে পূর্বাভাস ব্যবস্থা

দুর্যোগে পূর্বাভাস দেওয়া আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাঁচটি রাডারের সবগুলোই অচল হয়ে পড়ল। সর্বশেষ শনিবার (৪ জুলাই) ঢাকা অঞ্চলের রাডারটিও অচল হয়ে পড়েছে।

এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে পাঁচটি রাডার স্থাপন করা হয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তরে। ঢাকা, রংপুর, মৌলভীবাজার, কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় স্থাপন করা হয় এ রাডারগুলো।

এগুলোর মধ্যে রংপুরের নতুন রাডারটি ১৭ জুন থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ। কক্সবাজারের রাডার প্রায় তিন বছর ধরে অচল।


পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার রাডার বন্ধ আট বছর। মৌলভীবাজারের রাডারও কয়েক বছর ধরে অকেজো।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, কয়েকটি রাডারের যন্ত্রাংশ পুরনো হয়ে গেছে। কোনোটির বিনামূল্যে বা শর্তসাপেক্ষে বদলে দেওয়ার আশ্বাসপত্র বা ‘ওয়ারেন্টির’ মেয়াদ শেষ।


কোনোটির যন্ত্রাংশ আর বাজারে পাওয়া যায় না। ফলে চাইলেও সেগুলো মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না।
 
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, মৌসুমি বায়ু এখন দেশজুড়ে সক্রিয়। বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট একটি নিম্নচাপের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টি হচ্ছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণকেন্দ্র এরই মধ্যে কয়েকটি জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বলপমেয়াদি বন্যার সতর্কতা জারি করেছে।


জুলাই মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টি, তীব্র বজ্রঝড় ও দমকা হাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এমন সময়ে আকাশের মেঘের গতি, বৃষ্টির অবস্থান কিংবা বজ্রঝড়ের গতিপথ সম্পর্কে কয়েক ঘণ্টা আগেই নির্ভুল তথ্য পাওয়া জরুরি। অথচ, দেশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি আবহাওয়া রাডার এখন অচল।

রাডারগুলো নষ্ট হওয়ায় ঢাকা ছাড়াও দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল এবং কক্সবাজার উপকূলের বিশাল এলাকা এখন কার্যত রাডার পর্যবেক্ষণের বাইরে। বিভিন্ন গাণিতিক মডেল, স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করেই চলছে পূর্বাভাসের কাজ।

রংপুরে এক যুগ পর চালু, ক’দিন না যেতেই বন্ধ
২০১২ সালের পর আবহাওয়া অধিদপ্তরের রংপুরের রাডারটি অচল হয়ে পড়ে। এরপর এক যুগের বেশি সময় অপেক্ষার পর গত বছরের মে মাসে রংপুরের রাডারটি চালু হয়েছিল। কিন্তু গত ১৭ জুন থেকে তা আবার অচল হয়ে পড়েছে।

১৯৯৯ সালে জাপানের অর্থায়নে উত্তরাঞ্চলে প্রথম ডপলার আবহাওয়া রাডার স্থাপন করা হয়। কিন্তু স্থাপনের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এতে ত্রুটি দেখা দেয়। ২০০৭ সালে বড় ধরনের যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেয় এবং ২০১২ সালে এটি পুরোপুরি অকেজো হয়ে যায়। এর পর প্রায় এক যুগ ধরে দেশের উত্তরাঞ্চলে কোনো কার্যকর আবহাওয়া রাডার ছিল না।

এ দীর্ঘ সময়ে উত্তরাঞ্চলে একাধিক আকস্মিক বন্যা, শিলাবৃষ্টি, কালবৈশাখী এবং অতিবৃষ্টির ঘটনা ঘটেছে। নির্ভুল এবং সময়োপযোগী আবহাওয়া তথ্যের অভাবে বিভিন্ন সময়ে কোটি কোটি টাকার ফসলহানি হয়েছে।
 
রংপুরের নতুন রাডার স্থাপন প্রকল্পটিও নানা কারণে বিলম্বিত হয়। ২০১৫ সালে জাপানি নাগরিক হোশি কোনিও হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি থমকে যায়। পরে করোনা মহামারির কারণে কাজ আরো পিছিয়ে পড়ে।

অবশেষে জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন রাডার স্থাপন করা হয়। জাপানের শিমিজু করপোরেশন রাডার স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করে এবং সরঞ্জাম সরবরাহ করে মারুবিনি করপোরেশন। গত বছরের ১১ মে জাপানি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে রাডারটি বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করে।

নতুন এই রাডারটি চারদিকে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার এলাকা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম ছিল। এর মাধ্যমে ঝড়, বজ্রপাত, বৃষ্টিপাত, শিলাবৃষ্টি, মেঘের গঠন, আর্দ্রতা, জলীয়বাষ্পের গতি, তাপমাত্রা এবং বায়ুর গতিবেগ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেত। রাডারের তথ্য ব্যবহার করে সরাসরি আবহাওয়া মানচিত্র তৈরি করা হতো। শনাক্ত করা যেত বিমান চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাও।

রংপুর আবহাওয়া কার্যালয়ের প্রধান মো. মোস্তাফিজার রহমান বলেন, “আমাদের আগের ‘কনভেনশনাল’ রাডারটি পুরোপুরি অকেজো হয়ে গেছে এবং নতুন করে একটি ডপলার রাডার স্থাপন করা হয়েছে, এটা এক বছর হচ্ছে রানিং। গত ১৭ তারিখে আমাদের যে এভিআর (ইলেক্ট্রিসিটি পাওয়ার সাপ্লাই সিস্টেম) কোনো ইন্টারনাল কারণে এটাতে একটু সমস্যা হয়েছে এবং এখনো এটার ‘ওয়ারেন্টি পিরিয়ড’ আছে। এটা যেহেতু জাইকার অনুদানে, ‘ওয়ারেন্টি পিরিয়ড’ আছে। এজন্য ওরা আমাদেরকে বলছে যে, যদি কোনো ‘প্রবলেম ফেইস করেন, তৎক্ষণাৎ আমাদেরকে জানাবেন এবং তাদের অনুমতি নেওয়া ছাড়া আমরা কোনো কিছু করতে পারব না।”

তিনি বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে তাদেরকে জানিয়েছি, তারা চেষ্টা করেছিল ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সমাধান করার জন্য, সামাধান হয়নি।’

মৌলভীবাজারে কয়েক বছর ধরে নষ্ট
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মৌলভীবাজারের রাডারটিও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। সিলেট, মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল ও সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে প্রতিবছরই আকস্মিক ও স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দেয়।

 
উজানে ভারতের মেঘালয়ে ভারি বৃষ্টি হলেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানি বেড়ে যায়। এ ছাড়া সুনামগঞ্জ অঞ্চলে বজ্রপাতের ঘটনাও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি ঘটে। সবশেষ মাস খানেক আগেও আকস্মিক স্বল্পমেয়াদী বন্যার কারণে ওই অঞ্চলে ফসলের বিপুলের ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। ফলে, মৌলভীবাজারের এই রাডারটি সচল থাকলে মেঘের গতিবিধি, বৃষ্টির তীব্রতা এবং বজ্রঝড়ের বিষয়ে দ্রুত তথ্য পাওয়া যেত।

কক্সবাজারে বন্ধ প্রায় তিন বছর
রংপুর আর মৌলভীবাজারের মতোই অবস্থা কক্সবাজারে। বাংলাদেশের প্রায় ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূল ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নিম্নচাপের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট প্রায় প্রতিটি নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড় প্রথম আঘাত হানে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে। এই অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল কক্সবাজার এবং পটুয়াখালীর খেপুপাড়া রাডার। তবে দুটি রাডারই দীর্ঘদিন অচল।

১৯৬৯ সালে কক্সবাজারের রাডার স্টেশনটি স্থাপন করা হয়। এরপর ২০০৭ সালে জাপান সরকারের আর্থিক সহায়তায় এটি আধুনিকায়ন করা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬০ ফুট উঁচু পাহাড়ের ওপর অবস্থিত রাডারটি ৪০০ কিলোমিটার দূরের সমুদ্র এলাকার আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারত। ২০২৩ সালের অগাস্টে এটি অচল হয়ে যায়। এর পর প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এটি সংস্কারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে এই অঞ্চলের সমুদ্রনির্ভর জীবিকা যাদের, বিশেষ করে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া হাজারো জেলে এখন দুর্যোগের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ আবহাওয়া তথ্য পাচ্ছেন না।

কক্সবাজার আবহাওয়া কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, ‘২০২৩ সালের অগাস্ট মাস থেকে এটা অকেজো আছে। আমাদের ইঞ্জিনিয়ার যারা আছেন, তারা চেষ্টা করছেন, কিন্তু অ্যাক্টিভ হয়নি।’

এর ফলে কী সমস্যা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া অফিস কক্সবাজার হলো লোকাল অফিস, এখানে আমাদের কাজ শুধু অবজারভেশন নেওয়া। রাডার দিয়ে অবজারভেশন নিয়ে আমরা ঢাকাতে পাঠাই। স্থানীয় প্রশাসন ও সংবাদকর্মীদেরও পাঠাই। আমরা এখন পাঠাতে পারছি না। না পাঠানোর কারণে আমাদের ওই কাজটা বন্ধ আছে।’

পটুয়াখালীর রাডার বন্ধ ৮ বছর
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পটুয়াখালীর খেপুপাড়া রাডার স্টেশনও আট বছর ধরে বন্ধ। ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। স্টেশনটির ট্রান্সমিশন এবং সার্ভে সিস্টেমের যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ার পর থেকে এটি আর সচল করা যায়নি।

 
রাডারটি আগে ৪০০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ নির্ধারণ, বৃষ্টির তীব্রতা বিশ্লেষণ এবং উপকূলের জন্য জরুরি সতর্কতা দিতে পারত। উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় এই অঞ্চলের আবহাওয়ার পূর্বাভাস থেকে শুরু করে দুর্যোগ সম্পর্কিত সতর্কবার্তার জন্য এই রাডারটি অত্যন্ত গুরুতপূর্ণ। অথচ, এত বছর ধরে বন্ধ থাকার পরও এটি চালুর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক সমরেন্দ্র কর্মকার বলেন, ‘রাডার বন্ধ হলেও পূর্বাভাস দেওয়া যায়। খুব বেশি প্রভাব পড়ে না, যদি ভালো আবহাওয়াবিদ থাকে। কারণ, অন্যান্য জিনিস তো আছে, আমাদের যে ম্যাপগুলো করা হয়, সেই ম্যাপগুলো কাজে লাগে। তারপরে স্যাটেলাইট পিকচার আছে।’

তিনি বলেন, ‘ওটা (রাডার) থাকলে একটু ভালো হয় স্বল্পমেয়াদী, কিন্তু সুনিদিষ্ট ও তাৎক্ষণিক পূর্বাভাস জন্য। মানে বজ্রবৃষ্টি হবে মনে করেন, বজ্রঝড় হলে যদি অ্যানিমেশনটা পাওয়া যায়, তাহলে সহজে বলা যায়, এটা কোন দিকে যাচ্ছে এবং কখন এটা কোন এলাকাতে থাকবে। আর এমন পূর্বাভাসের জন্য যা আছে তা দিয়ে করা যায়।

জাতীয় বিভাগের আরো খবর

Link copied!